সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা কি গণভোটের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে?
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠেয় গণভোটকে কেন্দ্র করে একদিকে অন্তর্বর্তী সরকার 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে, অন্যদিকে একই সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই গণভোট 'সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার' সঙ্গে পরিচালনা করতে আইনত বাধ্য। সরকারের এই প্রকাশ্য অবস্থান এবং ইসির আইনি বাধ্যবাধকতা—উভয়ের টানাপোড়েনে নির্বাচন কমিশন এখন এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারণাকে জোরদার করতে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনই নয়, বরং এনজিও ও তৈরি পোশাক খাতের (আরএমজি) মতো বেসরকারি খাতকেও কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ঘোষিত লক্ষ্য হলো—জুলাই জাতীয় সনদের অনুমোদনের পক্ষে দেশব্যাপী একটি জনজোয়ার সৃষ্টি করা।
এই পদক্ষেপগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান নিয়ে আর কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি: সরকার কার্যকরভাবে গণভোটের একটি 'পক্ষ' হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং প্রকাশ্যে 'না' ভোটের বিরোধিতা করছে। এর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট—জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং মাঠপর্যায়ের অন্য কর্মকর্তারা যদি 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারের জন্য নির্বাহী নির্দেশ মেনে চলেন, তবে গণভোটের আগে তাঁদের আর নিরপেক্ষ প্রশাসক হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
বিপরীতে, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। তাদের বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় কেবল ব্যালটের প্রস্তাবনাগুলো ব্যাখ্যা করা হচ্ছে এবং ভোটারদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে কীভাবে 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোট দিতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে, ইসির এই পদক্ষেপ গণভোট অধ্যাদেশের নিরপেক্ষতার শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে মূল স্ববিরোধিতাটি এখানেই।
কারণ, অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন উভয়ই একই মাঠ প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের জন্য ইসি ডিসি ও ইউএনওদের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে সরকারি গেজেটে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত, এই কর্মকর্তারা ইসির নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় কাজ করেন—সরকারের অধীনে নয়। এই সময়ে ইসির অনুমোদন ছাড়া সরকার তাদের বদলি করতে পারে না এবং নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হলে তা 'নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১'-এর অধীনে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
একবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়।
সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলগুলোর জন্য প্রযোজ্য নির্বাচনী আচরণবিধি বর্তমান প্রচারণা ও গণভোটের জন্যও প্রযোজ্য।
আইনি জটিলতা এখানেই আরও গভীর হয়। গণভোট অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারাই পদাধিকারবলে গণভোট পরিচালনার কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য হবেন। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত হওয়ার পর উভয় প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে তাঁরা আইনত বাধ্য।
অথচ অন্তর্বর্তী সরকার কর্মকর্তাদের একটি 'সচেতনতামূলক' প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে সুস্পষ্টভাবে প্ররোচনামূলক বার্তা রয়েছে। যেমন: 'সব সংস্কার বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোট দিন; না ভোটে কিছুই মিলবে না। পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ ভোট দিন।'
গ্রে জোন
এতে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে।
অন্তর্বর্তী সরকার কি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ইসির নিয়ন্ত্রণে থাকা কর্মকর্তাদের গণভোটের একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের পক্ষে প্রচারণায় নামাতে পারে?
নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর ডিসি ও ইউএনওদের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—সরকারের নাকি ইসির?
এবং ইসি কি গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নষ্ট না করে এ ধরনের প্রচারণা চলতে দিতে পারে?
আইনি কাঠামোতে এর উত্তর কাগজে-কলমে স্পষ্ট। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা। গণভোট অধ্যাদেশের ১৮ ধারা ইসিকে 'সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার' সঙ্গে গণভোট নিশ্চিত করতে যেকোনো প্রয়োজনীয় আদেশ জারির ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। ইসি তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের জারি করা যেকোনো আদেশ পর্যালোচনা, স্থগিত বা বাতিল করতে পারে এবং প্রয়োজনে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিতে পারে।
বাংলাদেশে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটের মধ্যে ১৯৭৭ এবং ১৯৮৫ সালের দুটি গণভোট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং এইচ এম এরশাদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই সরকার সরাসরি গণভোটের পক্ষ ছিল এবং প্রকাশ্যে 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারণা চালিয়েছিল। এর ফলে ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোটার রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় থাকার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
১৯৯১ সালের গণভোট ছিল সেই ধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার সেই প্রক্রিয়ার কোনো পক্ষ ছিল না। সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থনে অনুষ্ঠিত সেই ভোট রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত করেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে, বর্তমানে গণভোট পরিচালনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সক্রিয় ভূমিকা একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে। এটি অতীতের স্বৈরাচারী গণভোট এবং ১৯৯১ সালের সর্বসম্মত অনুশীলনের মাঝখানের একটি 'গ্রে জোন' বা ধূসর এলাকায় অবস্থান করছে।
বিভক্তির রেখা
জুলাই জাতীয় সনদে ১১টি প্রধান সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—একতরফা সংবিধান সংশোধনে সীমাবদ্ধতা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা ১০ বছর করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতায় লাগাম টানা এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২৬টি রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করলেও বিএনপি ৯টি প্রস্তাবে ভিন্নমত পোষণ করে 'নোট অব ডিসেন্ট' দিয়েছিল আর জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি দল এতে স্বাক্ষর করেনি।
জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি নেতৃত্বাধীন জোট 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। বিএনপি, যারা এর আগে ভিন্নমত বা 'নোট অব ডিসেন্ট' গণভোটের ব্যালটে অন্তর্ভুক্ত না করায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশের সমালোচনা করেছিল, তারা এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের হয়েই প্রচারণা চালায়নি। দলটি মূলত সংসদ নির্বাচনের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।
২০ জানুয়ারির পর নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠলে এই বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারের প্রকাশ্য 'হ্যাঁ' ভোটের প্রচারণা গণভোটের পক্ষে ওকালতি এবং নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের প্রশ্ন
গত ১৪ ডিসেম্বর ইসি বিভাগীয় কমিশনার, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, ডিসি এবং রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। যদি একই কর্মকর্তাদের সরকার সমর্থিত গণভোটের ফলাফলের জন্য কাজে লাগানো হয়, তবে সমান সুযোগ বা 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড'-এর প্রশ্নটি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকার এবং ইসি উভয়ই বারবার ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অথচ গণভোট নিয়ে তাদের অবস্থান পরস্পরবিরোধী বলে মনে হচ্ছে।
গত ৬ জানুয়ারি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট বিষয়ক সরকারি সচেতনতা প্রচারণার প্রধান সমন্বয়ক আলী রিয়াজ এই প্রচারণার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য জুলাই সনদের গণভোটে অবশ্যই 'হ্যাঁ' ভোট নিশ্চিত করতে হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সতর্ক করেছেন যে, গণভোটের ফলাফল প্রভাবিত করতে সরকারের সরাসরি প্রচারণা ভোট প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের শামিল এবং এটি রাজনৈতিক অঙ্গনকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। তিনি যোগ করেন, 'যে কেউ গণভোটের ফলাফল আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।'
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, সরকার গণভোটের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারে, কিন্তু 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো উচিত নয়।
এই পার্থক্যই এখনকার মুহূর্তটিকে সংজ্ঞায়িত করছে।
আইনে অস্পষ্টতার সুযোগ খুব কম। এখন যা অনিশ্চিত তা হলো—ইসি এই আইন প্রয়োগ করার মতো দৃঢ়তা দেখাবে কি না।
