চট্টগ্রামে ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা, পথচারীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা এখন আর শুধু ফুটপাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা ক্রমেই সড়কের ওপর দখল বাড়াচ্ছেন। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং পথচারী ও যানবাহনের জন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অভ্যন্তরীণ জরিপ অনুযায়ী, নগরীর প্রায় ৭১ শতাংশ ফুটপাত বর্তমানে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অবৈধ ও অস্থায়ী দোকান এবং পার্ক করা যানবাহনের দখলে রয়েছে। এর ফলে বহু জায়গায় ফুটপাত কার্যত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে পথচারীদের বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কে নেমে হাঁটতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নগরীর জামালখান মোড়ে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হঠাৎ করেই দোকান, ভ্যান ও অস্থায়ী স্টলের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় এখন মানুষকে চলন্ত যানবাহনের মাঝ দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোড, মোমিন রোড, তেলিপট্টি রোড, কেবি ফজলুল কাদের রোড, জেএম সেন অ্যাভিনিউ ও জামালখান রোডসহ নগরীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে।
অর্থনৈতিক চাপে বাড়ছে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীর সংখ্যা
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা দ্রুত বিস্তারের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সংকট, মূল্যস্ফীতি, শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশের নানা প্রতিবন্ধকতা।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) তথ্যমতে, নগরীতে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার হকার বিভিন্ন স্থানে দোকান বসান। এতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ফুটপাত হকারদের দখলে থাকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ফুটপাতে দোকান বসানো আইনত অবৈধ হলেও বাস্তবতা অনেক জটিল। কর্মসংস্থানের বিকল্প না থাকায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে এই ধরনের ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ছাড়া একযোগে উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবসম্মত নয় এবং তা উল্টো সমস্যাই বাড়াবে।
তিনি পরামর্শ দেন, অতিরিক্ত বাজার, আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট এবং নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব।
ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশই শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, যারা আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে পড়াশোনার খরচ ও পারিবারিক ব্যয় মেটাতে এই পেশাকে বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে কম পুঁজিতে শুরু করা যায় বলে স্ট্রিট ফুড ব্যবসা তাদের কাছে বাস্তবসম্মত আত্মকর্মসংস্থানের পথ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬–২৭ লাখ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৮৪ হাজার, যা ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ জীবিকার জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নঈম উদ্দিন হাছান আওরঙ্গজেব চৌধুরী বলেন, 'ফুটপাতের ব্যবসার মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ করে এসব ব্যবসা বন্ধ করে দিলে বহু পরিবারের আয়ে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।' তাই নিরাপদ ও পরিকল্পিত বিকল্প ব্যবস্থার ওপর জোর দেন তিনি।
বাড়ছে দুর্ঘটনা, ঝুঁকিতে পথচারী
ফুটপাত দখলের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায়। ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিজ ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৬২ জন। এর মধ্যে ৩৬৮ জন বা ৫৬ শতাংশই পথচারী। এ পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির ২০টি শহরের তালিকায় ১২তম অবস্থানে রয়েছে।
ইয়ুথ পিপল অফ বাংলাদেশ–এর সভাপতি সিদরাতুল মুনতাহা বলেন, অবৈধ দোকান ও স্থাপনার কারণে নগরীতে তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে। এর ফলে জরুরি সময়ে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) জনসংযোগ কর্মকর্তা আমিনুর রশিদ বলেন, নগরীতে হকারের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশন উদ্যোগ নিলে পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। সিডিএর জরিপে আরও দেখা গেছে, নগরীর ৯৭ শতাংশ সড়ক আংশিকভাবে দখল হয়ে আছে এবং ৬৪ শতাংশ সড়কে নিরাপদ পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা নেই।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, 'ফুটপাত দখল উচ্ছেদে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি উচ্ছেদ সম্ভব নয়, কারণ এতে অনেকের জীবিকা সংকটে পড়বে।' তিনি জানান, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য অ্যাডিশনাল মার্কেট, আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট এবং নির্দিষ্ট সময় ও এলাকায় অস্থায়ী ব্যবসার স্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তাদের পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে ফুটপাত ও সড়ক দখলের সমস্যা এখন শুধু নগর ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থান ও জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। টেকসই সমাধান না এলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
