শেয়ারদরে কারসাজি: সিটি ব্যাংক, ফান্ড ম্যানেজারসহ ৭ জনকে জরিমানা
পুঁজিবাজারে কারসাজির অভিযোগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা– বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দ্য সিটি ব্যাংক, ব্যাংকটির তৎকালীন ফান্ড ম্যানেজার এবং আরও পাঁচ ব্যক্তিকে জরিমানা করেছে। ২০২৪ সালে পাঁচ মাসব্যাপী লেনদেনকালে অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ারদর প্রভাবিত করার অভিযোগে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির জানুয়ারি এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন রিপোর্ট অনুযায়ী, তদন্তকালীন লেনদেনে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মূলধনী ক্ষতি সত্ত্বেও সিটি ব্যাংককে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ব্যাংকটির তৎকালীন পোর্টফোলিও ম্যানেজার সানোয়ার খান, যিনি ওই সময়ে ক্যাপিটাল গেইন হিসেবে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা অর্জন করেন, তাকে ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তার স্ত্রী আসমাউল হুসনা ১৫ লাখ টাকা মুনাফা করলেও তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একইভাবে তার ভাই আনোয়ার পারভেজ খান ২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা মুনাফার বিপরীতে ২ লাখ টাকা জরিমানার মুখে পড়েছেন।
অন্যদের মধ্যে আবু তাহের শিকদারকে ৬৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা মুনাফার বিপরীতে ৬২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। উম্মে সালমা নিপাকে ১১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লোকসান সত্ত্বেও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিপ্লব শেখ ৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা মুনাফার বিপরীতে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানার আওতায় এসেছেন।
বিএসইসি জানায়, ২০২৪ সালের ২৫ জুন থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই কারসাজি সংঘটিত হয়। পর্যালোচনাধীন ৬৮টি লেনদেন দিবসে মোট ক্রয় পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার শেয়ার এবং বিক্রয় পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকার শেয়ার। এই সময়ে অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ারদর ২৫ জুনের ২৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১০ অক্টোবর ৪১ টাকা ২০ পয়সায় পৌঁছে যায়, যা প্রায় ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। পরবর্তীতে ১৮ নভেম্বর শেয়ারদর নেমে আসে ২৮ টাকা ৮০ পয়সায়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ–এর সার্ভেইলেন্স বিভাগের ট্রেড মনিটরিং তথ্য বিশ্লেষণ করে কমিশন দেখতে পায় যে, অভিযুক্ত পক্ষগুলো অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার লেনদেনে অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় ছিল এবং একাধিক তারিখে ধারাবাহিক লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ারদরে প্রভাব ফেলেছে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এমন ধারাবাহিক লেনদেন সম্পাদন করেছেন, যার মাধ্যমে বাজারে সক্রিয় লেনদেনের কৃত্রিম চিত্র তৈরি হয় এবং শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এভাবে তারা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ লঙ্ঘন করেছেন।
বিএসইসির কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে সিটি ব্যাংক জানায়, পূর্বে তাদের ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা করত ব্যাংকের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস লিমিটেড।
১০ জুন ২০২৪ থেকে সানোয়ার খানকে ক্যাপিটাল মার্কেট ফান্ড ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং শেয়ারবাজারে লেনদেন তদারকির পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। ফলে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় ও সিকিউরিটিজ বিশ্লেষণের দায়িত্ব ছিল তার একক কর্তৃত্বে।
ব্যাংকটি দাবি করে, সানোয়ার তার ব্যক্তিগত লেনদেন কিংবা আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে পরিচালিত লেনদেনের তথ্য ব্যাংককে জানাননি। ১৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে কমিশনের কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়ার পরই ব্যাংক এসব লেনদেন সম্পর্কে অবগত হয় বলে দাবি করা হয়। স্বাধীন ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন মনিটরিং ব্যাংকের ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও তদারকির আওতাভুক্ত নয় বলেও ব্যাংক জানায়। সানোয়ার বা তার আত্মীয়দের হিসাবে পরিচালিত লেনদেন সম্পর্কে ব্যাংকের কোনো পূর্বজ্ঞান বা প্রভাব ছিল না বলেও দাবি করা হয়।
সিটি ব্যাংক আরও জানায়, তদন্তকালীন সময়ে অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার লেনদেনে ব্যাংক ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বাস্তবায়িত ক্ষতির সম্মুখীন হলেও— ফান্ড ম্যানেজার ও তার পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার মুনাফা অর্জন করেন।
বিএসইসির অনুসন্ধানপত্র পাওয়ার পর ১৯ আগস্ট ২০২৫ থেকে সানোয়ার খানকে ফান্ড ম্যানেজার পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে বলে ব্যাংক জানায়। পাশাপাশি বিনিয়োগ নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন করে ব্যক্তিগত বা সংশ্লিষ্ট লেনদেন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নৈতিক নির্দেশিকা প্রবর্তন করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে কারসাজি দমনে নজরদারি জোরদার এবং বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি আরোপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার চলমান প্রচেষ্টার মধ্যেই এই প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা এলো—এমনটাই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
