চট্টগ্রামে কুয়াশা নয়, ধুলোর দখলে বাতাস: বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়েছে পিএম২.৫
শীত মৌসুম এলেই চট্টগ্রাম শহর কুয়াশায় ঢেকে পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে কুয়াশার বদলে ধুলোর ঘন আস্তরণে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে নগরী। বাতাসে ভাসছে অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা। খোলা চোখে কুয়াশার মতো মনে হলেও বাস্তবে তা ধুলাবালি।
বাইরে বের হলেই গলা খুসখুস করা কাশি, চোখে জ্বালা আর শ্বাস নিতে কষ্ট—এই উপসর্গ এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বেসরকারি এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, গেল বছরের শেষ কয়েক মাসে চট্টগ্রামের বাতাসে অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম২.৫-এর মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অধিকাংশ দিনেই দৈনিক গড় মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৫০ থেকে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম। কিছু দিনে তা ২০০ থেকে ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–এর ২০২১ সালের এয়ার কোয়ালিটি গাইডলাইন অনুযায়ী, পিএম২.৫-এর বার্ষিক গড় নিরাপদ মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার এবং দৈনিক গড় নিরাপদ সীমা ১৫ মাইক্রোগ্রাম। সে হিসাবে চট্টগ্রামের বাতাসে বর্তমানে এই ধূলিকণার মাত্রা নিরাপদ সীমার তুলনায় ১০ থেকে ৩০ গুণ পর্যন্ত বেশি।
বাড়ছে রোগী, চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে
বায়ুদূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যে। চট্টগ্রাম বক্ষব্যাধী ক্লিনিকের কনসালটেন্ট নাজমুল হাসনাইন নওশাদ জানান, ২০২৪ সালে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬ হাজার ৫২০ জন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১৬৬ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস বলেন, "শীতকালে বাতাসে ধুলাবালির ঘনত্ব এমনিতেই বেড়ে যায়। তার ওপর নির্মাণকাজ ও যানবাহনের ধোঁয়া মিলিয়ে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ বাড়ছে। শিশু, বয়স্ক ও আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভোগা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।"
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকলে রোগের তীব্রতা বাড়ে এবং ওষুধে সাড়া কমে যেতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, মাস্ক ব্যবহার এবং ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
নগরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি, ধুলার মূল উৎস
নগরজুড়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং সড়ক খোঁড়াখুঁড়িকেই বাতাসে ধুলার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–এর এক কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজ চলাকালে সড়ক খননের কারণে যানবাহন চলাচলের সময় ধুলা উড়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
গত ৭ আগস্ট বায়েজিদ বোস্তামী সড়কে একটি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ার পর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পুনর্নির্মাণ ও মেরামতকাজ শুরু করে, যা এখনো চলমান। এছাড়া চুনা ফ্যাক্টরি মোড় এলাকায় ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপন এবং নগরজুড়ে স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজের কারণে ধুলাবালির মাত্রা আরও বেড়েছে।
বড়পোল–নিমতলা, সদরঘাট–মাঝিরঘাট, কদমতলী–বারিক বিল্ডিং, বারিক বিল্ডিং–কাস্টমস মোড়, ইপিজেড–সিমেন্ট ক্রসিং, বহদ্দারহাট–কালুরঘাট রুট, দেওয়ানহাট, পাহাড়তলী বাজার–অলংকার এবং চকবাজার কাঁচাবাজার থেকে রাহাত্তারপুলসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতিদিন ধুলোর কুয়াশা দেখা যাচ্ছে।
লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. রশিদ বলেন, "ঘর থেকে বের হলেই মাস্ক পরতে হয়। আগে থেকেই ডাস্ট অ্যালার্জি আছে, এখন সমস্যা আরও বেড়েছে। কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যানজটও বেড়েছে।"
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
এদিকে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক বেগম সোনিয়া সুলতানা বলেন, নির্ধারিত মানের বাইরে দূষণ পাওয়া গেলে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিল্পকারখানার পাশাপাশি নির্মাণকাজের ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও স্যুয়ারেজ প্রকল্পের পরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, "নির্মাণকাজ চললে কিছুটা ধুলা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তবে আমরা পানি ছিটানো, কাজের স্থান ঘেরা দেওয়া এবং নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখার চেষ্টা করছি।"
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হলেও সড়কে কারপেটিং না হওয়ায় ধুলা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন–এর সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, "উন্নয়ন প্রকল্প চলাকালে ধুলাবালি ছড়ানো পুরোপুরি এড়ানো যায় না। তবে এর প্রভাব কমাতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।"
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়ছে
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, হাঁপানি এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, "শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ দ্রুত বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।"
শীতে কুয়াশার শহর হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম এখন ধুলোর নগরীতে পরিণত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই নীরব দূষণ নগরবাসীর জন্য আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
