ব্যাঙ নিধনের কালো অধ্যায়
বর্ষাকালে শীতলক্ষ্যা চলে আসত চরসিন্দুর গুদারাঘাটের প্রাচীন বটগাছের ঠিক নিচে। গ্রামের বালকেরা তখন ওই বটগাছের শেকড়ে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরত। আমারও ছিল একই নেশা, সকাল-বিকাল ছিপ হাতে ছুটে যেতাম বটগাছের নিচে। কিন্তু শৈশবের বটের শিকড়ে বসে মাছ ধরার সুখস্মৃতির পাশাপাশি কিছু বীভৎস দৃশ্য আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
বটগাছের পাশেই ছিল ব্যাঙের আড়ত। খুব ভোর থেকে সেখানে লোকজন আসতে শুরু করত। প্রত্যেকেরই হাত কিংবা মাথার ঝুড়িতে থাকত ব্যাঙ-ভর্তি পাটের ছালা বা ব্যাগ। আড়তদার একে একে সবার ব্যাঙ কিনে নিত। এরপর কয়েকজন বটি নিয়ে বসে পড়ত ব্যাঙ কাটতে। ব্যাগ থেকে একেকটা ব্যাঙ বের করে কোমর থেকে পেছনের অংশ আলাদা করে ফেলত। মাথাসহ বাকি অংশটা ছুড়ে ফেলে দিত নদীর দিকে। পেছনের অংশবিহীন সেসব কাটা ব্যাঙ সাথে সাথে মারা যেত না। নদীর পাড়ে কিংবা নদীর পানিতে তারা তড়পাতে থাকত, সে এক অতি ভয়ানক নির্মম দৃশ্য। চোখের সামনে শত শত খণ্ডিত ব্যাঙের রক্তাক্ত দেহ আমার মন খারাপ করে দিত। কোনো কোনো মৃত্যুপথযাত্রী ব্যাঙ পানিতে চিত হয়ে মোনাজাতের ভঙ্গিতে হাত দুটো উঁচু করে রাখত। আমার সঙ্গীরা তখন বলে উঠত, 'ঠ্যাং কাটা ব্যাঙ হাত তুইল্যা আল্লাহর কাছে বিচার দিতাছে।' যেসব লোক ব্যাঙ কাটত, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আর ব্যাঙের ঠ্যাং আলাদা করায় সবচেয়ে পারদর্শী ছিল আবু সাঈদ নামের এক লোক। তার চেহারাও ছিল কিম্ভুতকিমাকার। তার শেষ জীবন ছিল খুবই কষ্টের। লোকজন বলত, 'এইটা হলো ব্যাঙের অভিশাপ।' আড়তদারের নাম ছিল লালা। সে এখনো বেঁচে আছে। তার পুরো নাম আমার জানা নেই। সেদিনও দেখা লালার সঙ্গে, জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম কত দরে কীভাবে কিনত ব্যাঙ। জানলাম, ব্যাঙের ঠ্যাং ছিল ১০০ টাকা কেজি, আবার পিস হিসেবেও ব্যাঙ কেনা হতো। লালা সেসব ব্যাঙ ঘোড়াশাল আড়তে নিয়ে বিক্রি করে দিত। ঘোড়াশাল থেকে বরফ দিয়ে পাঠানো হতো ঢাকায়।
আরেকটা বিষয় এখনো স্পষ্ট মনে আছে, কোনো কৃষক কিংবা কৃষক পরিবারের কেউ ব্যাঙ ধরা কিংবা ব্যাঙের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। আর গ্রামের সাধারণ মানুষ এটাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখত। কোন কোন দেশের মানুষ ব্যাঙ খায়, এই কথা ভেবেই অনেকে বমি করে দিত। কিন্তু সরকারি কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা না থাকায় কিছু মানুষ ব্যাঙ নিধনকে রীতিমতো নিজেদের মৌসুমি জীবিকা হিসাবে বেছে নেয়। ব্যাঙ ধরা চলত বৈশাখের প্রথম থেকে শুরু করে ভাদ্র মাস পর্যন্ত।
