রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হওয়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসার পরেও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স বা চলতি হিসাব ঘাটতি আরও বেড়েছে। মূলত আমদানি বৃদ্ধি এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ব্যালেন্স অব পেমেন্টের (বিওপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৯৬ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৬৮ মিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়াই ঘাটতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তবে সেই তুলনায় রপ্তানি বাড়েনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য, সার এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়ে যাওয়াটাই আমদানি বৃদ্ধির মূল কারণ। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি ৩৭ শতাংশ এবং জ্বালানি তেলের আমদানি ১৪ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া সারের আমদানি গত বছরের ৯৬০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে এ বছর ১.৭৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮.৫২ শতাংশ বেড়ে ৯.৪০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর ছিল ৭.৯৪ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে আমদানি ৬.১০ শতাংশ বেড়ে ২৭.৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও, রপ্তানি মাত্র ০.৬০ শতাংশ বেড়ে ১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
কারেন্ট অ্যাকাউন্ট হলো একটি দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের (বিওপি) অন্যতম প্রধান উপাদান, যেখানে পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, বিদেশ থেকে আয় এবং রেমিট্যান্সের মতো চলতি হস্তান্তর অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায়শই চলতি হিসাবকে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এই ভারসাম্যকে আরও নেতিবাচক অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বেশি এসেছে। তবে, বাণিজ্য ঘাটতি এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাওয়ায় রেমিট্যান্স বাড়ার সুফল অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে এবং চলতি হিসাবের অবস্থার অবনতি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন টিবিএস-কে বলেন, মূলত বাণিজ্য ঘাটতির কারণেই পরিস্থিতির এই অবনতি হয়েছে। তিনি বলেন, "আমদানি বেড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য খারাপ নয়, কিন্তু সেই অনুযায়ী রপ্তানি বাড়েনি। প্রকৃতপক্ষে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্টে হিট করেছে (প্রভাব ফেলেছে)।"
এই অর্থনীতিবিদ আরও যোগ করেন, "আমদানি বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য খারাপ কিছু নয়; বরং এটি একটি সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ। তবে রপ্তানি কমে যাওয়া ক্ষতিকর। তাই আমি মনে করি, আগামী দিনগুলোতে দেশের রপ্তানি বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি।"
আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত রয়েছে
চলতি হিসাবে ঘাটতি থাকলেও, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাবে ১.২৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে এতে ১.০১ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। অর্থনীতিবিদরা এই উন্নতির জন্য মূলত ট্রেড ক্রেডিট বা বাণিজ্যিক ঋণের উদ্বৃত্ত এবং বিদেশি সহায়তার নিট প্রবাহ বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখছেন।
আলোচ্য সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে ৫৯৫ মিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল, যেখানে এক বছর আগে ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে, বিদেশি সহায়তার নিট প্রবাহ ২৬৯ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫০৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৭ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
জাহিদ হোসেন বলেন, ট্রেড ক্রেডিট এবং নিট সহায়তা প্রবাহ—এই দুটিই আর্থিক হিসাব ইতিবাচক হওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত রপ্তানি বাড়লে ট্রেড ক্রেডিট নেগেটিভ বা ঋণাত্মক হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুর্বল রপ্তানি এবং আমদানির ডেফার্ড পেমেন্টে সময় নেওয়ার কারণে এটি উদ্বৃত্ত বা পজিটিভ হয়েছে।
ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ধনাত্মক রয়েছে
আর্থিক হিসাবে শক্তিশালী উদ্বৃত্তের সুবাদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য বা বিওপি-তে ৭৬৯ মিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ২.৫৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাণিজ্য ও চলতি হিসাবে চাপ অব্যাহত থাকলেও এই উন্নতি শক্তিশালী বাহ্যিক অর্থায়ন প্রবাহকে নির্দেশ করে।
তবে বিশ্লেষকরা বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ নেওয়া কমে যাওয়ায় এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণের নিট পরিশোধ বেড়ে যাওয়ায় এটি অর্থনৈতিক ধীরগতির মধ্যে বিনিয়োগের দুর্বল চাহিদাকেই প্রতিফলিত করছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, স্বল্পমেয়াদি ঋণ কমে যাওয়া মানে এই নয় যে বিদেশি ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না; কারণ রিজার্ভ ও ডলারের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট লাইনের সীমারও প্রসার ঘটেছে। তিনি বলেন, "বরং এটি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কমে যাওয়াকেই নির্দেশ করে।"
