নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সংস্কার করা হবে: অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) জানানো হয়েছে নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, 'নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান (রেসপেক্ট টু দ্য ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট) বজায় রেখেই সংস্কারের কাজ পরিচালিত হবে। একইসঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে (সিকোয়েন্সিং) পরিবর্তন আনা হবে। যখন যেটা প্রয়োজন হবে, তখন সেটাই করা হবে।'
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকা সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
এসময় অর্থমন্ত্রী বলেন, 'একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচির (প্রোগ্রাম) ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আগে যেসব নীতিগত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর ওপরই এই কর্মসূচির ভিত্তি দাঁড়াবে।'
তিনি বলেন, 'এরই মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাকি পরিবর্তনগুলোও সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।'
প্রসঙ্গত, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে।
আইএমএফ জানায়, এটি একটি 'ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং স্টাফ ভিজিট'। এ সফরের উদ্দেশ্য সরকারের নীতিগত লক্ষ্য, সংস্কার কর্মসূচি ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়া এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে আইএমএফের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন প্রস্তুত করা।
এই সফরে প্রাপ্ত তথ্যই ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ঋণ আলোচনা শুরুর আগে আইএমএফের সামষ্টিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও নীতিগত অনুমানের ভিত্তি হবে। পাশাপাশি কোন কোন ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন, তাও নির্ধারণ করা হবে।
পাঁচদিনের এই সফরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প, রাজস্ব আহরণ, করনীতি ও সরকারি ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, সার ও খাদ্য ভর্তুকি, বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ, ব্যাংক পুনর্গঠন ও ব্যাংক রেজোলিউশন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক ঋণ এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ঝুঁকি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।
এ ছাড়া ব্যাংকিং খাত নিয়ে একটি পৃথক গোলটেবিল বৈঠকেও অংশ নিয়েছে প্রতিনিধি দলটি।
সফর শেষে আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আইএমএফ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৫% হতে পারে। তবে আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করা না হলে এই প্রবৃদ্ধির হার কমে ৩% নামতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে। এই সফরে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করার এবং সরকারের সংস্কারের অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ এখনও বড় ধরনের রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এই চাপ আরও বেড়েছে। এর ফলে আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বেড়েছে এবং ব্যাংকিং খাতের নানামুখী চাপের মধ্যেই নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।
তবে আইএমএফ এও বলেছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো দূর করতে পারলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে।
আইএমএফের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে 'গঠনমূলক আলোচনা' করেছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।
এতে আরও বলা হয়, নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য রূপরেখা, ঋণের আকার ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে সামনের মাসগুলোতে আলোচনা চলবে।
২০২৩ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট মোকাবিলায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের বহুমুখী ঋণ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ) যোগ হওয়ায় মোট ঋণের আকার দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর নতুন প্রশাসন ওই কর্মসূচি আর এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সরকারের যুক্তি, আগের সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হওয়া কয়েকটি সংস্কার শর্ত বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। এজন্য গত ১ জুন আগের ঋণ কর্মসূচি স্থগিত করে নতুন ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব করে আইএমএফকে চিঠি দেয় সরকার।
আইএমএফ এ প্রস্তাব মেনে নিয়ে প্রেস রিলিজ ইস্যু করে।
ইতোমধ্যে আগের কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ ৩.৫৯৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। বর্তমান সরকার এখন দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন একটি কর্মসূচির আওতায় ৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন চায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলমান সফরের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবরে আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক দরকষাকষি শুরু হতে পারে।
