পুরনো আলুর দাপটে নতুন আলুর দরপতন, লোকসান পিছু ছাড়ছে না কৃষকদের
নতুন মৌসুম শুরু হলেও বাজারে এখনো পুরোনো আলুর উল্লেখযোগ্য সরবরাহ রয়েছে। ফলে এ বছর নতুন আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।
রাজধানীতে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। কৃষক পর্যায়ে এই আলু বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম।
কৃষক ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা জানিয়েছেন, গত মৌসুমের উদ্বৃত্ত আলু এখনো হিমাগারে রয়ে গেছে। এর প্রভাবে নতুন আলু বাজারে এলেও অন্য বছরের মতো দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
আলুচাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আগাম জাতের আলু চাষ করেন কৃষকরা। এসব আলু ৬৫ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যে তুলে ফেলা হয় এবং বাজারে নতুন আলু হিসেবে বিক্রি হয়। বর্তমানে বাজারে থাকা আগাম জাতের আলু উৎপাদনে প্রতিকেজিতে খরচ হচ্ছে ১৫ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। দাম না থাকায় অনেক কৃষক আলু পরিপক্ব হলেও ক্ষেত থেকে তুলছেন না।
বগুড়া সদর উপজেলার কালিবালা এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর হোসাইন এবার ৪৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আগাম জাতের।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "এক বিঘা জমিতে আগাম জাতের সাদা আলু চাষ করতে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৬৫ মণ। মাঠ পর্যায়ে এখন এই আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে। খরচের টাকাই উঠছে না।"
এখনো জমিতে আলু রেখে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণত রোপণের ৭০ দিনের মধ্যে আলু তুলে ফেলতে হয়। কিন্তু তার জমিতে রোপণের ৭৫ দিন পার হয়ে গেছে। দাম না পাওয়ায় এখনো তুলছেন না। এরপর ধান চাষ করতে হবে বলেও জানান তিনি।
সদর উপজেলার কালিবালা এলাকার আরেক কৃষক আব্দুল মোমিন জানান, তিনি এবার ১১ বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, "আগাম আলু চাষীরা এখন আতঙ্কে রয়েছেন। দিন দিন আলুর বাজার আরও কমছে। উত্তরের সবচেয়ে বড় বাজার মহাস্থানে সাদা আলু বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকা মণ দরে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা কিনছেন ১০ থেকে ১১ টাকা কেজি দরে। গত দুই দিনের তুলনায় বাজার আরও নিম্নমুখী হয়েছে। আগাম আলু চাষ করে এবার লোকসানে পড়তে হচ্ছে।"
পাকরি জাতের আলুতেও লোকসান গুনছেন চাষীরা। বগুড়ার ফুলবাড়ি এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম এবার তিন বিঘা জমিতে রোমানা পাকরি জাতের আলু চাষ করেছিলেন।
তিনি জানান, সপ্তাহখানেক আগে এই আলু বিক্রি করেছেন এক হাজার টাকা মণ দরে। এই জাতের আলু শতকে এক মণের বেশি হয় না। সে হিসাবে এক বিঘা জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৩০ থেকে ৩৩ মণ। বাজারে বিক্রি করে পেয়েছেন ৩০ থেকে ৩৩ হাজার টাকা। কিন্তু সার, কীটনাশক, শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ হয়েছে এর চেয়েও বেশি।
তিনি বলেন, "চাষাবাদ করে আয় না হলে সংসার চলবে কীভাবে—আমাদের তো আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই।"
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, সাধারণত নভেম্বরের মধ্যেই কোল্ড স্টোরেজগুলো খালি হয়ে যায়। তবে এবার জানুয়ারি শুরু হলেও এখনো প্রায় এক লাখ টন আলু হিমাগারে মজুদ রয়েছে। ১৫ ডিসেম্বরের পর থেকে আলুচাষী বা ব্যবসায়ীরা কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু তুলতে আসেননি। সে সময় হিমাগারগুলোতে প্রায় পাঁচ লাখ টন আলু মজুদ ছিল।
