একটি ‘কুচক্রী মহল’ মার্জার হওয়া ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধার ঠেকাতে অপপ্রচার চালাচ্ছে: আহসান এইচ মনসুর
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, একটি 'কুচক্রী মহল' মার্জার হওয়া ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যর্থ করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এসব ব্যাংক আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি না মানা হলে বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলম বিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গভর্নরের 'স্বৈরাচারী' আচরণের প্রতিবাদে আজ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আয়োজিত এক সভা থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
ওই কর্মসূচির পর আজ দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রেস ব্রিফিংয়ে গভর্নর এসব কথা বলেন। তিনি জানান, ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার) ও দুর্বল ব্যাংক উদ্ধারের প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডকে তিনি 'ষড়যন্ত্র' ও 'অপপ্রচার' হিসেবে দেখছেন।
'কর্মকর্তাদের অপপ্রচার গ্রহণযোগ্য নয়'
বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে গভর্নর বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই সরকারি নীতিগত বিষয়ে প্রশ্ন তোলার। এটি তাদের আওতাভুক্ত বিষয় নয়। যারা অপপ্রচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শোকজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, শোকজের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।
'প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষা জরুরি'
আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। চাকরি করবো কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানবো না—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।'
কর্মকর্তাদের আন্দোলন ও পদত্যাগের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, 'পদত্যাগ কোনো ইস্যু নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।'
'এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়, সরকারকে জানানো হয়েছে'
বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করা হয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, 'এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে অবশ্যই সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই আমরা এগোচ্ছি।'
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং চলমান সংস্কারের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়া হবে।
আহসান এইচ মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭৬ লাখ আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩২ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
'ব্যাংক মার্জার স্টাফদের ইস্যু নয়'
গভর্নর বলেন, 'সাতটি ব্যাংকের পাঁচটির মার্জার কোনো স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের বিষয় নয়। এটি সরকারি নীতিগত ও পলিটিক্যাল ইকোনমির বিষয়। ৭৬ লাখ ডিপোজিটরের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা টাকা পাচ্ছিলেন না এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। এ অবস্থায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে সহায়তা দিয়েছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার থেকে দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ড থেকে দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। মোট সহায়তা ৩২ হাজার কোটি টাকা। 'এই অর্থের মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করছি। একবারে সব দেওয়া সম্ভব নয়, তবে আমরা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছি।'
এক্সিম ব্যাংকসহ দুর্বল ব্যাংকে বিশেষ সহায়তা
গভর্নর বলেন, কিছু ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থায় ছিল বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে তাদের টিকিয়ে রাখতে বড় অঙ্কের সহায়তা দিতে হয়েছে। 'এক্সিম ব্যাংককে আমরা ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লিকুইডিটি সাপোর্ট দিয়েছি। এছাড়া রপ্তানিকারকদের জন্য আরও ১ হাজার কোটি টাকা, পরে ৮৭৬ কোটি টাকা এবং সম্প্রতি আরও ১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা আনতে পেরেছি।'
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে ব্যাখ্যা
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে কর্মকর্তাদের দাবির বিষয়ে গভর্নর বলেন, 'চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকে সবসময় ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের নিয়োগ রয়েছে।'
সিএসআর তহবিলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (সিএসআর তহবিল) প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, 'আমাদের সিএসআর তহবিলে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা রয়েছে। এই অর্থ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বিতরণ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়ানো হবে।'
তিনি জানান, গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের সম্মিলিত মুনাফার চেয়েও বেশি।
