প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাব: সংশোধিত এডিপিতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যাপক বরাদ্দ কমছে
প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবহন খাতে বরাদ্দে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হচ্ছে। সামগ্রিক উন্নয়ন বাজেট থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেট সংশোধনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে স্বাস্থ্য খাত। এ খাতে বরাদ্দ কমছে সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে, শিক্ষা ও পরিবহন খাতে ব্যয় কমানো হচ্ছে ৩৫ শতাংশ।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আবাসন এবং কৃষি খাতেও বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আগামী ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এর চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি তহবিল ও বিদেশি অর্থায়ন মিলিয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানোর পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। আর বিদেশি ঋণ ও অনুদানের বরাদ্দ ৮৬ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা স্বাস্থ্য খাতে
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। বাস্তবায়র সক্ষমতার অভাবে এ খাতে বরাদ্দ ১৩ হাজার ৪২৯.৫২ কোটি টাকা কমানো হচ্ছে। এতে সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বাস্তবায়ন হয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের মাধ্যমে। চলতি অর্থবছরে এডিপিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ ৭৩ শতাংশ কমানো হয়েছে সংশোধিত এডিপিতে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অনুকূলে এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৯০২ কোটি টাকা, যা থেকে ৭৭ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য খাতের চলমান বেশ কয়েকটি প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করতে পারেনি।
এসব প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন; যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীতে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আনুষঙ্গিক সুবিধা নির্মাণ; আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে কিডনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্র ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্প।
তবে এর মধ্যে অনেক প্রকল্প সম্প্রতি অনুমোদন পেয়েছে, আবার কিছু প্রকল্প এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। মূলত এসব কারণেই সামগ্রিক ব্যয় কম হয়েছে এবং সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ৭৪.৫৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যের দুটি বিভাগও রয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ১.৮ শতাংশ। একই সময়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩.৯২ শতাংশ।
স্বাস্থ্যের মতো শিক্ষা খাতেও বরাদ্দে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। মূল এডিপিতে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে তা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমিয়ে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন-আল-রশীদ বলেন, প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা, প্রকিউরমেন্ট (ক্রয়) সম্পর্কে অভিজ্ঞতার অভাব ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সঙ্গে অপরিচিতিই বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার প্রধান কারণ।
'সরকার স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু যারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছেন, তাদের অদক্ষতার কারণে ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ ফেরত যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নতুন প্রকল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া জরুরি,' বলেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অর্থ ব্যয় করতে না পারার পেছনে বারবার সক্ষমতার অভাবকে কারণ হিসেবে দেখানোর তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, 'এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদি ব্যয়ের সক্ষমতা না থাকে, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের ব্যর্থতা। প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রকিউরমেন্ট এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো সরকারের দায়িত্ব।'
পরিবহন ও অন্যান্য খাতেও কাটছাঁট
মূল এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া পরিবহন ও যোগাযোগ খাতও বড় ধরনের ছাঁটাইয়ের মুখে পড়েছে। এ খাতের বরাদ্দ ৫৮ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা থেকে ৩৫ শতাংশ কমিয়ে ৩৮ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা করা হয়েছে।
বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি কমেছে বিমানবন্দর-কমলাপুর এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে। এ প্রকল্পে মূল বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬৩১.৪৩ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপিতে ৯০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর চাহিদার ভিত্তিতেই সংশোধিত বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়। এ প্রকল্পের জন্য কোনো চাহিদা জমা না দেওয়ায় বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুট (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের বরাদ্দও প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে। ১ হাজার ৪৯০.৬৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে তা ৫৯২.৮০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া এখনও শেষ না হওয়ায় অর্থ ব্যয়ে বিলম্ব হচ্ছে।
বরাদ্দ কমানো অন্যান্য বড় প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, যার বরাদ্দের ৭৩.৩২ শতাংশ ফেরত যাচ্ছে। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে মূল বরাদ্দ ১ হাজার ৩৯.২৪ কোটি টাকা থেকে ৭০.৫২ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও বড় প্রভাব পড়েছে। এ খাতে বরাদ্দ ৭৩ শতাংশ কমিয়ে ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা থেকে ৫৪৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে ১৯ শতাংশ ও কৃষি খাতে ২১ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় সরকারে বরাদ্দ বৃদ্ধি
এসবের বিপরীতে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ খাতে সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ বেড়েছে। মূল ১০ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা থেকে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
স্থানীয় সরকার খাতেও সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ১২ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
