নির্বাচনি ব্যয়: তারেক নিজের টাকায়, শফিকুর দলের অনুদানে, নাহিদের ভরসা ক্রাউন্ড ফান্ডিং
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে নিজের কৃষি খাত ও ব্যাংক আমানত থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান নিজের ১০ লাখ টাকা ও দলীয় ফান্ডের ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে চান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ টাকা এবং ক্রাউডফান্ডিং থেকে প্রাপ্ত অনুদানের মাধ্যমে ৪৪ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করেছেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীদের হলফনামাসহ যাবতীয় নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী জমা দিতে হয়, যা ইসি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে।
টিবিএস ৩০টি আসনের অন্তত ৭০ জন প্রার্থীর নির্বাচনের সম্ভাব্য ব্যয় বিশ্লেষণ করেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপির প্রার্থীরা অধিকাংশ সম্ভাব্য খরচই নিজের ফান্ড থেকে খরচ করবেন বলে উল্লেখ করছেন। জামায়াতের প্রার্থীরা নিজের ফান্ডের চেয়েও ডোনেশন ও দলীয় ফান্ডের ওপর বেশি নির্ভরশীলতা দেখিয়েছেন। আর এনসিপির অধিকাংশ প্রার্থী ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনে ব্যয় করবেন বলে উল্লেখ করেছেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ১৩তম সংসদ নির্বাচনের বিধিমালা অনুযায়ী, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। তবে ভোটার সংখ্যা আড়াই লাখের বেশি হলে জনপ্রতি ১০ টাকা হারে ব্যয়ের সুযোগ রয়েছে। এবার আড়াই লাখের নিচে ভোটার রয়েছে তিনটি আসনে; যেগুলোয় ২৫ লাখের বেশি অর্থ খরচ করার সুযোগ নেই। বাকি ২৯৭ আসনের প্রার্থীরা ২৫ লাখ টাকার বেশি খরচ করতে পারবেন।
বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়
তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তিনি প্রতি আসনেই তার নিজের কৃষি খাত ও ব্যাংক আমানত থেকে ৩০ লাখ টাকা নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন। বগুড়া-৬ আসনে ভোটারসংখ্যা ৪.৫৪ লাখ ও ঢাকা-১৭ আসনে ৩.৩৪ লাখ।
হলফনামা অনুযায়ী, তারেক রহমানের মোট সম্পদের পরিমাণ ১.৯৭ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৬.৭৬ লাখ টাকা, যা মূলত শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, বন্ড ও ব্যাংক আমানত থেকে অর্জিত।
তারেক রহমানের নিজের নামে নগদ ও ব্যাংক আমানত রয়েছে ৩১.৫৮ লা টাকা। আর তার স্ত্রীর নামে ৬৬.৫৫ লাখ টাকা এবং প্রায় ৯০.২৪ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠকুরগাঁও-১ থেকে নির্বাচন করছেন, যেখানে ভোটার সংখ্যা ৫.১২ লাখ। তিনিও ৫.১৬ লাখ টাকা সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় উল্লেখ করেছেন।
হলফনামায় মির্জা ফখরুল তার পেশা ব্যবসা হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বার্ষিক আয় ১২ লাখ টাকার বেশি। তার মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১.৫৩ কোটি টাকা। এর বাইরে তিনি একটি প্রাইভেট কার, ১০ ভরি স্বর্ণ ও একটি দুইনলা বন্দুকের মালিক। তবে এসবের মূল্য তিনি হলফনামায় অপ্রদর্শিত বলে উল্লেখ করেছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ কক্সবাজার-১ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে মোট ভোটারসংখ্যা ৫.৪০ লাখ। সালাহউদ্দিন নিজস্ব ফান্ড থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেছেন।
বিএনপির ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী আমানউল্লাহ আমানের নির্বাচনি এলাকায় ভোটার সংখ্যা ৪.১৯ লাখ; কিন্তু তিনি নির্বাচনের সম্ভাব্য ব্যয় উল্লেখ করেছেন ২৫.১৭ কোটি টাকা। তিনি নিজের ব্যবসা, বাড়িভাড়া থেকে ১৬.৯২ লাখ টাকা ও তার স্ত্রীর থেকে ২৫ কোটি টাকা দান হিসেবে সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন। তার সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারিত সীমার চেয়ে অন্তত ৬০ গুণ বেশি।
জামায়াত প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়
জামায়াতের আমির মো. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচন করছেন, যেখানে ভোটারসংখ্যা ৩.৫২ লাখ। তিনি নিজস্ব ফান্ড থেকে ১০ লাখ ও দলীয় ফান্ড থেকে ২৫ লাখ টাকার সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় দেখিয়েছেন—যা নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যেই রয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, কৃষি খাত ও অন্যান্য উৎস থেকে শফিকুর রহমানের বার্ষিক আয় ৩.৬ লাখ টাকা। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১.৫ কোটি টাকা। নগদ অর্থের হিসাবে তার হাতে রয়েছে ৬০.৭৬ লাখ টাকা।
শফিকুর রহমানের নামে ১৭.৭১ লাখ টাকা মূল্যের ২.১৭ একর কৃষি জমি রয়েছে। কৃষি খাত থেকে বছরে তার প্রায় ৩ লাখ টাকা আয় হয়। শেয়ার ও বন্ড খাতেও তার ২৭.১৭ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ থেকে নির্বাচন করছেন, যেখানে মোট ভোটারসংখ্যা ৪.০৩ লাখ। তিনি নির্বাচনে নিজ ফান্ড থেকে ২ লাখ টাকা, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে ১৩ লাখ টকা অনুদান এবং দলীয় ফান্ড থেকে ১৫ লাখ টাকা সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় দেখিয়েছেন।
