ঈদের আগে প্রসাধন সামগ্রীর বিক্রি বেড়েছে
ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দেশের প্রসাধন পণ্যের বাজারে শুরু হয়েছে কেনাকাটার জোয়ার। পোশাক কেনার পাশাপাশি ঈদের সাজ সম্পূর্ণ করতে প্রসাধনী কেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতারা। শপিং মল থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের দোকানে প্রসাধন সামগ্রীর কাউন্টারে লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন ও ত্বকের যত্নের নানা পণ্য ঘুরে ঘুরে দেখছেন তারান।
ঈদের আনন্দে নতুন পোশাক কেনাটাই প্রধান আকর্ষণ হলেও অনেকের কাছেই এখন কেনাকাটার তালিকায় প্রসাধন সামগ্রী সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের সাজ পরিপূর্ণ করতে মানুষ সাধারণত রমজানের শেষ সপ্তাহগুলোতে এসব পণ্য বেশি কেনেন। ফলে এই সময়ে প্রসাধন সামগ্রীর বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।
এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের সৌন্দর্য ও পার্সোনাল কেয়ার খাতের বিস্তৃতি ও এর প্রভাবের প্রতিফলন। মানুষের আয় বৃদ্ধি, শহুরে জীবনযাত্রা ও পরিপাটি থাকার প্রতি আগ্রহ বাড়ার কারণে দেশের কসমেটিকস, টয়লেট্রিজ ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার বাজার এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার শিল্পে পরিণত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রসাধনীর দোকানে উৎসবের ভিড়
ঢাকার বড় বড় বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রসাধনীর দোকানগুলো মেকআপ প্যালেট, স্কিনকেয়ার সামগ্রীর বোতল ও রূপচর্চার নানা অনুষঙ্গের রঙিন পসরায় সাজানো। বিক্রেতারা জানান, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে দোকানে ক্রেতাদের ভিড়ও তত বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণী ও কর্মজীবী নারীদের উপস্থিতি এসব দোকানে সবচেয়ে বেশি।
এবারের ঈদ মৌসুমে মেকআপ সামগ্রীর মধ্যে লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন, কনসিলার, আইলাইনার, মাসকারা, ব্লাশ, হাইলাইটার ও আইশ্যাডো প্যালেটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত পণ্য—যেমন সানস্ক্রিন, ফেস সিরাম, ফেস ওয়াশ, ময়েশ্চারাইজার ও শিট মাস্কও সমানতালে বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর ক্যাপিটাল সুপার মার্কেটের কানিজ কসমেটিকসের বিক্রেতা শরীফ ইসলাম জানান, উৎসবের এই মৌসুমে রূপচর্চার সামগ্রীর চাহিদা চোখে পড়ার মতো বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, 'মেকাপ প্রোডাক্টস বিক্রি সারা বছরই হয়। তবে ঈদের সময় বেচাকেনা একটু বাড়ে।'
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও দেশীয় পণ্যের কদর
দেশের বর্তমান কসমেটিকস বাজারে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উভয় পণ্যের চাহিদা রয়েছে। যেসব তরুণ ক্রেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে বিশ্বব্যাপী রূপচর্চার ট্রেন্ড অনুসরণ করেন, তাদের কাছে কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পণ্যগুলো বেশ জনপ্রিয়।
একইসঙ্গে বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার উপযোগী পণ্য তৈরি করে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোও ধীরে ধীরে ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
ই-কমার্সের দ্রুত প্রসার এই খাতকে বদলে দিয়েছে। বর্তমানে রূপচর্চা নিয়ে কাজ করা অনেক উদ্যোক্তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ফলে ক্রেতারা এখন সশরীরে দোকানে না গিয়েও ঘরে বসে অনায়াসেই পছন্দের প্রসাধন সামগ্রী কিনতে পারছেন।
অনলাইনে কেনাকাটা পাল্টে দিচ্ছে ক্রেতাদের অভ্যাস
দোকানমালিকরা বলছেন, অনলাইনে কেনাকাটা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরনেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে।
কসমেটিকস বিডি শপের বিক্রয়কর্মী নাজনীন আক্তার জানান, এবারের মৌসুমে তাদের দোকানে অনলাইনে আসা অর্ডারের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, 'এবারে আমাদের অনলাইন পেজে ক্রেতার চাপ বেশি। দোকানে আগেরবারের মতো ফ্লো না থাকলেও বিক্রি চলছে ইন্টারনেটে।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রসারের ফলে ক্রেতারা এখন ঘরে বসেই নতুন নতুন ব্র্যান্ড ও ট্রেন্ড সম্পর্কে সহজেই জানতে পারছেন।
জনপ্রিয় হচ্ছে 'সফট গ্ল্যাম' সাজ
ক্রেতারা বলছেন, এবার ঈদের সাজে 'সফট গ্ল্যাম' বা হালকা মেকআপের প্রবণতা বেশি। গরম আবহাওয়ার কারণে অনেকেই লাইটওয়েট ফাউন্ডেশন, নিউড বা প্যাস্টেল রঙের লিপস্টিক এবং মিনিমাল আই মেকআপ বেছে নিচ্ছেন। পাশাপাশি ত্বককে সতেজ ও উজ্জ্বল দেখায়—এমন পণ্যের চাহিদাও বেশ বাড়ছে।
বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে পোশাক কেনা শেষে মেকআপের সামগ্রী খুঁজছিলেন মারিয়া। জানালেন, ঈদের দিন সাদামাটা সাজেই নিজেকে দেখতে পছন্দ করেন তিনি।
মারিয়া বলেন, 'আমি স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টস বেশি কিনেছি। আমার সবসময় মিনিমাল সাজ পছন্দ। এখন ড্রেসের সাথে মিলিয়ে লিপস্টিক আর নেইলপলিশ কেনাটা বাকি।'
তবে হালকা মেকাপের পাশাপাশি কিছু ক্রেতার কাছে একটু উজ্জ্বল সাজগোজের চাহিদাও আছে। তাই চেহারায় উজ্জ্বল লুক তৈরিতে হাইলাইটার ও স্কিন টিন্টের মতো পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
ঈদ উপলক্ষে জিনাত তাবাসসুম কিনেছেন তার পছন্দের ব্র্যান্ডের হাইলাইটার ও ফাউন্ডেশন। তিনি বলেন, 'এবারের ঈদে আমি একটা গ্লোয়ি লুক চাইছি। সেভাবেই মেকআপ প্রোডাক্টের লিস্ট তৈরি করে এনেছি।'
বাজারে চাঙাভাব
বাংলাদেশে ঈদকে খুচরা বিক্রির সবচেয়ে বড় মৌসুম ধরা হয়। উৎসবের এই সময়ে প্রায় সব খাতেই বিক্রি বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। উদযাপনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরিবারগুলো পোশাক, উপহার, খাবার ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্য কেনায় এই সময়ে মানুষের খরচ করার প্রবণতাও এক লাফে অনেক বেড়ে যায়।
প্রসাধন সামগ্রীর বাজারও এর ব্যতিক্রম নয়। উৎসব যত ঘনিয়ে আসছে, দোকান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—উভয় জায়গাতেই জমজমাট বেচাকেনা চলছে।
দৈনন্দিন জীবনের হালকা সাজ থেকে শুরু করে উৎসবের উজ্জ্বল ও জমকালো সাজ—ক্রেতারা এখন নিজেদের সাজসজ্জায় নতুন নতুন ধরন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। আর ক্রেতাদের এই চাহিদাপূরণ করতে গিয়ে বিক্রেতারাও পার করছেন বছরের অন্যতম ব্যস্ত ও জমজমাট এক সময়।
