বাজার থেকে যেদিন জিলেট উধাও হয়ে গেল, শেভ করা হয়ে উঠল কঠিন
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র নির্বাহী সাইফুল আলম (৫০)। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাকে শেভিং বা দাড়ি কামানো নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয়নি। শুরুতে জিলেটের সাধারণ রেজর, এরপর ম্যাক-থ্রি এবং বছর পাঁচেক আগে জিলেট ফিউশন—এভাবেই চলছিল তার নিত্যদিনের শেভিং। বছরের পর বছর তার এই অভ্যাসে কোনো ছেদ পড়েনি।
কিন্তু মাস ছয়েক আগে হঠাৎ করেই তার এই রুটিনে ছন্দপতন ঘটে।
পাড়ার দোকান থেকে শুরু করে স্বপ্ন বা মীনা বাজারের মতো সুপারশপ, এমনকি কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকান—কোথাও ফিউশন ব্লেড খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়ে তাকে অন্য ব্র্যান্ডে ঝুঁকতে হয়েছে।
এখন তিনি সপ্তাহে একদিন সেলুনে যান। সাইফুল জানান, এর আগে কখনো এমনটা করেছেন বলে তার মনে পড়ে না।
সাইফুল বলেন, 'আমি গত কয়েক মাস ধরে ফিউশন ব্লেড খুঁজছি। ঢাকার সব জায়গায় দেখেছি। এই সপ্তাহে শুনলাম আমার এক বন্ধু ভারতে যাচ্ছে, তাই তাকে বললাম আমার জন্য কয়েকটা ব্লেড নিয়ে আসতে।'
সাইফুলের এই অভিজ্ঞতা আসলে শহুরে ভোক্তাদের এক বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। গত বছর জিলেটের মূল কোম্পানি মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল (পিঅ্যান্ডজি) বাংলাদেশের বাজার থেকে তাদের পণ্য সরিয়ে নেয়। ফলে লাখ লাখ নিয়মিত ও বিশ্বস্ত ব্যবহারকারী বিকল্প খুঁজতে গিয়ে এখন হিমশিম খাচ্ছেন।
প্রায় তিন দশক আগে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করেছিল পিঅ্যান্ডজি। জিলেট, ওরাল-বি, হুইসপার, হেড অ্যান্ড শোল্ডার্স, প্যানটিন, ওলে, এরিয়েল ও টাইডের মতো ব্র্যান্ডগুলো দিয়ে তারা একটি শক্তিশালী গ্রাহক ভিত্তি তৈরি করেছিল। এসব পণ্যের অনেকগুলোর বিকল্প বাজারে থাকলেও জিলেট রেজর, বিশেষ করে ম্যাক-থ্রি ও ফিউশন ব্লেডের অভাব পূরণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, অনেক ক্রেতা প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাননি যে ব্র্যান্ডটি বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে।
আগোরা-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার নূর-ই-বোরহান বলেন, 'ক্রেতারা ঢাকার একাধিক দোকানে খোঁজ করেন। শেষে ফিরে এসে বলেন, "ঠিক আছে, এখন বিশ্বাস হচ্ছে যে সত্যিই সংকট তৈরি হয়েছে।"'
ঘাটতি পূরণে অনানুষ্ঠানিক আমদানি
জিলেট ইন্ডিয়ার সঙ্গে বিতরণ চুক্তি শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পিঅ্যান্ডজি বাংলাদেশ থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় ৩১ ডিসেম্বর থেকে। এরপর বাংলাদেশে পিঅ্যান্ডজির একমাত্র পরিবেশক এমজিএইচ গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ডস লিমিটেডের (আইবিএল) সঙ্গে তাদের চুক্তি শেষ হয়ে যায়।
যদিও পিঅ্যান্ডজি বলেছিল যে আইবিএল স্বাধীনভাবে তাদের পণ্য আমদানি ও বিক্রি চালিয়ে যেতে পারবে, কিন্তু সেই পরিকল্পনা কাজে আসেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমজিএইচ গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা ব্যাংকক ও দুবাই থেকে জিলেট ও হেড অ্যান্ড শোল্ডার্সের মতো পণ্য আমদানির চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আর্থিকভাবে সেটি লাভজনক ছিল না। কারণ অনানুষ্ঠানিক আমদানিকারকরা—যারা যাত্রী বেশে পণ্য নিয়ে আসেন—তারা শুল্ক ফাঁকি দেন। ফলে বৈধভাবে আমদানি করে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হয় না।'