হলফনামা অনুযায়ী, পরওয়ার নিজেকে একজন ব্যবসায়ী ও সাবেক শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি ব্যবসা থেকে বার্ষিক ৪.৬৭৫ লাখ টাকা আয়ের কথা জানিয়েছেন। তার ঘোষিত স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে অকৃষি জমি ও ভবন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১ কোটি টাকা। এসব সম্পদের অর্জনমূল্য ২২.৭২ লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তিনি নগদ ৫.৯ লাখ টাকা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৭.২৪৭ লাখ টাকা জমা থাকার তথ্য দিয়েছেন। এর বেশিরভাগ অর্থ ইসলামী ব্যাংকে রয়েছে।
জামায়াতের নায়েবে আমীর সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় ২৪ লাখ টাকা। কুমিল্লা-১১ আসনের প্রার্থী তাহের নিজ তহবিল থেকে ৩ লাখ টাকা এবং আত্মীয় ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে অনুবাদ বাবদ ২১ লাখ টাকা নির্বাচনি সম্ভাব্য খরচ দেখিয়েছেন। এই আসনে ভোটারসংখ্যা ৪.২২ লাখ।
হলফনামা অনুযায়ী, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ী তাহের চিকিৎসাসেবা খাতে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্মানী হিসেবে বছরে প্রায় ১০.৩৮ লাখ টাকা আয় করেন। তাহেরের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি টাকা, আর তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পদ ৪.৬৪ কোটি টাকা।
এনসিপি নেতারা ক্রাউড ফান্ডিং-নির্ভর
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ থেকে নির্বাচন করছেন। এ আসনে ভোটারসংখ্যা ৪.৩৯ লাখ। তিনি নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ টাকা এবং ক্রাউড ফান্ডিং হতে ৪৪ লাখ টাকাসহ মোট ৪৫ লাখ টাকা সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় দেখিয়েছেন। এ আসনে ভোটারসংখ্যা অনুযায়ী ব্যয় কিছুটা বেশি দেখিয়েছেন।
হলফনামা অনুযায়ী, পরামর্শক পেশা থেকে নাহিদের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকা। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৩২.১৬ টাকা। তার নিজের কাছে নগদ রয়েছে ১৯.৫ লাখ টাকা, ব্যাংকে জমা আছে প্রায় ৩.৮৫ লাখ টাকা।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪ থেকে নির্বাচন করছেন। এ আসনে ভোটারসংখ্যা ৫.১২ লাখ। তিনি সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় দেখিয়েছেন ৫০ লাখ টাকা। নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ টাকা এবং ক্রাউড ফান্ডিং থেকে বাকি ৪৯ লাখ টাকার উৎস দেখানো হয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, আখতার হোসেনের বার্ষিক আয় ৫.৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে চাকরি থেকে ২.৪ লাখ হাজার, ব্যবসা থেকে ১.৮০ লাখ ও কৃষি খাত থেকে ৮৫ হাজার টাকা আসে। তার অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে নগদ ১৩ লাখ টাকা এবং ঢাকার এক্সিম ব্যাংকের একটি হিসাবে ২.৯৯ লাখ টাকা রয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রীর কাছে নগদ ৪ লাখ টাকা রয়েছে।
আখতার হোসেনের স্থাবর সম্পদের মধ্যে রংপুরের কাউনিয়ায় পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত কিছু কৃষিজমি এবং ১০০ শতাংশের একটি প্লট রয়েছে, যা এখনো পারিবারিকভাবে বণ্টন করা হয়নি।
আরেক এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ কুমিল্লা-৪ থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে মোট ভোটারসংখ্যা ৪.১১ লাখ। তিনি সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে নিজস্ব তহবিল থেকে ১০.৫৭ লাখ টাকা এবং ক্রাউড ফান্ডিং থেকে ৩০ লাখ টাকা দেখিয়েছেন—যা মোট ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী ব্যয়সীমার মধ্যেই রয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, হাসনাতের বার্ষিক আয় ১২ লাখ টাকা এবং মোট সম্পদ ৫০ লাখ টাকার। ব্যাংকে তার ২৬ লাখ টাকার সোনা ও নগদ সাড়ে ১৩ লাখ টাকা রয়েছে। তিনি পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। তিনিসহ তার পরিবারের কারো নামে ব্যাংক বা আর্থিক কোনো প্রতিষ্ঠানে ঋণ নেই।
টিআইবি: প্রার্থীর ব্যয় নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যমতে, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা গড়ে ১.৫৬৮ কোটি টাকা করে খরচ করেছেন, যা ব্যয়সীমার ছয় গুণছিল।
৫০টি আসনের তথ্য নিয়ে গবেষণা করে টিআইবি দেখিয়েছিল, সংসদীয় আসনগুলোতে সবচেয়ে বেশি, গড়ে ১১.৪৫ গুণ বেশি ব্যয় করেছিলেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রার্থীরা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এক আসনে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ৩৮.৭৭ কোটি টাকা এবং সর্বনিম্ন ব্যয় ছিল ৭০ হাজার টাকা।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনসেবা। আর রাজনৈতিক পুঁজির একটি উপাদান হিসেবে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, 'সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্মের মতো প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানগুলো জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে চলে যায় এবং রাজনীতিকে একটি লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়।'
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত অর্থ বৈধ কি না, তার উৎস ও লেনদেন স্বচ্ছ কি না এবং ব্যয়ের জবাবদিহি আছে কি না—তদারকি সংস্থাগুলোর তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
