খাতুনগঞ্জে রমজানের আগে পণ্যের রেকর্ড মজুত, কমছে নিত্যপণ্যের দাম
স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সরবরাহ, পর্যাপ্ত আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে আসার কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ছোলা, ডাল ও চিনিসহ রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে।
মধ্য-ফেব্রুয়ারিতে রমজান শুরু হতে এখনো দুই মাসের বেশি সময় বাকি। তবে এরইমধ্যে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে রমজানকেন্দ্রিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর রমজানের নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। বেশিরভাগ পণ্যের দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদর-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ১২৫ থেকে ১৪০ টাকা।
চিনির খুচরা মূল্য এখন কেজিপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা। পাম তেলের দাম সামান্য কমেছে—প্রায় ১ শতাংশ। তবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
সরেজমিনে খাতুনগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি দরেও একই প্রবণতা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ান ছোলা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৩ হাজার ২০০ টাকায়—অর্থাৎ কেজিপ্রতি প্রায় ৮৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ৯৫ টাকা। অন্যদিকে ভারতীয় ছোলার দাম এখন কেজিপ্রতি ৯০ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১০৫ টাকা।
রমজানে দেশে ছোলার চাহিদা থাকে প্রায় ৮০ হাজার টন, যা মাথায় রেখে বিপুল পরিমাণ ছোলা আমদানি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
ডালের বাজারেও একই চিত্র। মোটা মসুর ডালের দাম গত বছর কেজিতে ৮৫ টাকা থাকলেও এ বছর বিক্রি হচ্ছে ৭২ টাকায়। খেসারি ডাল ৯০ টাকা থেকে কমে ৭০ টাকা হয়েছে।
মটর ডাল ও সাদা মটরের দামও প্রায় ২৩ শতাংশ কমেছে। প্রতি কেজি মটর ডাল বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকা, গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৫৫ টাকায়। এছাড়া সাদা মটর বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকা, গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৫৪ টাকায়।
ডালের মধ্যে শুধু সরু মসুর ডালের দাম বেড়েছে। গত বছরের চেয়ে কেজিতে ১০ টাকা দাম বেড়ে এটি এখন ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চিনির দামও অনেকটা কমেছে। বর্তমানে প্রতি মণ চিনির দাম ৩ হাজার ২৫০ টাকা। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮৮ টাকায়, যা গত বছর ছিল ১২০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান মাসে শরবত ও অন্যান্য পানীয় তৈরির জন্য চিনির বাড়তি মৌসুমি চাহিদা থাকে। সেই চাহিদা মাথায় রেখে আগাম আমদানি বাড়ায় এখন বাজারে কোনো ঘাটতি নেই।
তবে ভোজ্যতেলের বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেল এখন প্রতি মণে ৬ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ৬ হাজার ২০০ টাকা।
বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৮৯-১৯২ টাকায় এবং পাম তেলের পাইকারি দর মণপ্রতি ৫ হাজার ৭৮০ টাকা।
আড়তদাররা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা এর প্রধান কারণ হলেও সাম্প্রতিক নিম্নমুখী প্রবণতা বিবেচনায় তেলের দাম সামনে কমতে পারে।
মালয়েশিয়ান পাম অয়েল বোর্ড-এর (এমপিওবি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ক্রুড পাম অয়েল (সিপিও) উৎপাদন এক মাসের ব্যবধানে ১১.০২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৪৩ হাজার টন।
উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি সিপিওর মজুতও ১৬.৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার টন। উৎপাদন ও মজুতের এই দ্বৈত বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে সরবরাহের চাপ বাড়িয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বুকিং রেটে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েলের বুকিং যেখানে সম্প্রতি ৪ হাজার ৫০০ রিংগিত ছিল, এখন তা নেমে এসেছে ৪ হাজার রিংগিতে।
সামগ্রিকভাবে আমদানি ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি বলছে, ২০২৬ সালের রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই।
বরং ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আরও চালান দেশে পৌঁছালে ছোলা, ডাল ও চিনির দাম আরও কমবে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, 'এবার দেশে-বিদেশে পরিস্থিতি ভালো থাকায় বড় ও ছোট সব ব্যবসায়ীরাই এলসি খুলে পণ্য আমদানি করতে পারছেন। তাই সামনের রমজানে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক থাকবে বলে আশা করা যায়।'
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা রমজানের কয়েক মাস আগে থেকেই এলসি খুলে পণ্য আমদানি শুরু করেছেন। এখনো নতুন চালান আসছে।
'বাজারে ছোলা, মটর, মশুর, খেসারি ডাল ও চিনি পর্যাপ্ত রয়েছে। সরকার ট্যাক্স হ্রাস করলে রমজানে ভোক্তাদের সুবিধা হবে,' বলেন তিনি।
