পান্ডা বন্ডসহ বিদেশি মুদ্রায় সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন
চীনের প্রস্তাবিত পান্ডা বন্ডসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌম বন্ড ইস্যু ও সম্প্রসারণে করণীয় নির্ধারণ, সম্ভাব্যতা যাচাই ও পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণিকে প্রধান করে গঠিত আট সদস্যের এই কমিটি বিশ্ববাজারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রায় বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে ইস্যুর পরিমাণ নির্ধারণ এবং কোন মুদ্রায় কী পরিমাণ বন্ড ইস্যু করা হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ দেবে।
একই সঙ্গে বন্ডগুলোর মেয়াদ, সুদের কাঠামো, ইস্যুর সময়, বাজার নির্বাচন এবং অন্যান্য আর্থিক ও কারিগরি বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে কমিটি।
কমিটির প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায় বন্ড ছাড়বে, যাতে ওই সব দেশের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে পারেন। বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ সরকার ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করবে। বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। বাংলাদেশ কখনো কোনো ঋণ পরিশোধে খেলাপি হয়নি। কাজেই আমরা অনেক বন্ড ছাড়তে পারব। আমরা সব বিষয় যাচাই-বাছাই করে সরকারকে সুপারিশ দেব।"
তিনি বলেন, "আমরা নিউইয়র্কের বাজারে বন্ড ইস্যু করলে তা ডলার বন্ড হবে, চীনের বাজারে ছাড়লে হবে পান্ডা বন্ড। জাপান ও হংকংয়ের বাজারে বন্ড ছাড়লে ওই সব দেশের মুদ্রায় তা ইস্যু করা হবে।"
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার বন্ডে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে আইনগত বাধা রয়েছে। এই বাধা দূর করতে উদ্যোগ নিতে হবে।
নবগঠিত কমিটির লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এই উদ্যোগ জাতীয় অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তানভীর বলেন, "দেশীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের বন্ডের সব বিকল্প আমরা পর্যালোচনা করব। একই সঙ্গে উভয় পুঁজিবাজারে সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় রাখা হবে।"
তিনি বলেন, "অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দক্ষ সদস্যদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী বিকল্প নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।"
তিনি বলেন, "অর্থায়নের ব্যয় কেবল একটি বিষয়। কোন ধরনের বন্ড ইস্যু করা হবে, কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হবে এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করা হবে।"
তিনি আরও বলেন, "এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করবে এবং বিদেশি স্থির-আয় ও ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় অগ্রাধিকার পাবে। বাংলাদেশকে বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা এই কমিটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।"
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামগ্রিক উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও গভীরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন্ড ও ইকুইটি বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি, কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকারকে সুপারিশ দেবে কমিটি।
পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজ, করপোরেট বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ড, অন্যান্য বন্ড ও ঋণপত্র ইস্যুর সম্ভাব্যতা, সময়োপযোগিতা, ব্যয়, ঝুঁকি ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে।
একই সঙ্গে ইকুইটি বাজারের গভীরতা ও তারল্য বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের বিকল্প উৎস সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত সুপারিশও দেবে কমিটি।
পান্ডা বন্ডের প্রস্তাব
গত মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগে সেদেশের সরকার বাংলাদেশকে চীনা মুদ্রায় পান্ডা বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব দেয়।
এ বিষয়ে আলোচনা করতে চীনের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা এসে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে দুই দেশের প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতেও পান্ডা বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীন একমত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
চলতি মাসের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের নেতৃত্বে সরকারের বিকল্প ঋণ অনুসন্ধান কমিটির সভায় পান্ডা বন্ডসহ বিদেশি মুদ্রায় বন্ড ইস্যুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
ওই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান শুরুতে ৫০ মিলিয়ন ডলারের পান্ডা বন্ড চালুর পক্ষে মত দেন।
সভায় ইআরডির সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জানান, পান্ডা বন্ড ইস্যু করতে চাইলে চীন বাংলাদেশকে সহায়তা করবে। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে আপত্তি আসতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ওই সভায় পান্ডা বন্ডসহ বিদেশি মুদ্রায় সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
বন্ড ইস্যু তদারকি
গত ২৬ জুলাই অর্থ বিভাগ আট সদস্যের কমিটি গঠন করে। এতে অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি, ইআরডির কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রতিনিধি রয়েছেন।
পাশাপাশি প্রয়োজন হলে কমিটি যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি বিশেষজ্ঞকে সদস্য হিসেবে কো-অপ্ট করতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে ইস্যুর পরিমাণ, মুদ্রা, মেয়াদ, সুদের কাঠামো, ইস্যুর সময়, বাজার নির্বাচন এবং অন্যান্য আর্থিক ও কারিগরি বিষয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে।
পাশাপাশি বন্ড ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফারিং সার্কুলার, ইনফরমেশন মেমোরেন্ডাম, ডিউ ডিলিজেন্স, ক্রেডিট রেটিং, রোডশো, ইনভেস্টর প্রেজেন্টেশন, ইনভেস্টর এনগেজমেন্ট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিল ও কার্যক্রম বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় করবে।
এ ছাড়া বন্ড ইস্যুর জন্য বুকরানার, লিড ম্যানেজার, ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার, লিগ্যাল অ্যাডভাইজার, রেটিং এজেন্সি, পেইং এজেন্ট, রেজিস্ট্রার, ট্রাস্টি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরামর্শক ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে।
একই সঙ্গে বন্ড ইস্যুর পর সেটেলমেন্ট, লিস্টিং, কুপন পরিশোধ, মূল অর্থ পরিশোধ, বিনিয়োগকারী সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য পরবর্তী কার্যক্রম তদারকি করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে।
পেনশন তহবিল, প্রবাসী বাংলাদেশি ও বীমা কোম্পানির বিনিয়োগ
দেশের ঋণবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, পেনশন তহবিল, বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, প্রবাসী বাংলাদেশি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রয়োজনীয় সুপারিশও করবে কমিটি।
এ ছাড়া দেশীয় পুঁজিবাজারে ইকুইটি, বন্ড, সুকুক এবং অন্যান্য উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে। পুঁজিবাজার, বন্ড বাজার ও ইকুইটি বাজারের উন্নয়নসংক্রান্ত সরকার কর্তৃক অর্পিত অন্য যেকোনো বিষয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও পরামর্শ দেওয়ার কথাও কমিটির কার্যপরিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
