কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকের ঢল: সব জায়গায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট—বুধবার সকাল থেকেই সৈকতের এসব এলাকা পর্যটকে মুখরিত ছিল। দুপুরে আবহাওয়া গরম থাকলেও তা পর্যটকের সংখ্যা কমাতে পারেনি। সবাই যেন শহরের যান্ত্রিক জীবনের সব গ্লানি সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে এসেছেন।
ঈদের তৃতীয় দিন বুধবার সৈকতে ভিড় কমেনি; তবে পর্যটকদের ভোগান্তির কারণ ছিল অনেক। হোটেল কক্ষ ভাড়া থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ যাতায়াত, খাবারের দোকান—সব জায়গাতেই ছিল অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের হিড়িক।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদের প্রথম দিন ৩১ মার্চ সোমবার ৩০ থেকে ৪০ হাজার পর্যটকের দেখা মিলেছে। কিন্তু ঈদের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার এই পর্যটকের সংখ্যা লাখ অতিক্রম করেছে। আর বুধবার এ সংখ্যা ১ লাখ ৬০ থেকে ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার আবাসিক হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, কক্সবাজার শহরের আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস ও রিসোর্টের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ শতাধিক। এসব আবাসনে গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পর্যটক থাকতে পারেন। বুধবার এসব আবাসনের কোনো কক্ষই খালি ছিল না। আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পর্যটকরা হোটেল বুকিং করে রেখেছেন।

পর্যটকদের চাপ বেশি থাকলে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন—এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, 'আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। হোটেল মালিকদের বলা হয়েছে, যেন প্রতিটি হোটেলে কক্ষভাড়ার তালিকা টাঙানো থাকে। পর্যটকরা তালিকা দেখে কক্ষভাড়া পরিশোধ করবেন। কেউ এই নির্দেশনা না মানলে প্রশাসন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে।'
কক্সবাজার কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, মাঝারি আকারের কিছু হোটেলে ৫-৭ শতাংশ কক্ষ খালি থাকলেও পাঁচ তারকা মানের হোটেল-রিসোর্টগুলোতে কোনো কক্ষ ফাঁকা নেই। এতে অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, 'সৈকতে ভ্রমণ আনন্দের। কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ আদায় বিরক্তিকর। যে হোটেলে উঠেছি, সেখানে গত ডিসেম্বর কক্ষভাড়া ছিল সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এবার অগ্রিম বুকিং দেওয়ার পরও সাড়ে ৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এমনকি রেস্তোরাঁগুলোতেও খাবারের দাম অতিরিক্ত রাখা হচ্ছে।'
পেশায় শিক্ষক আবেদিন নাহিদ বলেন, 'কক্সবাজারে আসা মানেই আনন্দ। এখানের অথৈ নীল জল ও শীতল হাওয়া মনের ও শরীরের ক্লান্তি দূর করে দেয়। এখান থেকে ফিরে গিয়ে কর্মস্থলে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করা যায়।'

এদিকে, পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে লাইফগার্ড সদস্যরা। তারা সব সময় পর্যটকদের নির্দেশনা মেনে সাগরে নামার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানান সি-সেইফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার ওসমান গনি।
তিনি বলেন, 'সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অন্তত লাখ খানেক পর্যটক সমুদ্র সৈকতে এসেছেন। তাদের বেশিরভাগই সমুদ্রে নেমে স্নান করেছেন।'
পর্যটক হয়রানি রোধে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ সোহেল। তিনি জানান, সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি ঝরনা, ইনানী ও পাটুয়ারটেকের পাথুরে সৈকত, বার্মিজ মার্কেট, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক এবং রামুর বৌদ্ধ বিহারসহ কক্সবাজারের বিনোদন কেন্দ্রগুলো পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। এসব স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি জেলা পুলিশের টহলও রয়েছে। বসানো হয়েছে অভিযোগ কেন্দ্র। পর্যটকদের কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, 'পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চুরি-ছিনতাই রোধে অভিযান চালানো হচ্ছে। যানজট নিরসন ও পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতেও পুলিশ তৎপর রয়েছে।'

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, 'ঈদের ছুটিতে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া এবং রেস্তোরাঁগুলোতে খাবারের দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'