নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আমদানিতে সেলস কন্ট্রাক্টের সীমা তুলে দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিতে ও আমদানি খরচ কমাতে সেলস কন্ট্রাক্ট-এর মাধ্যমে আমদানিতে বিদ্যমান সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাল, ডাল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেরর বাল্ক আমদানির সুবিধার্থে এই সীমা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।
বর্তমানে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করা যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে পণ্যের বাল্ক, অর্থাৎ বড় চালান আমদানি করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাধারণত সমুদ্রপথে নিত্যপণ্যের যেসব চালান আসে, সেগুলোর মূল্য ২০-২৫ লাখ ডলারের মধ্যে হয়, যা বর্তমান সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানির এই বিধিনিষেধ তুলে নিলে বাজারে দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা যাবে। এতে বাজারে কারসাজির সুযোগ কমার পাশাপাশি ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম কিছুটা সহনীয় থাকবে।
বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে সাধারণত ঋণপত্র ব্যবহৃত হয়। এলসির মাধ্যমে আমদানিতে দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতা থাকে, যা পণ্যের গুণগত মান ও অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা দেয়। এক্ষেত্রে ব্যাংক কার্যত গ্যারান্টরের ভূমিকা পালন করে। তবে এই প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে, সেলস কন্ট্রাক্ট হলো সরাসরি রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকের মধ্যকার চুক্তি, যেখানে ব্যাংক গ্যারান্টর হিসেবে থাকে না। ফলে এতে সময় ও খরচ দুটিই কম লাগে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এলসির মাধ্যমে ৬০.৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এই সময়ে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে এসেছে ৭.৬৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির মাত্র ১২.৬৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের শেষ দিকেই এই সীমা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'গভর্নরের অবস্থান পরিষ্কার—সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানি দ্রুত হয়, যা বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক। কিন্তু এখনো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।'
কয়েক মাস মোটামুটি স্থিতিশীল থাকার পর নিত্যপণ্যের দাম যখন আবার বাড়তে শুরু করেছে, তখনই এই উদ্যোগ নেওয়া হলো। মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরে কার্গো খালাসে দেরিকে দায়ী করছেন; অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বাজার তদারকির ঘাটতি রয়েছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা ও ডালের মতো রমজানের গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা বেড়েছে, যা খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
'এ ধরনের আমদানি বিধিনিষেধ অর্থনীতির জন্য ভালো নয়'
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর টিবিএসকে বলেন, 'এই ধরনের আমদানি বিধিনিষেধ অর্থনীতির জন্য ভালো নয়।'
তিনি বলেন, 'সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানি সহজ হলে বাজার শক্তিশালী হয় এবং মজুতদারি ঠেকানো যায়। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ নিত্যপণ্য আমদানিতে সেলস কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে।'
ইউরোপের অনেক দেশে ভোগ্যপণ্য আমদানি-রপ্তানিতে এলসির ওপর নির্ভরতা কম। সেখানে সেলস কন্ট্রাক্টে ব্যবহৃত হয় বেশি, ফলে জটিলতা কমে এবং বাজারে দ্রুত পণ্য সরবরাহ সম্ভব হয়।
ব্যাংকাররা বলছেন, এলসির মাধ্যমে আমদানিতে কমিশন, কনফার্মিং চার্জসহ নানা খরচ যোগ হয়, যা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঊর্ধতন কর্মকর্তা জানান, ২০ লাখ ডলারের একটি এলসিতে শুধু কমিশন ও কনফার্মিং চার্জেই প্রায় ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
অন্যদিকে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানিতে কেবল একটি ওপেনিং চার্জ লাগে, যা প্রায় ১০০ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক বিদেশি বিক্রেতাই এখন এলসির পরিবর্তে সেলস কন্ট্রাক্টে পণ্য পাঠাতে আগ্রহী। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিধিনিষেধের কারণে দেশের আমদানিকারকরা সেই সুযোগ নিতে পারছেন না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'সেলস কন্ট্রাক্ট অবারিত করা হলে খাতুনগঞ্জের ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় গ্রুপগুলোও উপকৃত হবে।'
বাজার প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে নমনীয়তা প্রয়োজন
বর্তমানে বাংলাদেশের ৬০-৭০ শতাংশ রপ্তানিই সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের নমনীয়তা ও সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানির শর্ত সহজ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন চেয়েছে।
তিনি বলেন, 'সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করলে খরচ কম হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক চায় বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে সেলস কন্ট্রাক্টে পণ্য আমদানি করা হোক।' তবে এলসি খোলার সময় বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার রোধে সতর্ক থাকার ওপরও তিনি জোর দেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, কৃত্রিম সংকট ও মূল্য কারসাজি রোধে দ্রুত আমদানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, 'যদি ব্যবসায়ীরা জানেন, দাম বাড়ালেই সঙ্গে সঙ্গে আমদানি আসবে, তাহলে বাজার ম্যানিপুলেট [কারসাজি] করার প্রবণতা কমে যাবে।'
ব্যবসায়ী নেতারাও একই মত পোষণ করেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এলসিতে আমদানিতে অতিরিক্ত চার্জের কারণে তার একবার ৪ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। 'সেলস কন্ট্রাক্টে হলে এই ক্ষতি হতো না।'
মেঘনা গ্রুপের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, সেলস কন্ট্রাক্টের সুযোগ তৈরি হলে আমদানি খরচ কমবে, যার সুফল সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে যাবে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, সেলস কন্ট্রাক্টের সীমা তুলে দিলে আমদানিকারকরা প্রয়োজনীয় নমনীয়তা পাবেন, যা শেষপর্যন্ত দেশেরই উপকারে আসবে।
