বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপের মূল্যবৃদ্ধি: দেশের বাজারে বাড়ছে এমএস রডের দাম
বিশ্ববাজারে লোহার স্ক্র্যাপের (কাঁচামাল) দাম নতুন করে বাড়তে শুরু করায় বাংলাদেশে মাইল্ড স্টিল (এমএস) রডের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় রি-রোলিং মিলগুলো দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, যা আবাসন নির্মাতা ও ঠিকাদারদের মধ্যে নির্মাণ ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত এক সপ্তাহে আমদানিকৃত স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডলার বেড়েছে। এর মাধ্যমে গত এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার যে দীর্ঘ প্রবণতা ছিল, তাতে পরিবর্তন এল।
আমদানিতে অতিরিক্ত এই ব্যয় এখন স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি মিল ইতিমধ্যে রডের দাম টনপ্রতি ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর (বিএসএমএ) সভাপতি ও জিপিএইচ ইস্পাতের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বড় উৎপাদনকারীরাও খুব শিগগিরই দাম সমন্বয় করতে পারেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'চাহিদা কম থাকায় বাংলাদেশে প্রায় এক বছর ধরে রডের দাম কমতির দিকে ছিল। বর্তমানে এমএস রড গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু শীত শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপের দাম দ্রুত বেড়েছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।'
জাহাঙ্গীর আরও বলেন, শুধু বৃহস্পতিবারেই ঢাকার বাজারে রডের দাম টনপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে কোম্পানিগুলোকে শেষপর্যন্ত টনপ্রতি ৩-৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়াতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারদর পর্যালোচনাকারী সংস্থা আর্গাস-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালীন মন্দার সময় তুরস্কে হেভি মেল্টিং স্টিল (এইচএমএস) ১/২ (৮০:২০) স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি প্রায় ৩৩৬ ডলারে নেমে এসেছিল। তবে ডিসেম্বরের শুরুতে তা আবার ৩৬০-৩৭০ ডলারের ঘরে পৌঁছেছে।
সমুদ্রপথে স্ক্র্যাপ আমদানিতে তুরস্ক বিশ্বের বৃহত্তম দেশ হওয়ায় তারাই মূলত বিশ্ববাজারের দামের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্কের নতুন করে কেনাকাটা শুরু করা এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় শীতকালীন সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বাজারে স্ক্র্যাপের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে দাম বেড়ে গেছে।
সাধারণত শীতকালে পশ্চিমা দেশগুলোতে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ, পরিবহন ও বন্দর কার্যক্রম অনেকটাই ধীর হয়ে যায়। ফলে স্পট সরবরাহের গতি ধীর হয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি আমদানি বাজারে ভারতের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে স্ক্র্যাপ কার্গো পাওয়ার প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। ফলে বাংলাদেশি মিলগুলোর জন্য সুবিধাজনক শর্তে কাঁচামাল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবে বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উৎপাদনকারীরা পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ালেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামে খুচরা পর্যায়ে রডের দাম অনেকটা অপরিবর্তিত রয়েছে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও জামান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আসাদুজ্জামান জানান, বর্তমানে বাজারে প্রিমিয়াম গ্রেডের বিএসআরএম রড প্রতি টন ৮০ হাজার টাকায়, একেএস ও কেএসআরএম ৭৮ হাজার টাকায় এবং জিপিএইচ ইস্পাত ৭৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'এখনো কোনো কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়নি। তবে আমাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই দাম বাড়ানো হবে।'
অল্প কিছু মিল ইতিমধ্যে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ালেও বিএসআরএম ও একেএসের মতো বড় উৎপাদনকারীরা এখন পর্যন্ত দাম বাড়ানোর বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। কোম্পানি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরের শীতকালীন সময়ের তুলনায় এবার রডের চাহিদা তুলনামূলক কম। ফলে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
বিএসএমএর মহাসচিব ও রানী রি-রোলিং মিলসের চেয়ারম্যান সুমন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের চাহিদা বেশি থাকায় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টাতে দাম বাড়া একটি নিয়মিত চিত্র।
'বাংলাদেশে দাম নির্ধারণের কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা নেই। ফলে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে মিলগুলোকে ব্যক্তিগতভাবেই দামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়,' বলেন তিনি।
আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই দেশের ইস্পাত খাত দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না হওয়ায় মূলধনের ব্যাপক ক্ষয় হয়েছে, যার ফলে অনেক কারখানা শেষপর্যন্ত বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপের দাম বাড়ায় স্থানীয় উৎপাদনকারীদের সামনে দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।'
করোনাকালে বিশ্বব্যাপী স্ক্র্যাপের সংকটের সময় বাংলাদেশে প্রিমিয়াম গ্রেডের রডের দাম টনপ্রতি সর্বোচ্চ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে মন্দা ও স্থানীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় গত বছর রডের দাম ৭০-৮০ হাজার টাকায় নেমে আসে, যা ছিল গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বাংলাদেশে মূলত আবাসন, অবকাঠামো ও শিল্প খাতের ওপর ভিত্তি করে বছরে রডের চাহিদা প্রায় ৮০-৯০ লাখ টন। তবে দেশে রড উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টনেরও বেশি। চাহিদার তুলনায় এই অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে খাতটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত এক দশকে এ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে, যার মধ্যে বিএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাত, একেএস ও কেএসআরএমের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত। তা সত্ত্বেও নির্মাণকাজ ঝিমিয়ে পড়া ও কাঁচামালের দামের অস্থিরতার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্প খাতের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন ইস্পাতপণ্য উৎপাদিত হয়। এই উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখতে বছরে ৪২ লাখ টনেরও বেশি স্ক্র্যাপ ও বিলেট আমদানি করতে হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় বাজারে চাহিদা কম থাকলেও বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপের চড়া দামের কারণে আগামী সপ্তাহগুলোতে রডের বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।
