বিটিআরসির রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ১,৭০০ কোটি টাকা বাড়াল সরকার, কমিশন বলছে ‘অবাস্তব’
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়—যা 'বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং বাস্তবতার নিরিখে কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়' বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গত সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে বিটিআরসি বলেছে, তাদের রাজস্বের প্রায় অর্ধেকই আসে স্পেকট্রাম চার্জ থেকে। কিন্তু নতুন করে স্পেকট্রাম নিলাম বা চার্জ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই, কারণ তা করা হলে সেই খরচ শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর চাপানো হতে পারে।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে মোবাইল অপারেটরটের সব রাজস্বের ওপর অগ্রিম আয়কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার পর চলতি বছর উল্টো তাদের রাজস্ব আয় আরও কমে যেতে পারে।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলেন, গত কয়েক বছরের বিটিআরসির রাজস্ব আদায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রথমে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। । অর্থবছর শুরুর দুই সপ্তাহ পর, গত ১৩ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিটিআরসির রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা।
কিন্তু গত ২৪ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও তার অধীনস্থ সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বাজেট ওয়ার্কিং গ্রুপের এক সভায় চলতি অর্থবছরের জন্য বিটিআরসির রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা বাড়িয়ে ৫ হাজার ৪৮৩.৮৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
গত ২৯ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের এক সভায় বিটিআরসির রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা পুনঃনির্ধারণের অনুরোধ করা হলেও তা মানতে রাজি হয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে কী কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা কমাতে হবে, তার যৌক্তিক কারণগুলো লিখিতভাবে জানাতে বলেছে।
চিঠিতে যা বলেছে বিটিআরসি
১২ অক্টোবর অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারকে লেখা চিঠিতে বিটিআরসি বলেছে, কমিশনের রাজস্ব আদায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে স্পেকট্রাম নিলাম থেকে। তবে এই খাত থেকে পাওয়া অর্থ বাড়ানোর সুযোগ নেই এবং নতুন করে নিলামের মাধ্যমে স্পেকট্রাম বিক্রি করে এ খাত থেকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিটিআরসির রাজস্ব আয়ের ৪৮ শতাংশ আসে শুধু স্পেকট্রাম চার্জ থেকে।
বিটিআরসি'র পরিচালক (অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগ) সাজেদা পারভীন স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে মোবাইল অপারেটরদের রেভিনিউ শেয়ারিং খাত থেকে মোট ১ হাজার ৯২.৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে, যা সংস্থাটির মোট রাজস্ব আহরণের ৪৬ শতাংশ।
চিঠিতে বলা হয়, মোবাইল অপারেটরদের আয় না বাড়লে এখান থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া মোবাইল অপারেটরদের আয় অন্যান্য বছরের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির প্রবণতা কিছুটা কমে যাচ্ছে।
অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রভাব
বিটিআরসি লিখেছে, ''বিগত বছরগুলোতে মোবাইল অপারেটররা ১০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কর্তন করে রাজস্ব জমা করত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এআইটির হার ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এআইটি বেড়ে যাওয়ায় কমিশনের রাজস্ব আয় কমে গেছে। পাশাপাশি গত ১ জুলাই হতে টাওয়ার শেয়ারিং অপারেটরদের সকল রাজস্বের উপর ২০ শতাংশ হারে এআইটি কেটে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে চলতি অর্থবছরও কমিশনের রাহস্ব আয় কম হবে।''
চিঠিতে সাজেদা পারভীন আরও বলেন, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটরদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় ২৬ শতাংশ কমেছে এবং সাবমেরিন ক্যাবল অপারেটরদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় ৪১ শতাংশ কমেছে, যা সামগ্রিকভাবে বিটিআরসির রাজস্ব আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে চলতি অর্থবছরও কমিশনের রাজস্ব আয় কম হবে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিটিআরসিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে নির্ধারণ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিটিআরসিসহ এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
