বড় ছাড় দিলেও রাজস্ব আদায় কীভাবে বাড়বে, সে হিসাব দিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের শুল্ক-করে বড় ছাড় দিলেও সরকার কর ফাঁকি রোধ করে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
তিনি বলেন, কর ছাড়ের পাশাপাশি ব্যবসায় খরচ কমানোর যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার ফলে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। এর মধ্য দিয়েও রাজস্ব আহরণ বাড়বে।
রোববার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত 'অর্থবিল, ২০২৭ বিশ্লেষণ' শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৪৫ লাখের বেশি করদাতা অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। গত অর্থবছরে ১৭ লাখ করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দিয়েছিলেন।
গত অর্থবছরে যারা ম্যানুয়ালি রিটার্ন দাখিল করেছেন, তাদের তথ্যও এনবিআরের তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ফলে সব করদাতাদের তথ্য এখন এনবিআরের কাছে আছে বলে জানান আবদুর রহমান খান।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, 'সব খাতেই কিছু ভালো করদাতা আছেন, আবার কিছু আছেন তারা ব্যাপকভাবে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। একই এলাকার একজন বাড়িওয়ালা অনেক বেশি কর দিচ্ছেন, আবার অনেকে খুবই কম কর দিচ্ছেন।
'যারা কম কর দিচ্ছেন, তাদের অডিট করে কর ফাঁকি রোধ করা হবে। সব খাতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে।''
সম্প্রতি পুলিশের সহায়তায় একটি বন্ডেড সুবিধাপ্রাপ্ত কোম্পানির ২০০ কোটি টাকা কর ফাঁকি উদঘাটনের তথ্য তুলে ধরে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কোম্পানিটি বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির পর কোনো রপ্তানি করেনি।
তিনি জানান, ৪ জুন এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের সদস্যরা কোম্পানিটির গোডাউন পরিদর্শনে গেলে তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে পুলিশের সহযোগিতায় গোডাউনে গিয়ে কোনো মালামাল পাওয়া যায়নি। এ ধরনের কর ফাঁকিবাজদের ধরে কর আদায় করবে এনবিআর।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে অটোমেটেড অডিট, মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছতা আনতে অটোমেশন ও ইন্টিগ্রেশন এবং করজালের আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 'বিপুলসংখ্যক মানুষ অটোমেটেড পদ্ধতিতে অডিটের আওতায় চলে আসবে। এতে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় হবে।'
অন্যদিকে তামাকজাত পণ্য বিপণনে কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর ফলে ফাঁকির সুযোগ কমে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এর ফলে দাম বাড়ানোর কারণে রাজস্ব আদায় ছাড়াও অবৈধ সিগারেট রোধ করে আরো ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়তি আদায় সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
আবদুর রহমান খান বলেন, 'রাজস্ব আদায় বাড়ানোর রূপরেখা নেই বলে, যে কথা বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। ..সব খাতে সায়েন্টফিক অডিট ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, কালেকশন বাড়বে।'
এ সময় বিভিন্ন খাতে যে ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রস্তাব করা হয়েছে, তা-ও তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়া সঞ্চয়পত্রে কর বাড়ানো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, তাতে বরং মোট করভার কমার সুযোগ আছে।
তিনি আরও বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। আগের অর্থবছরে জমির বিক্রেতাদের জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে। এবার ক্রেতাদের একই ধরনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে রাখা হবে কি না, তা সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে।
'প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী এনবিআর কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখেনি,' বলেন তিনি।
আবদুর রহমান খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডিরেগুলেশন আনতে পরিবেশ তৈরিতে প্রস্তাবিত বাজেটে 'অভূতপূর্ব' পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানিমুখী ব্যবসায়ীদের একটি বড় দাবি ছিল বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ। এতদিন যাদের নিজস্ব বন্ডেড ওয়্যারহাউস ছিল না, তারা বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতেন। নতুন বাজেটে এ সীমাবদ্ধতা দূর করা হয়েছে। এখন থেকে যেসব রপ্তানিকারকের যাদের বন্ডেড ওয়্যারহাউস নেই, তারাও বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনতে পারবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়বে।
তিনি জানান, যেসব ব্যবসায়ী বন্ডেড লাইসেন্স নিতে চান না কিন্তু শুল্কমুক্ত আমদানি করতে আগ্রহী, তাদের জন্যও নতুন সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে তারা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন।
অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সুবিধা নিয়েও সংস্কারের কথা তুলে ধরেন তিনি। আবদুর রহমান খান বলেন, এইও লাইসেন্সের আওতায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য খালাসের সুবিধা পান এবং তাদের পণ্য বন্দরে নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াই ছাড় করা সম্ভব হয়। কিন্তু অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আবেদন করছিল না।
'আমরা দেখেছি অডিট রিপোর্ট করদাতার হাতে থাকে না। তাই এইও সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অডিট রিপোর্টের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে, যাতে আরও বেশি ব্যবসায়ী এ সুবিধা নিতে পারেন,' বলেন তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, বন্ড ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণে একগুচ্ছ সংস্কার আনা হয়েছে, যা বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও সহজ করবে।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। অনুষ্ঠানে এনবিআরের বাজেট-সংশ্লিষ্ট সিনিয়র কর্মকর্তারা বাজেটের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