গ্রীষ্মকাল হচ্ছে ব্যাঙের প্রজনন ঋতু। এ সময় বৃষ্টি হলেই ওরা নিজেদের আশ্রয় ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে ডাকাডাকি আর লাফালাফি শুরু করে দিত। দিন নেই রাত নেই স্ত্রী ব্যাঙকে আকৃষ্ট করায় বেহুঁশের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ত পুরুষ কোলা ব্যাঙ। তাই সবচেয়ে বেশি ব্যাঙ ধরা পড়ত বৈশাখ মাসে।
কোলা ব্যাঙ এক অসামান্য উপকারী প্রাণী, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। ইংরেজিতে এদের বলা হয় 'বুল ফ্রগ'। সোনা ব্যাঙ, ভাওয়া ব্যাঙ, গোতর ব্যাঙ ইত্যাদি নামেও পরিচিত। মৌসুমের বিভিন্ন সময় এরা নানা রকম রং ধারণ করে থাকে। কখনো কটকটে হলুদ, কখনো সবুজাভ হলুদ, কখনো কালচে আবার কখনো মেটে রং ধারণ করে।
কোলা ব্যাঙ মূলত রাতের বেলায় সক্রিয় থাকে। আর বৃষ্টির রাতে প্রকৃতিতে ওদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যেত। ব্যাঙশিকারিরা টর্চলাইট, হারিকেন কিংবা বোঙ্গা কুপি নিয়ে সন্ধ্যার পরপরই বেরিয়ে পড়ত। বসতবাড়ির পার্শ্ববর্তী ডোবানালা থেকে শুরু করে ধানখেত, বিল কিংবা পুকুরপাড় ধরে ওরা ঘুরে বেড়াত শিকারের সন্ধানে। তারা মূলত ব্যাঙের ডাক লক্ষ করে এগিয়ে যেত। আলো কাছে নিয়ে যাওয়ার পর ব্যাঙ লাফ দেওয়ার বদলে স্থির হয়ে যেত। আর তখন ওরা খপ করে ধরে চটের বেগে ঢুকিয়ে রাখত। এভাবে রাতের বেলায় ব্যাঙ ধরতে গিয়ে প্রায়ই ওদের সাপের মুখোমুখি হতে হতো। কখনো কেউ জলের ওপর ভেসে থাকা সাপের মাথাকে ব্যাঙ মনে করে খপ করে চেপে ধরত, তারপর প্রবল চিৎকারে দৌড়ে পালাত। আবার কেউ খেত পদ্ম গোখরার দৌড়ানি। এই সাপের আবার মাছ ভীষণ প্রিয়, তাই অনেকের কাছে সে 'মেছো আলাদ' সাপ নামে পরিচিত।
বৃষ্টি হলে গর্তের আশ্রয় ছেড়ে শঙ্খিনী সাপ জলাভূমিতে নেমে আসত। ওদের প্রিয় খাদ্য ছিল অন্য সাপ। একসময়ের ব্যাঙশিকারিরা আমাকে বলেছে, শঙ্খিনী নাকি আলো সহ্য করতে পারত না। লেজ-মাথা এক করে ছিটকে এসে পড়ত টর্চ কিংবা হারিকেনের ওপর। বৃষ্টির রাতে জলাভূমির বুকে ব্যাঙের পাশাপাশি শুধু শঙ্খিনী কিংবা পদ্ম গোখরা নয়, রাজ কেউটে কিংবা খৈইয়া গোখরার বিচরণ ছিল। এরা সবাই বিষধর। তাই ব্যাঙ ধরতে গিয়ে মানুষজন মাঝেমধ্যেই সাপের ছোবলে আক্রান্ত হতো। তখন অ্যান্টিভেনাম শুধু পাওয়া যেত সম্মিলিত সামরিক হসপিটালে, তাই ওঝাই ছিল একমাত্র ভরসা। অপচিকিৎসায় মৃত্যু হতো অধিকাংশ রোগীর।
ব্যাঙ ধরা ছিল নিঃসন্দেহে একটি বিপজ্জনক কাজ। তবু রমরমা ব্যবসা চলছিল দেশজুড়ে। তখন ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্সে 'ব্যাঙের পা' খুব জনপ্রিয় খাদ্য ছিল। দামও ছিল ভালো। সারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় আশা ব্যাঙের পা বরফ দিয়ে প্যাক করা হতো। তারপর বিমানে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রে পাঠানো হতো। ১৯৭৮ সালে কয়েক শ টন ব্যাঙের পা বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল। তাই প্রতিবছর কত লক্ষ কোটি ব্যাঙের জীবন যেত, তা সহজেই অনুমেয়।
