বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমাতে উসকানি: ‘মারো না কেন ওদের’— ছাত্রলীগের সাদ্দামকে ফোনে কাদের
চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে উসকানি, সরাসরি নির্দেশ এবং অর্থ সহায়তা করেছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সাবেক এই সেতুমন্ত্রী ছাত্র-জনতাকে কঠোর হস্তে দমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ সংগঠন) সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে। সেই ভয়ংকর নির্দেশনার একটি ফোনালাপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। নির্দেশনায় আন্দোলনকারীদের দমাতে ওবায়দুল কাদের সাদ্দামকে ধমকের সুরে বলেন, 'মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন'।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযোগ আমলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
এ মামলার অপর ছয় আসামি হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ওপর প্রথমে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। শুনানিতে তিনি সাত আসামির বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক অভিযোগ পড়ে শোনান। এর মধ্যে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ (কাউন্ট) আনা হয়, যার মধ্যে রয়েছে—নির্দেশনা, প্ররোচনা ও উসকানি।
কাদেরের বিরুদ্ধে আনা প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। ফোনালাপে শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনকে শক্ত হাতে দমনের নির্দেশ দেন তিনি। কথোপকথনের একপর্যায়ে সাদ্দামের উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, 'মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন'। তার এ কথায় উজ্জীবিত হয়ে সহিংসতায় জড়ান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
এছাড়া ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের 'রাজাকারের নাতিপুতি' বলে আখ্যায়িত করা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করেন ওবায়দুল কাদের, মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ শীর্ষ নেতারা। এর প্রেক্ষিতে আন্দোলন রুখে দিতে ১৫ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে 'আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব ছাত্রলীগ দেবে'—এমন বক্তব্যের মাধ্যমে উসকানি দেন ওবায়দুল কাদের।
পরদিন ১৬ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালাতে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম ও সাধারণ সম্পাদক ইনানকে অর্থ সহায়তা করেন তিনি। একইসঙ্গে ইন্টারনেট সেবার গতি কমাতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী পলককে নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়রকে ফোনে হত্যাযজ্ঞ চালাতে নানান উসকানি ও প্ররোচনা দেন তিনি। ওবায়দুল কাদেরের ধারাবাহিক এসব ষড়যন্ত্র ও উসকানিমূলক আচরণের জেরে ১৬ জুলাই রংপুরের আবু সাঈদ ও চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ছয়জন শহীদ হন এবং আহত হন আরও অনেকে।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ১৭ জুলাই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সারাদেশের আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান ওবায়দুল কাদের। এর পরদিন সবাইকে রাজপথে থাকারও নির্দেশ দেন। ১৯ জুলাই কারফিউ জারি ও দেখামাত্র গুলির কথা বলেন সাবেক এই মন্ত্রী। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আরাফাতসহ শীর্ষ নেতাদের নানাভাবে উসকে দেন তিনি। এসবের ফলশ্রুতিতে ১৮ ও ১৯ জুলাই দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি ছাত্র-জনতা প্রাণ হারান এবং বহু মানুষের অঙ্গহানি হয়।
তৃতীয় অভিযোগে ৩ আগস্ট থেকে ৫ আগস্টের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ৩ আগস্ট বৈঠক ডেকে বাহাউদ্দিন নাছিমসহ উপস্থিত শীর্ষ নেতাদের পাড়া-মহল্লায় প্রস্তুত থেকে আন্দোলন রুখে দেওয়ার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। সবমিলিয়ে জুলাই-আগস্টে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অন্যান্য যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার সবই শাস্তিযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে আন্দোলন নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্রমূলক সব বৈঠকে ওবায়দুল কাদেরের পাশে বাহাউদ্দিন নাছিম উপস্থিত ছিলেন। ৪ আগস্ট রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এক সমাবেশে আন্দোলনকারীদের জামায়াত-শিবির, রাজাকার ও আল-বদর তকমা লাগিয়ে নানান উসকানি ও প্ররোচনা দেন তিনি। তার এমন বক্তব্যে উজ্জীবিত হয়ে ১৩ জনকে হত্যা করা হয়।
