পুঁজিবাজারে অনিয়মে ১,৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা, সালমানসহ অনেকে নিষিদ্ধ: সংসদে অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, আগের সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে সংঘটিত লুটপাট, কারসাজি ও দুর্নীতির ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১,৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
পাশাপাশি সাবেক নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আজীবন বা নির্দিষ্ট মেয়াদের নিষেধাজ্ঞা, লাইসেন্স বাতিল, মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রমও চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এমপি কামরুল হাসানের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বেক্সিমকো শেয়ার লেনদেনে কারসাজির ঘটনায় ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি জানান, আইএফআইসি গ্যারান্টেড শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড-সংক্রান্ত তদন্তে শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেডের ১ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যুতে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান এবং সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে আজীবনের জন্য অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সালমান এফ রহমানকে ১০০ কোটি টাকা এবং আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়া বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবন এবং সাবেক কমিশনার ড. শামসুদ্দিন আহমেদকে ৫ বছরের জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ারকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইএফআইসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, রিং শাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড থেকে মূলধন প্রত্যাহার-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া শারমিন এবং এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব এইচ মজুমদারকে পাঁচ বছরের জন্য পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেড কর্তৃক কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ২৫% শেয়ার অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রমও চলছে।
এছাড়া অ্যাকমি পেস্টিসাইডস লিমিটেড, আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এমারাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেড এবং বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল-ইস্তিসনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বিএসইসি শাস্তিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব ঘটনায় অনিয়ম ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে বিএসইসি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি পাঠিয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ব্যাংকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং মশিউর সিকিউ লিমিটেড-এর ব্রোকারেজ লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং অন্যগুলোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগে দুদকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কামরুল হাসানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্ত ইতোমধ্যে চলমান।
তিনি সংসদকে জানান, বিএসইসি পুনর্গঠন করে একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আরও একজন সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, "তাদের কাউকেই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিয়োগ প্রক্রিয়া এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমিও আগে থেকে তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না।"
তিনি বলেন, পুনর্গঠিত কমিশনের সব সদস্যই পুঁজিবাজার ও আন্তর্জাতিক মূলধনবাজারে অভিজ্ঞ পেশাজীবী। ফলে তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ নেই।
আমির খসরু বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুঁজিবাজার ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। গত দুই মাসে সূচকের যে অগ্রগতি হয়েছে, তা আগের পাঁচ বছরের তুলনায় বেশি। অধিকতর স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসাই এ উন্নতির মূল কারণ।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের সুশাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদারে সরকার ইতোমধ্যে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারী নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের মধ্যেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে আস্থা ফিরে এসেছে। হংকং, নিউইয়র্ক ও লন্ডনসহ বিশ্বের প্রধান আর্থিক কেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন ফান্ড ম্যানেজার ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সফর করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নির্ভরযোগ্য বাজারে পরিণত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও শেয়ারের দাম বৃদ্ধিও সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