ব্যাঙ প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে সে যেমন ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ ভক্ষণ করে ফসলখেতের রক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করে, তেমনি ব্যাঙ খেয়ে জীবন রক্ষা করে বহু জাতের শিকারি প্রাণী। একটি ব্যাঙ তার নিজের ওজনের চাইতে কয়েক গুণ অধিক পরিমাণ কীটপতঙ্গ ভক্ষণ করতে পারে। তাই প্রকৃতিতে কীটপতঙ্গের বৃদ্ধি রুখতে ব্যাঙের কোনো বিকল্প নেই।
গ্রামের মানুষের কাছে কোলা ব্যাঙ শুধু ফসলখেতের রক্ষাকারী নয়, হাজার বছর ধরে তাকে বৃষ্টির প্রতীক হিসাবে ধরা হয়। আজও মানুষ কোলা ব্যাঙের ডাক শুনে বুঝতে পারে কখন বৃষ্টি হবে। ব্যাঙের বিয়ে গ্রামবাংলার অতি প্রাচীন এক লোকাচার। অনাবৃষ্টির কারণে খরা দেখা দিলে মানুষ বৃষ্টির জন্য ব্যাঙের বিয়ের আয়োজন করত। সকলের বিশ্বাস ছিল ব্যাঙ বৃষ্টি দেবতাকে খুশি করতে পারে। ব্যাঙের বিয়ের উচ্চকণ্ঠের গান আর আনন্দযাত্রার হইহুল্লোড়ে আকাশের দেবতা রেগে গিয়ে বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করে দেবে। তাই প্রকৃতিতে খরা দেখা দিলেই ব্যাঙের বিয়ের আয়োজন করা হতো। এ আয়োজন ছিল খুবই বৈচিত্র্যময়। প্রথমে দুটো বড় ব্যাঙ ধরে আনা হতো। একটা মেয়ে, অন্যটা ছেলে। গলায় ফুলের মালা ঝুলিয়ে, গায়ে হলুদ মাখিয়ে, মাটির কলসিতে ভরে বউ-জামাই সাজিয়ে, ঢোল-তবলা বাজিয়ে তাদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘোরানো হতো। সেই সঙ্গে চলত গান—'আল্লাহ মেঘ দে ,পানি দে, ছায়া দেরে তুই...।' গ্রাম ঘোরানোর পর ব্যাঙ দুটোকে পুকুর কিংবা নদীতে ছেড়ে দেওয়া হতো।
১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সারা দেশে একটানা চলেছিল ব্যাঙ নিধনযজ্ঞ। সাধারণ মানুষ এটা ভালোভাবে দেখছিল না। আর কৃষকদের জন্য বিষয়টা ছিল খুবই পীড়াদায়ক। কৃষকেরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, যদি এভাবে ব্যাঙ ধরার অব্যাহত থাকে, তবে প্রকৃতির বুকে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। অবশেষে আন্তর্জাতিক কিছু পরিবেশবাদী সংগঠনের চাপের মুখে সরকার ব্যাঙ নিধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয়। তবে একটা কিছুর প্রচলন শুরু হলে তা আসলে হঠাৎ করে বন্ধ হয় না। তাই সরকারিভাবে ১৯৮০ সালে ব্যাঙ ধরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী বেশ কয়েক বছর তা অব্যাহত ছিল। তবে সাধারণ মানুষ যে বিষয় পছন্দ করে না, তা কখনোই টিকে থাকতে পারে না। তাই ব্যাঙ ধরাও একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এখন সাধারণ মানুষ আরও বেশি পরিবেশ সচেতন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে এগিয়ে এসেছেন বহু নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তাই প্রায় দেড় দশকের সেই ব্যাঙ নিধনযজ্ঞ বন্য প্রাণীর ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে বিরাজ করবে।
