বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড নিয়ে চীনের এক্সিম ব্যাংকের আলোচনা আজ
চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল আজ (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পান্ডা বন্ড ও ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) নিয়ে আলোচনা করবে।
এ আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন চীন আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে নিজেদের আর্থিক অবকাঠামো ও মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহী। অন্যদিকে বাংলাদেশও অর্থায়নের উৎস ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট চ্যানেল বৈচিত্র্যময় করার উপায় খুঁজছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, চীনা প্রতিনিধি দল দুটি উদ্যোগ নিয়ে তাদের প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা ও সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে মূল্যায়ন করবে।
তিনি বলেন, "চায়না এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দল আজ আসার কথা রয়েছে। তারা পান্ডা বন্ড ও ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) নিয়ে আলোচনা করতে চায়। তারা তাদের প্রস্তাব তুলে ধরবে, এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিবেচনা করবে এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না।"
একই সঙ্গে প্রতিনিধি দলটির অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেনে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাজনিত জটিলতার প্রেক্ষাপটে চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে তাদের পেমেন্ট নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
২০২৪ সালের মার্চে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) নিয়ে বৈঠক করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চীনের প্রস্তাবিত এ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সুইফট (SWIFT)-এর পর বাংলাদেশ ব্যবহার করতে যাওয়া দ্বিতীয় বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে একটি নস্ট্রো (Nostro) অ্যাকাউন্ট খুলেছে। নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট হলো এমন একটি ব্যাংক হিসাব, যা কোনো ব্যাংক বিদেশি ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রায় খোলা হয়ে থাকে।
বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংকের চীনে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার খুব সীমিত। কারণ অধিকাংশ বৈদেশিক লেনদেন এখনো মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়।
পান্ডা বন্ড কী?
পান্ডা বন্ড হলো চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক ব্যাংক বা বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে (আরএমবি) ইস্যুকৃত বন্ড।
সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান যখন চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ইউয়ানে অর্থ সংগ্রহের জন্য বন্ড ইস্যু করে, সেটিকে পান্ডা বন্ড বলা হয়। এ ধরনের বন্ডের মাধ্যমে বিদেশি ইস্যুকারীরা চীনা বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে।
এ ক্ষেত্রে ইস্যুকারী হিসেবে বিদেশি সরকার, বহুজাতিক কোম্পানি বা আন্তর্জাতিক ব্যাংক থাকতে পারে। বন্ডগুলো চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ইস্যু করা হয় এবং এর প্রধান বিনিয়োগকারী থাকেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এতে অংশ নিতে পারেন।
বিডার বৈঠকে গুরুত্ব পাবে বিনিয়োগ ইস্যু
বিডার নির্বাহী সদস্য ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রোচি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বিডার সঙ্গে প্রতিনিধি দলের একটি বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগ-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় আলোচ্যসূচিতে থাকবে।
তিনি বলেন, "সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার এজেন্ডায় রয়েছে। এটি বিডার সরাসরি বিষয় নয়।"
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় হলেও এর সুফল নির্ভর করবে নির্দিষ্ট কিছু শর্তের ওপর।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত বিকল্প হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুবিধা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থপ্রবাহের পরিমাণের ওপর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান কাঠামোয় চীনের সঙ্গে আমদানি বেশি হলেও রপ্তানি তুলনামূলক কম। ফলে শুধু সিআইপিএস বা ইউয়ানভিত্তিক লেনদেন চালু করলেই বড় ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে না। বরং চীনা বিনিয়োগ, ঋণ এবং প্রকল্প অর্থায়ন বাড়লে তা লেনদেন নিষ্পত্তিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ড. রাজ্জাক আরও বলেন, চীন যদি অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো প্রকল্প বা শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়ায়, কিংবা ইউয়ানে ঋণ প্রদান করে, তাহলে সেই অর্থপ্রবাহ ব্যবহার করে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন সহজ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় বাংলাদেশকে আবারও ডলার ব্যবহার করেই লেনদেন সম্পন্ন করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, "এটি একটি সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে। তবে বাস্তবে কতটা সুবিধা পাওয়া যাবে, তা ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও লেনদেন প্রবাহের ওপর নির্ভর করবে।"
