কেবল বিশ্বস্ত বিদেশি বিনিয়োগকারী থাকলেই আলোচনা: ‘নগদ’ নিয়ে আরমানের প্রস্তাব প্রসঙ্গে গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, নগদে বিনিয়োগে আগ্রহী কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগকারী থাকলেই কেবল সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানের ল' ফার্মের (আইনি প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে আলোচনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মুঠোফোনে আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রদানকারী নগদ- এ বিনিয়োগ প্রস্তাব সংক্রান্ত একটি চিঠির বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে গভর্নর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চিঠি পাননি তিনি।
তিনি বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই নথিতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগকারীর নাম উল্লেখ নেই। "কারা বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট খাতে তাদের কী অভিজ্ঞতা রয়েছে—আইনি প্রতিষ্ঠানটিকে তা স্পষ্ট করতে হবে," বলেন তিনি।
আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, "যদি বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর নাম গ্রহণযোগ্য হবে না।"
এর আগে আজ (২৩ ফেব্রুয়ারি) ব্যারিস্টার আরমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান 'নগদ'- এ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং তার ল' ফার্ম এক্ষেত্রে কেবল সমন্বয়ের কাজ করছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং শিগগিরই বিস্তারিত আলোচনার জন্য তাদের সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
"আমরা কেবল সমন্বয়ের কাজটাই করছি," বলেন আরমান।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি—১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে—জামায়াতের প্রয়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে আরমান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগের আগে কোম্পানিটির অবস্থান যাচাই করতে একটি অডিট পরিচালনার অনুমতি চান।
চিঠিতে আরমান লেখেন, আপনি ভালোভাবেই জানেন যে উক্ত বৈঠকটি আমার আগ্রহের বিষয় ছিল এবং উদীয়মান প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক খাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমার গভীর আগ্রহে আপনার সদয় সহায়তা কামনা করেছি।
এই স্বপ্ন ও সংকল্প আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি—দেশের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, ডিজিটাল ও ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী আর্থিক সেবা দেওয়ার মিশন নিয়ে। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে ইতোমধ্যে কয়েকজন সম্ভাব্য বিদেশি প্রতিনিধি আমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং এ ধরনের ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, একটি বৈঠকে তিনি "নগদ ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস"-এর বিষয়ে জানতে পারেন, যা আগের সরকারের সময় অনিয়মের অভিযোগের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
যথাযথ যাচাই-বাছাই (ডিউ ডিলিজেন্স) শেষে কোম্পানিটি নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করা হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়, "এমন একটি বিকল্প গ্রহণ করা আমার জন্য বড় সম্মান ও সুযোগ হবে।" সেখানে আরও বলা হয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার পর তারা পরবর্তী ধাপে এগোতে প্রস্তুত।
এই পরবর্তী ধাপে কোম্পানিটির আর্থিক, পরিচালনাগত ও ব্যবসায়িক অবস্থান—এর শক্তি, দুর্বলতা ও ঝুঁকিসহ—সম্পর্কে পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে একটি ফরেনসিক অডিট পরিচালনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, "সুতরাং, নগদ ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এই আর্থিক সেবার প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য ফরেনসিক অডিট পরিচালনার অনুমতি দিতে আপনার সর্বোচ্চ সহায়তা প্রত্যাশা করছি, যাতে ব্যবসা পরিচালনার সর্বোত্তম পরিকল্পনা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা যায়।"
এদিকে নগদের একজন শীর্ষ নির্বাহী জানান, তিনি এ ধরনের কোনো প্রস্তাবের বিষয়ে অবগত নন। তিনি বলেন, সাধারণত বিনিয়োগকারীরা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, নগদে বিনিয়োগের এটি সঠিক পদ্ধতি নয়, কারণ সরকার-নিযুক্ত নগদের স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ জমা দিয়েছে, যেখানে মালিকানা পুনর্গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
ওই রোডম্যাপ অনুযায়ী দুটি পথ রয়েছে—বলপ্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বা একতরফা পুনর্গঠন, এবং আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা।
পর্ষদের মতে, বলপ্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ নিলে জটিল আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে পুনর্গঠন তুলনামূলকভাবে সহজ, কারণ নগদ লিমিটেডের মালিকরা সমঝোতায় আগ্রহ দেখিয়েছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হলে কৌশলগত অংশীদার আকর্ষণ করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।
এর আগে গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ডাক বিভাগ 'নগদ' পরিচালনায় সক্ষম নয়। তিনি প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারিকরণের পরিকল্পনার কথা জানান।
তিনি তখন বলেন, তিন থেকে চার মাসের মধ্যে নতুন কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনা হবে।
আওয়ামী লীগের সরকার পরিবর্তনের পর ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক একজন প্রশাসক এবং ছয়জন সহকারী কর্মকর্তাকে সরাসরি কোম্পানি পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেয়।
পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিপিওর কর্মকর্তারা নগদের কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন।
এদিকে, নগদের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তানভীর আহমেদ মিশুকসহ কয়েকজন সাবেক নির্বাহী অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আইনি জটিলতায় পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ কামালসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত রিজার্ভ ছাড়াই ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করেছে।
পরবর্তীতে নগদের পুনর্গঠন কৌশল নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যা ইতোমধ্যে মালিকানা পরিবর্তন সংক্রান্ত কৌশল নিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ৩১ আগস্ট 'নগদ' বিক্রির জন্য একটি আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে আগ্রহপত্র প্রকাশ করে।
তবে গত দেড় বছরে 'নগদ'-এর মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে এখনো কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
