আজ সেপা সই করছে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া, ঢাকার জন্য উন্মুক্ত হবে ১১১ সেবা উপ-খাত
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট-এর (সেপা) চূড়ান্ত দরকষাকষি সম্পন্ন করেছে সরকার। চুক্তির খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ও আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং সম্পন্ন করে দুই দেশ আজ (৪ আগস্ট) চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন গতকাল টিবিএসকে নিশ্চিত করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি সই সম্পন্ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এর আগে জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) সই করে বাংলাদেশ।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের আগে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা সংরক্ষণ এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এই চুক্তি সই হচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অনেক রপ্তানি বাজারেই বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারাবে। তাই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই সিউলে অনুষ্ঠিত পঞ্চম ও শেষ রাউন্ডের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধির দীর্ঘ কৌশলগত আলোচনার পর এই সমঝোতা আসে।
আজ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সেপা নেগোসিয়েশন কনক্লুশন সিরিমনি শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদিরের প্রেস ব্রিফ করার কথা রয়েছে।
এদিকে এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়েও হান-কো গতকাল বাংলাদেশে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন জানান, তিনি সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
সাক্ষাতে দক্ষিণ কোরিয়ার মন্ত্রী প্রস্তাবিত সেপা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে বলেন, এ চুক্তি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে ও বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করবে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের খেলনা তৈরি, ইলেকট্রনিকস, টেলিযোগাযোগ, অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর ও জাহাজ নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ করতে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। জাহাজ নির্মাণ খাতে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
বৈঠকে তারেক রহমান দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকেও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বাজার সুবিধার সম্প্রসারণ
প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি বিশেষায়িত সেবা উপ-খাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ইতিহাসে কোনো উত্তরণমুখী বা স্বল্পোন্নত দেশকে সেবা খাতে এত বিপুলসংখ্যক উপ-খাতে বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
বিপরীতে বাংলাদেশও দেশীয় সংবেদনশীল অর্থনৈতিক খাত ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) সুরক্ষিত রেখে কোরীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য ৯৫টি সেবা খাত উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা বহাল থাকতে পারে।
এছাড়া নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে রুলস অভ অরিজিন সুবিধা নিশ্চিত করা; তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, আর্থিক সেবা ও শিক্ষা খাতে বাজারে প্রবেশের সুযোগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামোও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, সেপার ফলে বাংলাদেশের আইটি, সিভিল, মেকানিক্যাল ও শিপবিল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারদের পাশাপাশি মেরিন টেকনিশিয়ানদের জন্য কোরিয়ায় সাময়িক ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া সহজ হবে। বাংলাদেশের সফটওয়্যার ফার্মগুলো সরাসরি ডেটা প্রসেসিং ও ক্লাউড সেবা দিতে পারবে।
এ চুক্তির ফলে কোরীয় সমাজে নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট ও দক্ষ কেয়ারগিভারদের আইনি কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ
অন্যদিকে বাংলাদেশে মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনা ও ফাইভ-জি প্রযুক্তি প্রসারে বিশ্বখ্যাত কোরীয় প্রাক-প্রকৌশল ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলো সরাসরি যুক্ত হতে পারবে।
সিউলে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে প্রবর্তিত এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এপিটিএ) ও ডব্লিউটিও ব্যবস্থার অধীনে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৯৫ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১.৩৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৪৯১ মিলিয়ন ডলার ও আমদানি করে ৯০২ মিলিয়ন ডলার।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওভেন পোশাক, নিট পোশাক, হোম টেক্সটাইল, পাদুকাসহ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত খাবার, সিরামিক পণ্য, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, তাবু ও সিনথেটিক দডড়ি।
আর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক পণ্য, যন্ত্রপাতি, যান্ত্রিক সরঞ্জাম ও বয়লার, কাগজ এবং পেপারবোর্ড এবং ট্যানিং ও ডাইং এক্সট্র্যাক্ট।