বগুড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও আরবি হিমাগারের মালিক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, তাদের কিছু হিমাগারে এখনো পুরোনো আলু মজুদ রয়েছে। এ কারণে নতুন আলুর বাজারে প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু টিবিএসকে বলেন, "আলু বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাচ্ছে, তার চেয়ে কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া বেশি পড়ছে। এ কারণে চাষী বা ব্যবসায়ীরা আলু নিতে আসছেন না। এতে অনেক হিমাগার মালিকও লোকসানে পড়েছেন। এই সময়ে হিমাগারে আলু থাকার কথা নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো কোল্ড স্টোরেজে আলু রয়ে গেছে।"
সংকট নিরসনে শুধুমাত্র আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ সরকার
গত বছর আলুচাষীরা লোকসানে পড়ায় এবার চাষাবাদ কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় গত নভেম্বর থেকে আলুচাষীদের উৎসাহ দিতে প্রণোদনার ঘোষণা দেয়।
গত দুই মাসে কৃষি উপদেষ্টা একাধিকবার গণমাধ্যমে এ প্রণোদনার কথা উল্লেখ করলেও এখনো কৃষকরা কোনো প্রণোদনা বা ভর্তুকি পাননি।
এর আগে, উদ্বৃত্ত আলুর কারণে দাম কমে যাওয়ায় গত আগস্টে সরকারিভাবে ৫০ হাজার টন আলু প্রকিউরমেন্টের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হয়নি। পরে পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়। এর পরিবর্তে আলুচাষীদের স্বার্থ রক্ষায় কৃষি মন্ত্রণালয় নভেম্বরের শুরুতে অতিরিক্ত ১১০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আলুচাষীদের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অতিরিক্ত ভর্তুকি যুক্ত হলে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ২৬০ কোটি টাকায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঘোষণা দিয়ে সময়মতো প্রণোদনা বা সুবিধা না দিলে উল্টো কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ কৃষকরা ইতোমধ্যে আলু চাষ সম্পন্ন করেছেন। আগে প্রণোদনা দেওয়া হলে আলু চাষে কৃষকদের উৎসাহ বাড়ত বলে তাদের মত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেছেন কৃষকরা। এর মধ্যে ১৬ হাজার হেক্টর জমির আলু ইতোমধ্যে তোলা হয়েছে, যা আগাম জাতের। এসব জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টন আলু। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে গত বছর ৪ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং সেখানে আলুচাষীদের প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এখন প্রণোদনা দিলে এর সুফল কতটা মিলবে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরেই তারা চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছিলেন যে সময়মতো প্রণোদনা না দিলে চাষীরা লোকসানে পড়বেন। কিন্তু জানুয়ারি এসে গেলেও এখনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।
"এর আগেও আগস্টে আলু প্রকিউরমেন্টের ঘোষণা দিয়েও সরকার চাষীদের কাছ থেকে আলু কেনেনি, যা উল্টো সংকট তৈরি করেছিল। সরকার এখনো আলুচাষীদের সুরক্ষায় কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি," বলেন তিনি।
এ বিষয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, কৃষিপণ্য উৎপাদনের সঙ্গে তাদের কাজ জড়িত। পণ্যের দাম নির্ধারণ বা তদারকির দায়িত্ব তাদের নয়।
"প্রণোদনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জেলার কৃষকদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী কৃষকরা সহায়তা পাবেন," যোগ করেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন টিবিএসকে বলেন, "আলুচাষীদের প্রণোদনা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়েছে। শিগগিরই প্রণোদনা কার্যক্রম শুরু হবে।"
এখন প্রণোদনা দিলে কৃষকরা কতটা সুফল পাবেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "যেসব চাষী গত বছর এবং এ বছর আলু চাষ করেছেন, তাদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই প্রণোদনা মূলত গত বছর যারা লোকসানের শিকার হয়েছেন, তারা যেন কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই দেওয়া হবে।"