রমজান এলে দাম বাড়লে তখন প্রশাসন অভিযানের তোড়জোড় শুরু করে। তার বদলে এখন থেকেঅ নজরদারি শুরু করা উচিত, কারণ এখনই মূলত ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি ও মজুত করছেন। 'তাহলে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে, আমদানিতে কত খরচ হয়েছে আর তারা কত দামে বিক্রি করছেন,' বলেন তিনি।
নাজের হোসাইন আরও বলেন, বর্তমানে বাজার তদারকির কাজটি মূলত জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরই করছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিএসটিআই, কৃষি ও মৎস্য অধিদপ্তরসহ দেশের অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোকে এসব জায়গায় কাজ করতে হবে। তাহলে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
রমজান সামনে রেখে ২২ নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বন্দরের তথ্যে দেখা যায়, ফল, ডাল, ভোজ্যতেল ও মসলাসহ অন্তত ২২ ধরনের নিত্যপণ্যের আমদানি এ সময় বেশি হয়েছে।
গত দুই মাসে মোট ৫ লাখ ৩০ হাজার ৫২১ টন ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ হাজার ৭৯৪ টন বেশি। ফল আমদানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর মধ্যে আপেলের আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৬৮৪ টন, কমলা মোট এসেছে ৪৮ হাজার ২০৭ টন, আঙুরের আমদানি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫৩২ টন ও নাশপাতি এসেছে ১ হাজার ২৪৮ টন।
রমজানের অন্যতম প্রধান পণ্য খেজুরের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বছর খেজুর আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ১৬৯ টন, যা গতবারের চেয়ে ২ হাজার ৩৮৫ টন বেশি। এছাড়া ছোলার আমদানি ২ হাজার ৫৭৯ টন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৪৭ টনে।
ভোজ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় উত্থান দেখা গেছে সয়াবিন তেলের আমদানিতে। গত বছরের তুলনায় ৪৩ হাজার ৯৭৫ টন বেড়ে এ বছর আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ১৭২ টন।
মসলাজাতীয় পণ্যের আমদানিতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এ সময়ে এলাচ ৩১২ টন, দারুচিনি ১ হাজার ৮৩৬ টন, জিরা ৩১১ টন, জয়ত্রী ৬৫ টন, গোলমরিচ ৪৮২ টন ও আদা ১০ হাজার ১৬৫ টন আমদানি হয়েছে।
গত দুই মাসে অন্যান্য আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে ১২৪ টন আলুবোখারা, ১৫ হাজার ৪৮১ টন মসুর ডাল, ৯৯ হাজার ১৫১ টন মটর ডাল, ৫৫ হাজার ৭০৩ টন সরিষা বীজ, ৯১ টন লবঙ্গ, ১ হাজার ৮৫৩ টন কিশমিশ, ৬ হাজার ৭২৬ টন রসুন ও ১২০ টন হলুদ।
ব্যবসায়ী ও বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানির এই ধারাবাহিক প্রবাহ আসন্ন রমজানের বাজারে পণ্য সরবরাহের স্থিতিশীল পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমদানি সহজ করতে এলসি মার্জিন শিথিল
রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ন্যূনতম এলসি মার্জিন রাখার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
১১ নভেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এলসি মার্জিন শিথিলের সুবিধা আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এ সুবিধার আওতায় চাল, গম, পেঁয়াজ, ডাল, ভোজ্যতেল, ছোলা, মটর, মসলা ও খেজুর আমদানি করা যাবে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এ বছর এলসি খুলতে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন ও সরকারের কম মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেছে। ফলে বড় ধরনের ঝামেলা ছাড়াই আমদানি কার্যক্রম চলছে।
তাদের দাবি, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে এবারের রমজানে বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কমই থাকবে।
সরবরাহ ভালো থাকলেও সতর্ক ব্যবসায়ীরা
পর্যাপ্ত মজুত ও জোরদার আমদানি থাকা সত্ত্বেও গত বছরের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার কারণে ব্যবসায়ীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
গত রমজানের আগে মিল মালিকরা হঠাৎ করে প্যাকেট ও বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেন। এতে বাজারে তেলের ঘাটতি দেখা দেয়।
অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী আগাম অর্ডার (বুকিং) দেওয়ার পরও তেল পাননি, কেউ কেউ আবার চালান পেয়েছেন রমজান শেষ হওয়ার পর।
এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে ভোজ্যতেল মিলগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নজরদারির দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান মিন্টু বলেন, 'গত বছর পরিবর্তিত পরিস্থির কারণে সরকারঘেঁষা ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করেননি, যা তেলসহ বিভিন্ন পণ্যে সংকট তৈরি করেছিল। এবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, ডাল, ছোলাসহ সব পণ্যের দাম নিম্নমুখী। এবার আমদানি যথেষ্ট হচ্ছে। বাজারদর আরও কমবে, কেননা আমদানিকৃত পণ্যের ব্যয় আরও কম। আশা করছি এবার বাজার স্বাভাবিক থাকবে।'
