হরমুজ দিয়ে সরবরাহে ব্যাঘাতের মধ্যে বাংলাদেশে পৌছেঁছে এলপিজির একটি চালান
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার পর থেকে এলপিজিবাহী মাত্র একটি জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছেছে। বন্দর তথ্য ও শিপিং সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থগিত রয়েছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে আর কোনো জাহাজ আসেনি, ফলে জ্বালানিবাহী অন্তত দুটি ট্যাংকার ওই অঞ্চলে আটকে রয়েছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে ছোট আকারের একটি এলপিজি ট্যাংকার, এমটি বিডব্লিউইকে বোর্নহোম গত ২৫ মার্চ ওমান উপসাগর হয়ে সীতাকুণ্ডে পৌঁছায়। জাহাজটি প্রায় ৩,৮০০ টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বহন করছিল।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সেখান থেকে এটিই প্রথম এলপিজি চালান যা বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
চালানটি আমদানি করে স্মার্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড।
চলতি মাসের শুরুতে সাতটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ও সীতাকুণ্ডে মোট ৩৯,৭১৬ টন এলপিজি সরবরাহ করে। তবে এগুলোর সবই সংঘাতপ্রবণ রুটের বাইরে থেকে এসেছে।
এর মধ্যে মর্নিং জেন মালয়েশিয়া থেকে দুই চালানে ৪,৯৬৮ টন এলপিজি আনে। সেন্না-৯ ও স্কুমি-৭ ভারত থেকে চালান আনে। এছাড়া এপিক সান্টার মালয়েশিয়া থেকে এবং পল সিঙ্গাপুর থেকে অতিরিক্ত চালান নিয়ে আসে।
আরেকটি জাহাজ, এলপিজি সেভান, ওমান থেকে ৭,০২০ টন এলপিজি নিয়ে এলেও উত্তেজনা বৃদ্ধির আগেই তা ফিরে যায়।
স্মার্ট গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মঈনুল আহসান বলেন, এলপিজির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর।
তিনি বলেন, "সংঘাত শুরুর পর থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে আমরা সাপ্লায়ারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি। আমাদের অনুরোধে এক সরবরাহকারী সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকেই একটি চালানের ব্যবস্থা করেছে।"
ট্যাংকারটির স্থানীয় এজেন্ট সিসাইড ট্রেডার্সের মালিক হুমায়ুন কবির জানান, জাহাজটি মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ওমানের দুকম বন্দর থেকে যাত্রা করে। পথে শ্রীলঙ্কায় আংশিক কার্গো খালাস করে বাকি অংশ সীতাকুণ্ডে আনলোড করে গত শুক্রবার ফিরে যায়।
হরমুজ রুট কার্যত বন্ধ
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু করে। এরপর তেহরানের পাল্টা হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র আকার ধারণ করে আঞ্চলিক উত্তেজনা।
পরবর্তীতে ইরানি কর্তৃপক্ষ হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে, যার ফলে পারস্য উপসাগরজুড়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৩ মার্চ ওমানের দুকম বন্দরের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলার ঘটনা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি, ওমান উপসাগর, বাব এল-মান্দেব হয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথকে আন্তর্জাতিক বার্গেইনিং ফোরাম 'যুদ্ধঝুঁকিপূর্ণ এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করেছে।
তিনি বলেন, "বর্তমানে ইরানের অনুমতি ছাড়া পারস্য উপসাগর থেকে কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না। এমনকি ওমান থেকে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।"
তিনি আরও জানান, এতে পরিবহন ব্যয়ও অনেকটাই বেড়েছে।
আটকে পড়েছে দুটি ট্যাংকার
বাংলাদেশগামী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। সূত্র জানায়, ঢাকা তেহরানের সহযোগিতা চেয়েছে এবং ইরানও ইতিবাচক সাড়া দিয়ে জাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
২৫ মার্চ বাংলাদেশ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আটকে থাকা জাহাজগুলোর তথ্য দিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়। তবে শনিবার পর্যন্ত দুটি ট্যাংকারই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি।
এই দুটি ট্যাংকারের একটি 'এমটি লিব্রেথা'। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে ৬২ হাজার টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে জাহাজটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আটকে আছে।
অন্য জাহাজ 'এমটি নরডিক পলুকস', যা সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল।
@সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ, এলএনজির ৬৫ শতাংশ এবং এলপিজির ৫১ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করেছে।
যদিও পরিশোধিত জ্বালানির বেশিরভাগ আমদানি অন্যান্য এশীয় দেশ থেকে আসে, তবে সেসব দেশও মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল—ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে বাংলাদেশও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক না হলে চালান বিলম্ব আরও বাড়তে পারে, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াবে।
তাদের মতে, নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হতে পারে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা এলপিজিসহ সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যয় বাড়াবে এবং অনিশ্চয়তা আরও গভীর করবে।
