ব্যাপক পুনঃতফসিলের ফলে চতুর্থ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে ৩০.৬ শতাংশ
বিদায়ী বছরের শেষ তিন মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির আওতায় ব্যাংকগুলো বড় পরিসরে ঋণ পুনঃতফসিল করায় খেলাপি ঋণ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা—যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। তিন মাস আগে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখেছে ২ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এই বড় ঘাটতি আমানতকারীদের জন্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
পুবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, "বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তার পর অনেক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। এতে বড় অঙ্কের একটা এমাউন্ট ঋণ খেলাপির তালিকা থেকে সরে গেছে।"
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২.১১ লাখ কোটি টাকা—যা মোট ঋণের প্রায় ১২.৫৬ শতাংশ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ আমলে লুকিয়ে রাখা ঋণ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এতে নতুন করে প্রায় ৪.৩৩ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সামনে আসে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৩.৪৫ লাখ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালের মার্চে তা বেড়ে হয় ৪.২০ লাখ কোটি টাকা বা ২৪ শতাংশ। জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬.০৮ লাখ কোটি টাকা বা ৩৪.৪০ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তা হয় ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা বা ৩৪.৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ হলো লুকানো ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আনা। আদায় না করে ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ এখন আর দেওয়া হচ্ছে না। বিদেশি অডিট ফার্ম দিয়ে কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ যাচাই করা হয়েছে। বিশেষ করে একীভূতকরণের আওতায় থাকা পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একত্রিত হয়ে যে সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক হয়েছে, তাদের খেলাপি ঋণের অঙ্ক অনেক বেড়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তিন মাস পর খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। ২০১৯ সালের আগে এ সময়সীমা ছিল ছয় মাস। বিশেষ সুবিধায় অনেক ক্ষেত্রে এক বছর সময়ও দেওয়া হতো।
ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির প্রভাবই খেলাপি ঋণের চিত্রে দেখা যাচ্ছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি গ্রুপ এবং বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি কিছু প্রচলিত ধারার ব্যাংকেও বড় ঋণ অনিয়ম হয়েছে।
কোন ব্যাংকে কত খেলাপি ঋণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ১.৫৮ লাখ কোটি টাকা—যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়ায় ১.৪৬ লাখ কোটি টাকা বা ৪৪.৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে কমেছে ১২ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ৪.৬৩ লাখ কোটি টাকা বা ৩৩.৭৫ শতাংশ। তিন মাসে কমেছে ৭৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৩.৮৯ লাখ কোটি টাকা বা ২৮.২৫ শতাংশ।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতেও তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৭৫১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে ছিল ১৯ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা বা ৪২ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা কমে হয়েছে ১৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা।
যেভাবে কমল খেলাপি ঋণ
গত বছরের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ নীতির মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয়। এতে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতারা মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন।
এই সুবিধায় সর্বোচ্চ দুই বছর গ্রেস পিরিয়ড পাওয়া যাবে। তবে ডাউনপেমেন্ট নগদে দিতে হবে, আগের কিস্তি এতে ধরা যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রায় ১,৫০০ প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার জন্য আবেদন করে। এর মধ্যে প্রায় ১,৩০০ প্রতিষ্ঠান নীতির আওতায় এসে ঋণ নিয়মিত করেছে।
সর্বশেষ খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ছাড় দিয়েছে। এখন ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিলেই পুনঃতফসিল করা যাবে। পাশাপাশি বাস্তবায়নের সময়সীমা আরও তিন মাস বাড়ানো হয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, "নীতি সহায়তার কারণেই ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমেছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে অনেক ঋণ নিয়মিত হয়েছে। আগে লক্ষ্য ছিল ২০ শতাংশের নিচে নামানো। এখন আশা করা হচ্ছিল ৩০ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব।"
তিনি বলেন, "কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামানো গেছে নীতি সহায়তার মাধ্যমে।"
এক বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নীতি সহায়তায় খেলাপি ঋণ কমানো ২০১৫ সাল থেকেই চলছে। তখন বড় ঋণ পুনর্গঠন বাড়ে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "২০২৭ সালে বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হলে আবার খেলাপি ঋণ বাড়তে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।"
