জাতীয় নির্বাচন: ৭৩.৪ শতাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল
সারাদেশে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া ৪৭৮ জনের মধ্যে ৩৫১ জনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বাতিল করা হয়েছে। দাখিল করা হলফনামায় ত্রুটি পাওয়ায় এসব মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এতে মোট স্বতন্ত্র প্রার্থীর ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশের মনোনয়ন বাতিল হলো, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরপেক্ষ–স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাঁটাই হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ২৭ জন, জামায়াতের ৯ জন, এনসিপির ২ জন এবং গণঅধিকার পরিষদের ২৮ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
মনোনয়ন বাতিলের বিপরীতে গতকাল সোমবার (৫ জানুয়ারি) থেকে আপিল কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিনেই নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন ৪২ জন।
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক গণমাধ্যমকে জানান, দায়ের করা ৪২টি আপিলের মধ্যে ৪১টি করা হয়েছে প্রার্থিতা পুনর্বহালের দাবিতে। আর একটি আবেদনে একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। নির্বাচন ভবনে আপিল গ্রহণের বুথ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সিইসি বলেন, "সবার সহযোগিতা পেলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব। বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ-পরিস্থিতিও সন্তোষজনক।"
গতকাল কিছু প্রার্থী আপিল দায়ের করলেও আরও অনেক প্রার্থী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও আপিল দাখিলের তথ্য জানতে ইসি কার্যালয়ে আসেন। তারা শিগগিরই আপিল জমা দেবেন বলে জানান।
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, "আমি দুই দিনে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর সংগ্রহ করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি, কিন্তু তা বাতিল করা হয়েছে। যারা আমার পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন, তারা চান আমি যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারি। তাই আমি আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।"
পটুয়াখালী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম ফজলুল হক বলেন, "এক শতাংশ সমর্থনের মধ্যে ২৯টি স্বাক্ষরে অসামঞ্জস্য দেখানো হয়েছে। রাজনৈতিক দল–সমর্থিত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই শর্ত নেই, অথচ স্বতন্ত্রদের ক্ষেত্রে আছে—এতে বৈষম্য তৈরি হয়।"
ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকার বলেন, "এক শতাংশ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও যাচাইয়ের সময় কয়েকজনকে না পাওয়ার অজুহাতে আমার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। আমি আপিল করেছি।"
জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের একে একরামুজ্জামানের প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন করেছেন বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নান। একরামুজ্জামান নবম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে পরাজিত হন। তবে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় পান।
গণঅধিকার পরিষদের সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ টিবিএসকে বলেন, "আমাদের জমা দেওয়া মনোনয়নগুলোর মধ্যে ৭৬টি বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১১টি বাতিলের খবর পেয়েছি। বাকি মনোনয়নগুলো কীভাবে বাতিল করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা চলছে। যেগুলো বাতিল হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আপিল কার্যক্রম চলমান রয়েছে।"
এদিকে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে আপিল গ্রহণের স্থান পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেকোনো বিষয়ে আপিল করতে পারেন। আমরা আবেদন গ্রহণ করব, পরে যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।"
এবারের নির্বাচনে ৩ হাজার ৪০৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। তাদের মধ্যে জমা দেন ২ হাজার ৫৬৮ জন। সবশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। সে নির্বাচনে যাচাই-বাছাই শেষে ৪২৩ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়।
নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী, গত ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করেন। ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে আপিল আবেদন গ্রহণ। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি এবং চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।