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এমজিএইচ যখন পিঅ্যান্ডজির অনুমোদিত পরিবেশক ছিল, তখন বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো ছিল যে অন্য কেউ এই পণ্য আমদানি করলে তা অবৈধ বলে গণ্য হবে। 'সেই আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থাটি এখন আর নেই।'
ডলার সংকটে ঘাটতি আরও তীব্র
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যাটি কেবল পিঅ্যান্ডজির চলে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর শিকড় আরও গভীরে।
ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (আইডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ বিন তাজ বলেন, ২০২২ সালে ডলার সংকট এবং টাকার মান দ্রুত কমে যাওয়ার কারণে আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে শুরু করে।
তিনি বলেন, 'শুরুতে যা ছিল সাময়িক ধাক্কা, এখন তা কাঠামোগত সংকোচনে পরিণত হয়েছে।' তিনি আমদানিতে কড়াকড়ি, ঋণপত্রের (এলসি) সীমা বেঁধে দেওয়া, চড়া শুল্ক, শুল্ক মূল্যায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা ও টাকার মান ক্রমাগত কমতে থাকাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আশরাফ আরও বলেন, 'অত্যাবশ্যকীয় নয়, এমন পণ্য আমদানিতে অগ্রাধিকার কমানো হয়েছে—যার নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ভোক্তা ইকোসিস্টেমের ওপর।'
ভোক্তাদের অভ্যাসে পরিবর্তন
ভোক্তারা বলছেন, পণ্যের এই সংকট তাদের দৈনন্দিন কেনাকাটার ধরন বদলে দিয়েছে।
গুলশানের বাসিন্দা রেশমা আরা জানান, এখন একটি সাধারণ লোশন কিনতেও তাকে চার-পাঁচটি সুপারশপে ঘুরতে হয়। 'অধিকাংশ ব্র্যান্ডই এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না,' বলেন তিনি।
শারমিন হক নামের আরেক ক্রেতা বলেন, অনলাইনে কিছু পণ্য দেখা গেলেও সেগুলোর দাম আকাশচুম্বী অথবা সপ্তাহের পর সপ্তাহ স্টক আউট থাকে।
খুচরা বিক্রেতারাও ক্রেতাদের আচরণে এই দৃশ্যমান পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেন।
ইউনিমার্ট গুলশানের ম্যানেজার আবিদ হাসান বলেন, 'অনেক ক্রেতা নির্দিষ্ট বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতি খুবই লয়্যাল এবং বারবার সেগুলোই খোঁজেন। বাজারে দেশীয় বিকল্প থাকলেও অনেক ক্রেতা তাদের অভ্যাস বদলাতে চান না।'
আগোরার তথ্য অনুযায়ী, তিন বছর আগেও তাদের মোট বিক্রির ৪৫ শতাংশ আসত আমদানিকৃত পণ্য থেকে, যা এখন কমে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কসমেটিকস, গ্রুমিং ও স্কিনকেয়ার পণ্যগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পিঅ্যান্ডজির আগমন ও প্রস্থান
এমজিএইচ গ্রুপের সঙ্গে পরিবেশক চুক্তির মাধ্যমে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পিঅ্যান্ডজি। ২০২১ সালে তারা প্রাণের সঙ্গে যৌথভাবে স্থানীয় উৎপাদন শুরু করে নিজেদের অবস্থান আরও জোরালো করে। সে সময় স্বল্পমূল্যের জিলেট রেজর উৎপাদনের জন্য তারা ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিল।
তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোম্পানিটি হঠাৎ করেই তাদের বিতরণ চুক্তিগুলো বাতিল করে—প্রথমে জিলেট ইন্ডিয়া ও পরে এমজিএইচ গ্রুপের সঙ্গে। ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই অংশীদারত্বের অবসান ঘটে। এদিকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকেই প্রাণের এপিসিএল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
প্রাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াস মৃধা জানান, কারখানাটি পুরোদমে প্রস্তুত থাকলেও এখন অলস পড়ে আছে। তিনি বলেন, 'আমাদের কারখানা প্রস্তুত, যন্ত্রপাতিও তৈরি। কিন্তু পিঅ্যান্ডজি উৎপাদন স্থগিত রেখেছে। তারা অনুমোদন দিলেই আমরা পুনরায় কাজ শুরু করব।'