প্রসিকিউশন মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে আওয়ামী লীগের 'হাইব্রিড নেতা' হিসেবে আখ্যায়িত করে জানায়, শেষ সময়ে তিনি সব বিষয়ে নাক গলাতেন। তার বিরুদ্ধেও উসকানি ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্যের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ১৫ জুলাই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বহিরাগত নেতাকর্মীদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন আরাফাত। তার সঙ্গে যুবলীগের পরশ, নিখিল এবং ছাত্রলীগের সাদ্দাম, ইনান, সৈকতসহ আরও অনেকে ছিলেন। ওই দিন অন্তত ৩০০ জন আহত হন।
১৯ জুলাই এক বক্তব্যে আরাফাত মন্তব্য করেন, 'পাঁচ বছর গুলি করলেও পুলিশের মজুত শেষ হবে না'। তার এই বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অতিউৎসাহী হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। এছাড়া ২০ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিষয়ে ফোনে কথা বলেন তিনি। ফোনালাপের একপর্যায়ে কাদের বলেন, 'মিডিয়ার যারা কথা শোনে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে'। জবাবে আরাফাত বলেন, 'ওই যে বন্ধ করে দিছি গতকাল। আজও বলে দিয়েছি। কথা না শুনলে ছাড় দেওয়া হবে না'।
অর্থাৎ ১৮ ও ২২ জুলাই সাময়িক সময়ের জন্য চারটি টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার মধ্যে ছিল চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, বাংলাভিশন, দেশ টিভি ও এনটিভি। এ সময় আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার সময় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির হাসনাত আবদুল্লাহর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন প্রসিকিউটর তামিম। এছাড়া ৪ আগস্ট সংসদ ভবন এলাকায় সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের 'সন্ত্রাসী' আখ্যা দেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশও কাদেরের সঙ্গে সব বৈঠকে উপস্থিত থেকে উসকানি ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। এর মধ্যে ১ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় ফোনে গোপন নকশা আঁকেন ওবায়দুল কাদের ও পরশ।
অন্যদিকে, ১২ জুলাই সিলেটে এক সম্মেলনে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন মাইনুল হোসেন খান নিখিল। ১৪ থেকে ১৮ জুলাই নানাভাবে ষড়যন্ত্রের ছক কষেন তিনি। এমনকি ১৯ জুলাই মিরপুরে অস্ত্র হাতে নিয়ে নিজেই আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়েছেন যুবলীগের এই সাধারণ সম্পাদক। ৩ ও ৪ আগস্ট ধানমন্ডি এলাকায় বৈঠকে নেতাকর্মীদের উসকে দেন তিনি। তার এসব উসকানিতে মিরপুরে ৬৯ জন ছাত্র-জনতা শহীদ হন এবং আহত হন আরও অনেকে।
ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ১৫ জুলাই বক্তব্য দেন, 'যারা আমি রাজাকার বলার হিম্মত দেখায়, তাদের শেষ দেখে ছাড়বে ছাত্রলীগ'। এই উসকানিতে ১৬ জুলাই ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় সারাদেশে ছয়জন শহীদ হন। ১৫ জুলাই আন্দোলন দমনে সরাসরি অংশ নেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি বানচালে ১৭ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তিনি। ফোনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাকে বিভিন্ন পরামর্শ দেন। এরই জেরে ১৮ জুলাই অনেক ছাত্র-জনতা প্রাণ হারান।
সুনির্দিষ্ট এসব অভিযোগ উপস্থাপন শেষে সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন প্রসিকিউটর তামিম। পরে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এ সম্পর্কিত আইন পড়ে শোনান। এরপর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেওয়ার পাশাপাশি সবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একইসঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৯ ডিসেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়।
