আমদানি বেড়ে যাওয়ায় জুলাই–সেপ্টেম্বরে চলতি হিসাবে ঘাটতি
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যালেন্স অব পেমেন্টের চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও মূলত আমদানি বৃদ্ধির কারণে চলতি হিসাব ঋণাত্মক হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৮১ মিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল মাত্র ৬০ মিলিয়ন ডলার।
ব্যালেন্স অব পেমেন্টের (বিওপি) অন্যতম প্রধান উপাদান হলো কারেন্ট অ্যাকাউন্ট, যেখানে একটি দেশের পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, বিদেশ থেকে পাওয়া আয় এবং প্রবাসী আয়ের মতো লেনদেনের মোট হিসাব দেখানো হয়।
তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর মেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ৬.৫৪ বিলিয়ন ডলার ছিল।
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের বছরের তুলনায় এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স আসার পরও মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক হয়েছে। এ ঘাটতির পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "এ তিন মাসে আমদানি বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ ছিল পেট্রোলিয়াম ও সার আমদানি বৃদ্ধি।"
তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পেট্রোলিয়াম আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। এই সময়ে পেট্রোলিয়াম আমদানি হয়েছে ২.০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর ছিল ১.৪০ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সার আমদানি বেড়েছে ২৪.১৬ শতাংশ; এই খাতে আমদানি হয়েছে ৫৫৪ মিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছর ছিল ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার।
নীতি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, "আমদানি বাড়ার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। সার্ভিস অ্যাকাউন্ট দিয়ে কারেন্ট অ্যাকাউন্টকে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাই এটি ঋণাত্মক হয়েছে। এখন তো আমদানি আরও বাড়বে, সামনের দিনগুলোতেও ইম্পোর্ট পিক-আপ করবে। তবে আমদানি বাড়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক, কারণ এতে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।"
তিনি আরও বলেন, "রেমিট্যান্স ও আমদানির ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের অবস্থাও উন্নতি হবে।"
বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৩.১৩ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর একই সময়ে ৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ছিল। অর্থাৎ, ঘাটতি বেড়েছে ২৩ দশমিক ১৩ শতাংশ।
বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ আমদানি বৃদ্ধি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মেয়াদে আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। চলতি সময়ে মোট আমদানি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছর ছিল ১৫ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, এ সময় রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ১০ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট উদ্বৃত্তে
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট উদ্বৃত্ত হয়েছে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা মূলত ট্রেড ক্রেডিট (বাণিজ্য ঋণ) ও মধ্যম–দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বৃদ্ধির ফলে সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ট্রেড ক্রেডিট দাঁড়িয়েছে ৯৬৮ মিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ৬৫৫ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি।
একই সময়ে মিডিয়াম ও লং–টার্ম লোন বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এই খাতে ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬৬৪ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, "মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাড়ার কারণেও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের অবস্থার উন্নতি হয়েছে।"
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, "ট্রেড ক্রেডিট ও মিডিয়াম–লং টার্ম লোন বাড়ার কারণে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের অবস্থা আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট ফাইন্যান্সিংও বেড়েছে, যার ফলে ট্রেড ক্রেডিটে ইনফ্লো দেখা যাচ্ছে—যা সাধারণত আউটফ্লো থাকে।"
তিনি আরও বলেন, "মিডিয়াম–লং টার্ম লোন বাড়ার অর্থ হচ্ছে সরকার বেশি ঋণ পেয়েছে। ব্যাংকগুলোও বিদেশ থেকে বেশি ধার নিয়েছে—যেখানে আগের অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ঘাটতি ছিল ৮৭৫ মিলিয়ন ডলার, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭৫১ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে 'এরর অ্যান্ড ওমিশন'-এর পরিমাণও কমেছে। সব মিলিয়ে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।"
সার্বিক বিওপি উদ্বৃত্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সার্বিক ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) ৮৫৩ মিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "মূলত ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের উন্নতির কারণেই সার্বিক ব্যালান্স অব পেমেন্ট উদ্বৃত্ত হয়েছে। আগের সময়ের ঘাটতির তুলনায় এটি স্পষ্ট অগ্রগতি।"
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, "আগের মতো পরিস্থিতি এখন এতটা খারাপ নয়। অনেক করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক আগে দিত না, এখন দিচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা কতটা টেকসই হবে—তা এখনও নিশ্চিত নয়।"
