রডের দাম ১০ দিনে টনপ্রতি ১০,০০০ টাকা বাড়ল; সিমেন্ট বস্তায় ২৫ টাকা বেশি
দেশে সম্প্রতি নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে রড ও সিমেন্টের মতো প্রধান উপকরণের দাম গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে রডের দাম টনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে সিমেন্টের দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্ক্র্যাপ ও পরিবহন ব্যয়সহ আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া—যার পেছনে আংশিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কাজ করছে—এবং জাতীয় নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে নির্মাণকাজ বাড়তে শুরু করায় বাজারে এসব সামগ্রীর দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী।
রডের দামে ঊর্ধ্বগতি
বাজার সূত্রে জানা গেছে, ৭৫-গ্রেডের মাইল্ড স্টিল রড মিলগেট পর্যায়ে টনপ্রতি ৯০ হাজার থেকে ৯৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১০ দিন আগে একই গ্রেডের রডের দাম ছিল টনপ্রতি ৮০ হাজার থেকে ৮৩ হাজার টাকা।
প্রধান ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে বিএসআরএমের রড টনপ্রতি প্রায় ৯৫ হাজার টাকা, কেএসআরএম ৯১ হাজার টাকা, জিপিএইচ ৯২ হাজার টাকা এবং একেএস প্রায় ৯২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
৬০-গ্রেডের রডের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১০ দিনের ব্যবধানে টনপ্রতি প্রায় ৯ হাজার টাকা বেড়ে বর্তমানে এ গ্রেডের রড ৮৭ হাজার থেকে ৮৮ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এইচএম স্টিল, বিএসএল ও জেডএসআরএমের রড টনপ্রতি প্রায় ৮৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে আল-আকসা, মনতাহা, কদমতলী, ডিএসআরএম ও জেএসআরএম ব্র্যান্ডের রডের দাম প্রায় ৮৮ হাজার টাকা। ফ্রেশ, আইআরএমএল ও এইচকেজি ব্র্যান্ডের রড টনপ্রতি প্রায় ৮৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় বাজারের চারটি শীর্ষ ব্র্যান্ড—বিএসআরএম, আবুল খায়ের স্টিল (একেএস), জিপিএইচ ও কেএসআরএম—মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর থেকে রডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
সংঘাত শুরুর আগে এসব ব্র্যান্ডের রডের দাম টনপ্রতি ৮১ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকার মধ্যে ছিল। এরপর অধিকাংশ ব্র্যান্ডই টনপ্রতি প্রায় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। একই সময়ে মাঝারি মানের ব্র্যান্ডগুলোর রডের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চট্টগ্রামের মাদারবাড়ি এলাকার রড বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রাইম স্টিলের মালিক সুদীপ ঘোষ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর থেকেই রডের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, "গত ১০ দিনে বড় ব্র্যান্ডগুলো টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে রডের দাম।"
সিমেন্টের দামও বেড়েছে
দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর দাম বেড়েছে সিমেন্টেরও।
কনফিডেন্স সিমেন্টের রাজমিস্ত্রি গ্রিন ব্র্যান্ডের এজেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, গত তিন দিনের মধ্যে প্রায় সব সিমেন্ট ব্র্যান্ডই বস্তাপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে।
বাজার সূত্রে জানা গেছে, রুবি সিমেন্ট বস্তাপ্রতি প্রায় ৫২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কনফিডেন্স ও ডায়মন্ড ব্র্যান্ডের দাম ৫০০ টাকা। রয়্যাল সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৯৫ টাকায়, সেভেন রিংস ৪৯০ টাকায়, রাজমিস্ত্রি ৪৮০ টাকায় এবং প্রিমিয়ার সিমেন্ট ৪৭৫ টাকায়।
শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্মাণ খাতে দুর্বল চাহিদার কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে উৎপাদন খরচের নিচে সিমেন্ট বিক্রি করতে হয়েছে উৎপাদকদের।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয়ের ফলে বাজারদর কিছুটা উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।
তিনি বলেন, "প্রায় দেড় বছর ধরে স্থবির বাজারের কারণে আমাদের উৎপাদন খরচের নিচে সিমেন্ট বিক্রি করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধি উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে কিছুটা বাণিজ্যিক সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।"
কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিই দাম বাড়ার কারণ
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কিছুটা বাড়া এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি—এই দুই কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশে রড ও সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য কাঁচামালের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
এর ফলে রড উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল স্টিল স্ক্র্যাপ এবং সিমেন্টের মূল উপাদান ক্লিংকার আমদানির খরচ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিংকার বুকিংয়ের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ছে।
তিনি বলেন, "পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচও বেড়েছে। তাই সে অনুযায়ী আমাদের সিমেন্টের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে।"
স্ক্র্যাপের দাম ও সরবরাহচাপ
ইস্পাত উৎপাদকরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে স্ক্র্যাপের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আমদানিকৃত স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি প্রায় ৫০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬ হাজার টাকা বেড়েছে। যদিও এই বেশি দামের চালান এখনো বাংলাদেশে পৌঁছায়নি, তবু এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেশীয় বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প থেকে পাওয়া স্ক্র্যাপ—যা কাঁচামালের আরেকটি বড় উৎস—এর দামও টনপ্রতি প্রায় ৩ হাজার টাকা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৫৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চট্টগ্রামে স্ক্র্যাপ আমদানির মোট খরচ, পরিবহনসহ, টনপ্রতি প্রায় ৩৬০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্ক্র্যাপ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জাগুয়ার রিসোর্সেস অ্যান্ড ক্যাপিটালের কান্ট্রি হেড ইফতেখার আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হওয়ার পর পরিবহন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, "সংঘাতের আগেও স্ক্র্যাপের দাম কিছুটা বাড়ছিল। তবে পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার পর পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহকারীদের নতুন অফার পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে।"
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নির্মাণ খাতে দীর্ঘদিন দুর্বল চাহিদার কারণে অনেক কোম্পানিকেই উৎপাদন খরচের নিচে রড বিক্রি করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং রড উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের দরও শক্তিশালী হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "এই অতিরিক্ত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে রডের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।"
চাহিদা বাড়ায় আবার চালু হচ্ছে কারখানা
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রকল্প ধীর হয়ে যাওয়ায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণ খাত স্থবির ছিল।
এক পর্যায়ে রডের চাহিদা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, ফলে বেশ কয়েকটি ইস্পাত কারখানাকে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।
চট্টগ্রামেই গোল্ডেন ইস্পাত, বায়েজিদ স্টিল, শিমা স্টিল, সীতালপুর স্টিল এবং এসএস স্টিলসহ কয়েকটি কারখানা দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়েছে।
এইচএম স্টিলের পরিচালক মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরায় গত দুই সপ্তাহে এমএস রডের বিক্রি বেড়েছে।
তিনি বলেন, "যেসব কারখানা লোকসান নিয়ে চলছিল, এখন তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে শুরু করেছে।"
