বিএনপির ইশতেহারে গুরুত্ব পাচ্ছে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। এতে আত্মনির্ভরশীল অর্থীনীতি ও দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইশতেহারে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কৃষি ও দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড চালু করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও তরুণ প্রজন্মকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করার ওপর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার তৈরির কাজ চলমান আছে। 'দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কাজ করছেন। দেশবাসীর সামনে এটা দলের আগামীর দিনের প্রতিশ্রুতি। ইশতেহার তৈরির কাজ শেষ হলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে।'
নির্বাচনের আগেই জনমত গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি ইশতেহার-ভিত্তিক প্রচারণা শুরু করেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে দলের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করছেন।
নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর 'রাষ্ট্র গঠন' কর্মসূচি পরিচালনা করেছে বিএনপি। দলটির নেতাকর্মীদের ৮টি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, নির্ধারিত সময়েই ইশতেহার ঘোষণা করা হবে; বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিকল্পনার কথা ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, 'কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাত রয়েছে আমাদের প্রস্তাবে। আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরছি; ইশতেহারে এর সবকিছুর প্রতিফলন থাকবে।'
ঘোষণার পর প্রচারণা
ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনি ইশতেহারের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। প্রচার-প্রচারণার জন্য কাজ করছে একাধিক টিম। বিএনপি মনে করছে, বড় ইশতেহার সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না, অনেকে পড়েন না।
বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে লিফলেট আকারে জনগণের কাছে তুলে ধরা হবে। নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করা অহচ্চে।
ইশতহার প্রস্তুত কমিটির এক সদস্য জানান, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, তারেক রহমানের ৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে ইশতেহারটি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, 'তারেক রহমানের সাম্প্রতিক নানা বক্তব্য ইশতেহারে সংযুক্ত করা হবে। ইশতেহার তৈরিতে বিভিন্ন সেক্টরে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।'
ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি
বেকারত্ব দূর করতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। একইসঙ্গে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষিত বেকারদের বেকার-ভাতা দেওয়া হবে।
প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ২০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরি।
ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করার উদ্যোগ থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা, স্বল্প খরচে বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রবাসে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের জন্য সহজ ঋণ এবং বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানিমুক্ত সেবার প্রতিশ্রুতিও থাকছে।
নারীর ক্ষমতায়নে নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি ও সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকছে।
প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, যা পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে মাসিক আর্থিক সহায়তা বা খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিএনপি বলছে, এই কার্ড প্রতিটি পরিবারকে সরাসরি দেওয়া হবে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই—আর যেহেতু সবাই পাবে, তাই এখানে দুর্নীতির সুযোগ কম। এছাড়া বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংসদে উচ্চকক্ষ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। এছাড়াও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনঃপ্রবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলের অর্থপাচার ও দুর্নীতির তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা থাকছে।
কৃষি খাত নিয়ে ইশতেহারে বড় পরিকল্পনা থাকছে। সারাদেশে খাল ও নদী খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থাকছে। এছাড়াও কৃষি কার্ড, কৃষি উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিঋণ সহজ করা, ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও থাকছে। জেলা পর্যায়ে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাতে কোল্ড স্টোরেজ সংখ্যা বাড়ানো, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, কৃষি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে উৎপাদনে রূপান্তর করাসহ নানা উপকরণ কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যুক্ত হচ্ছে ইশতেহারে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নিরাপত্তা সেল, ধর্মীয় উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা ও সব ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের সমান মাসিক সম্মানি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকছে।
ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আদলে (এনএইএস) সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ; সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা, ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও বিশেষায়িত স্তরের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকছে।
