সুপারশপে ভ্যাটছাড়ের পর বিক্রি বেড়েছে ২০ শতাংশ

বছরের পর বছর অসম কর ব্যবস্থার সঙ্গে লড়াই করার পর বাংলাদেশের আধুনিক রিটেইল চেইনগুলো পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সুপারমার্কেটের প্যাকেটজাত পণ্যের ওপর থেকে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করায় ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। প্রধান সুপারমার্কেট চেইনগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাটের উচ্চহার সুপারমার্কেটগুলোকে চিরায়ত বাজারের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রেখেছিল। তবে এখন ক্রেতারা আবার ফিরতে শুরু করেছেন। মীনা বাজারের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) শামীম আহমেদ জাইগিরদার বলেন, 'মানুষ এখন পুরো মুদি কেনাকাটা আমাদের কাছ থেকেই করছে, কারণ আমাদের দাম প্রতিযোগিতামূলক এবং প্রয়োজনীয় সবকিছু এক জায়গায় পাওয়া যায়।'
এর সত্যতা মিলেছে পরিসংখ্যানেও। ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান শহরে ৩৯টি আউটলেট পরিচালনাকারী মীনা বাজার জানিয়েছে, ভ্যাট প্রত্যাহারের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের ক্রেতার সংখ্যা গড়ে ২০ শতাংশ বেড়েছে।
এক দশকের অসুবিধার অবসান
প্রায় এক দশক ধরে প্যাকেটজাত পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপিত থাকায় সুপারমার্কেটগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিল। উন্নত স্বাস্থ্যবিধি, বৈচিত্র্য ও বেশি পণ্যের সমাহারের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক অধিক দামের কারণে অনেক ক্রেতা প্রথাগত দোকানের দিকেই ঝুঁকতেন। তবে ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র কিছুটা সমান হওয়ায় রিটেইল বিক্রেতারা এখন আগ্রাসীভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।
দেশের প্রথম সুপারমার্কেট চেইন আগোরা কেবল মার্চ মাসেই চারটি নতুন স্টোর চালু করেছে। আগোরার সিওও খন্দকার নূর-ই-বোরহান বলেন, 'আমরা আগামী দুই বছরে ১১০টি নতুন আউটলেট চালুর পরিকল্পনা করছি।'
এদিকে, দেশের সবচেয়ে বড় সুপারমার্কেট চেইন স্বপ্ন জানিয়েছে, তাদের ক্রেতার সংখ্যা ১৫ শতাংশ বেড়েছে এবং প্রতিদিন ১ লাখেরও বেশি গ্রাহককে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ওঠানামা করা করনীতি
২০০৫ সাল থেকে প্যাকেটজাত পণ্যের ওপর ভ্যাট ১.৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে, যা সুপারমার্কেটগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে এটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়, যার ফলে রিটেইল শিল্পে দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে এই ভ্যাটের সমালোচনা করে আসছিলেন, কারণ এতে ক্রেতাদের প্যাকেটজাত পণ্যের সর্বোচ্চ রিটেইল মূল্যের ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ কর দিতে হতো। করনীতির অস্থিরতার কারণে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য রিটেইল খাত প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল।
আগোরা ও মীনা বাজারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে গিয়ে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা শিথিল করতে হলেও, স্বপ্নের মতো আগ্রাসী সম্প্রসারণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক চাপ সামলাতে হয়েছে।
স্বপ্নের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির বলেন, নীতিগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও তার প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে।
তিনি জানান, ভ্যাট প্রত্যাহারের পর স্বপ্নের একক দোকানের বিক্রি ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ সুপারমার্কেট ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হলেও, স্বপ্ন—যা বাজারের ৫০ শতাংশেরও বেশি শেয়ার দখল করে আছে—গত মাসে ক্রেতার সংখ্যা ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ৫০০টিরও বেশি আউটলেট এখন প্রতিদিন ১ লাখের বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে।
গত এক দশকে বার্ষিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে স্বপ্ন দেশের মানুষের দৈনিক কেনাকাটার নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে ক্রেতারা স্বস্তি পেলেও আধুনিক রিটেইল চেইনগুলোর জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র এখনো পুরোপুরি সমান হয়নি বলে মনে করেন নাসির।
অন্যান্য বড় রিটেইল প্রতিষ্ঠানের মতো সুপারমার্কেট চেইনগুলোকেও তাদের মোট মার্জিনের ওপর ২.৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়।
নাসির বলেন, 'প্রতিষ্ঠিত চেইনগুলো নিয়ম মেনে এই ভ্যাট পরিশোধ করলেও, রাজস্ব কর্তৃপক্ষ এখনও দেশজুড়ে থাকা অসংগঠিত দোকানগুলোর বিশাল নেটওয়ার্ক থেকে সমপরিমাণ রাজস্ব আদায়ে সক্ষম নয়।'
জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সুপারমার্কেট শিল্পকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ডেইলি শপিংয়ের সিওও গালিব ফারুক বখত। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৮২টি দোকান পরিচালনা করছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে আরও ৫০টি নতুন আউটলেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, 'অন্যান্যদের মতো নয়, ডেইলি শপিং দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ ব্যয় বহন করে আসছে। তারপরও অনেক ক্রেতার ধারণা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও পরিচ্ছন্ন দোকানগুলোতে পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি।'
দ্রুত সম্প্রসারিত বাজার
স্বপ্নের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির বলেন, 'আগামী কয়েক বছরে দেশের সুপারমার্কেট গ্রাহকের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। এ কারণেই আমরা বার্ষিক ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছি।'
আগোরার বুরহান বলেন, 'রমজান মাসে সুপারমার্কেটগুলোর বিক্রি বাড়ে, তবে অতিরিক্ত ভ্যাট না থাকার ফলে কতটুকু প্রভাব পড়বে তা নিয়ে আমরা ঈদের আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছি না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক দিক হলো, ওয়াক-ইন গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিক্রির প্রধান প্রবৃদ্ধি এসেছে বিশ্বস্ত গ্রাহকদের কাছ থেকে, যারা নিয়মিত আমাদের দোকান থেকে কেনাকাটা করেন।'
মীনা বাজারের জাইগিরদার জানান, ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সদস্যপদ নিবন্ধন বেড়েছে, কারণ ক্রেতারা লয়ালটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে আরও বেশি ছাড় পাচ্ছেন।'
আগোরা সুপারমার্কেটের লয়ালটি কার্ডধারীদের কেনাকাটার পরিমাণ আগে ছিল ৬৫-৬৭ শতাংশ, যা এখন বেড়ে ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে, আগোরা লয়ালটি কার্ডধারীর সংখ্যা ৫২ শতাংশ থেকে প্রায় ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপারমার্কেট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, সমিতির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৩৫। এছাড়া, আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সুপারস্টোর বা সুবিধাজনক দোকান পরিচালনা করছে, যদিও সেগুলো সংগঠনের সদস্য নয়।
তিনি বলেন, 'যদি আগামী মাসগুলোতে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমাদের আওতায় আসে, তাহলে সদস্য সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাবে।'
আগোরা সুপারমার্কেটের বোরহান জানান, মিরপুর, শেওড়াপাড়া ও মগবাজারের মতো মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকায় সুপারমার্কেটের গ্রাহকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কারণ, এই শ্রেণির প্রিমিয়াম গ্রাহকরা দামের তুলনায় পরিষেবা ও মানের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বপ্ন সুপারমার্কেট উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি করলেও সামগ্রিকভাবে খাতটি বছরে গড়ে কেবল ৭ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছিল। তবে আগামী কয়েক বছরে এ হার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ ক্রেতারা আধুনিক সুপারমার্কেট থেকে কেনাকাটার প্রতি আরও আগ্রহী হয়ে উঠছেন
নীতি ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ
আগোরার প্রধান বিনিয়োগকারী ব্রুমমার অ্যান্ড পার্টনার্স (বাংলাদেশ)-এর সিইও মুয়াল্লেম এ চৌধুরী বলেন, 'গত দেড় দশক ধরে নীতিগত বাধার কারণে সংগঠিত রিটেইল বিক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।'
তিনি বলেন, 'সরকার এখন এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে, যা ইতিবাচক। তবে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।'
তার ভাষ্য, 'বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দেশের আইন মেনেই বিনিয়োগ করেন, কিন্তু কিছু আইন ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হয় না।'
ভ্যাট ছাড় থাকলেও সুপারমার্কেট চেইনকে মোট মার্জিনের ওপর ২.৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়, যেখানে অনানুষ্ঠানিক খুচরা বিক্রেতারা প্রায়শই কর ফাঁকি দেন। এছাড়া, খাদ্য নিরাপত্তা আইনসহ অন্যান্য বিধিবিধান সুপারমার্কেটগুলোর ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও অনানুষ্ঠানিক রিটেইল বাজারে এসবের তেমন নজির দেখা যায় না।
শিল্পসংশ্লিষ্ট নেতারা রিটেইল অবকাঠামোর ওপর কর ও শুল্ক হ্রাসের আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমানে দেশের সুপারমার্কেট খাত খুচরা পর্যায়ের বাজারের মাত্র ২.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ায় এ হার ১২ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে।