মরিচের মানচিত্র! মরিচের পথ পরিক্রমা
কদিন আগেই, গত জুলাইয়ে, ঢাকার বাজারে কাঁচা মরিচের কেজি ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। তবু বাজারে তার চাহিদা কমেনি। এমন ঘটনা বাংলাদেশে নতুনও নয়। ২০২৪ সালের জুনে ঢাকার বাজারে দেশি কাঁচা মরিচের কেজি ৪০০ টাকা হয়েছিল। পরের মাসে রাজবাড়ীতেও এক দিনের ব্যবধানে দাম বেড়ে ৪০০ টাকায় উঠেছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাজশাহীর বাঘায় তো খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচ ৪০০ থেকে ৪৪০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। সে সময় খবরের কাগজে ঝড় ওঠে। কাগুজে ঝড়ে দামের কী আসে যায়! কমে না কখনো।
একসময় যে বিদেশি ফলকে এ দেশের মানুষ চিনতই না, আজ তার জন্য কেজিতে চার শ টাকা খরচ করতেও আমাদের ভাবতে হয়। তারপরও খরচটা হয়ে যায়। এটাই বোধ হয় মরিচ-রাজকুমারীর ভারত উপমহাদেশ জয় করার সবচেয়ে জীবন্ত প্রমাণ। অল্প মরিচবাটা মাখলেই এক বাসন ভাত এমনি এমনি খেয়ে ফেলা যায়। কোনো সবজিই লাগে না। অল্পস্বল্প ঝাল মরিচ থাকলেই আর তেমন কোনো তরকারির দরকার পড়ে না। এই ধারণা তৈরি হওয়ার পর মরিচ দীন-দুঃখীদের মধ্যে আরও জাঁকিয়ে বসল। শিল-পাটায় সামান্য সরষের তেল, নুন ও আদা দিয়ে মরিচবাটা ধীরে ধীরে এ দেশের রান্নার হৃদযন্ত্র হয়ে উঠল।
মরিচ নিয়ে বিদেশি অভিজ্ঞতার বয়ান দেই। ইরানের সবজি বাজারে মরিচ বিক্রি হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই 'ফেলফেলে শিরিন' মানে 'মিস্টি মরিচ'। শিরিন-ফরহাদের ধ্রুপদি প্রেমের কাহিনি জানে না এমন মানুষ বাংলায় নেই। আমিও সেই সূত্র ধরে বলতাম 'ফেলফেল শিরিন' নয় 'ফেলফেলে 'ফরহাদ'। মানে ইরানিদের ফার্সি জ্ঞানদান। 'শিরিন'-এর বিপরীত শব্দ 'ফরহাদ' ধরে নেওয়া। মশকরা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগত। তারপর বলত, 'তোন্ত' মানে ঝাল মরিচ নেই। হয়তো দু-এক দিনের মধ্যে আসবে। ফেলফেলে শিরিন সাধারণত লম্বা এবং চিকন। খেতে ঝাল নয়। তা বলে মিষ্টি স্বাদও নেই।
ইরানের ঝাল মরিচ? সে আরেক কিসসা। সাধারণত ওরা প্রচণ্ড ঝাল বলে যে মরিচ বিক্রি করে, তা আমাদের মুখে হালকা ঝাল ঝাল ভাবের বেশি মনে হবে না। এমন মরিচ দু-চারটা চিবিয়ে খেয়ে ওদের তাক লাগিয়ে দিতাম। একবার বাজারে পেলাম ফেলেফেলে কাবাবি নামের একজাতের মরিচ। ও নাকি প্রচণ্ড ঝাল। চেহারার সাথে আমাদের বোম্বাই মরিচের দূরাগত মিল রয়েছে। চিবিয়ে খাওয়ার জাদু দেখাতে যাব। পরিচিত দোকানি বাধা দিল। দরকার নেই। বুঝতে পারছি। তোমার জন্য তেমন ঝাল না। তারপর কেজি দুয়েক কিনে আনলাম। খেতে বসে অভ্যাস মোতাবেক বিশাল কামড় দিলাম ওই মরিচে। প্রচণ্ড ঝাল! জিব-মুখ জ্বলে উঠল। আগুন ধরে গেল। তাড়াতাড়ি ঢেক দই, ঠান্ডা দুধ বারবার মুখে নিলাম। একের পর এক করে। বাপ রে! বাজারে মরিচে কামড় দিলে কী দশা হতো!
আরেকটা মরিচ দেখেছি। বাগান সাজানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। ইরানিরা খায় না। নানা রঙের মরিচ আমাদের ধাইন্যা মরিচের মতো উল্টা হয়ে থাকে গাছে। ঝাল। মাঝে মাঝে অফিসের বিশাল বাগান এলাকা থেকে বাগিয়ে আনতাম।
কিন্তু মরিচ আমরা পেলাম কি করে? সরিচ কি ভারতবর্ষের? ইতিহাস কি বলে!
সাত সমদ্দুর পেরিয়ে রাজকুমারী
পঙ্খিরাজে চেপে ছুটছে রাজকুমার। সাত সমদ্দুর আর তেরো নদী পেরিয়ে, তেপান্তরের মাঠ মাড়িয়ে পেয়ে গেল রাজপ্রাসাদ। কোথাও কারও সাড়া নেই। চোখ ধাঁধানো জৌলুশে ভরা কক্ষের পর কক্ষ। রাজপরিচারিকা আছে। রাজপ্রহরী আছে। সবই আছে। কিন্তু সবাই গভীর ঘুমে বিভোর। সবচেয়ে জৌলুশময় কক্ষে সোনার খাটে ঘুমিয়ে আছে অনিন্দ্য সুন্দরী রাজকুমারী। তিনি যে রাজকুমারী, তা কী করে বোঝা গেল? রূপকথা তার জবাব দেয়নি। আমাদেরও বোধ হয় জানতে চাওয়া উচিত নয়। তার শিয়রের কাছে রুপার কাঠি, পায়ের কাছে সোনার কাঠি। রাজকুমার কাঠি দুটির জায়গা বদলে দিলেন। কাঠি দুটি বদলানোর বুদ্ধি কোথায় পেলেন রাজকুমার, না সেখানেও চুপ রূপকথা। রাজকুমারী জেগে উঠলেন। চার চোখের মিলন হলো। জেগে উঠল গোটা প্রাসাদ। সমগ্র দেশ।
তবে মরিচের গল্পে একটু মোড় আছে। মরিচও আমাদের ভারত উপমহাদেশে এসেছিল সাত সমদ্দুর আর তেরো নদী পেরিয়ে, তেপান্তরের মাঠ অতিক্রম করে। কিন্তু মরিচ রাজকুমারী প্রথম দর্শনেই, কিংবা প্রথম স্বাদেই, রাজকুমারের—মানে এ দেশের মানুষের—মনোরানি হয়ে যায়নি। তার আগে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছিল দীর্ঘ এক পথ।
তবে সেই পথের শুরুতেই ছিল ইউরোপের এক অদ্ভুত খাদ্যসংকট। কলম্বাস যখন পূর্বের বদলে পশ্চিমে ভেসে পড়েছিলেন, তখন ইউরোপে মাছ-গোশত-সবজি সবই বাজারে পাওয়া যেত, কিন্তু রান্নার মসলা ছিল অপ্রতুল। মসলা আসত ভারতবর্ষ আর পূর্বের কিছু দেশ থেকে। আরব বণিকেরা তা ইউরোপে নিয়ে যেতেন। কিন্তু রান্নাকে সুস্বাদু করার মসলা তাঁরা খুব বেশি আনতেন না। নানা আজগুবি গল্প বলে মসলার দামও চড়া করে রাখতেন। তখন খাবারে ঝাল ও মুখরোচক স্বাদ আনার জন্য গোলমরিচের জুড়ি ছিল না। তার দাম ছিল এত বেশি যে গোলমরিচকে বলা হতো 'কালো সোনা'।
ভেনিসের মানুষরা অবশ্য এই বাণিজ্য থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতেন। ভারত মহাসাগর পেরিয়ে ভারতীয় মসলা আফ্রিকায় পৌঁছাত। সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর ধরে ঢুকত ভেনিসের বাজারে। কিন্তু সুখ চিরকাল থাকে না। অটোমান শাসনকালে প্রচলিত এই বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গেলে ইতালীয়রা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে। কারণ, ভেনিসের বাজার থেকেই দেশের সিংহভাগ রাজস্ব আসত।
কলম্বাসও তাই জাহাজে উঠেছিলেন ভারতবর্ষে গিয়ে গোলমরিচ ও অন্যান্য মসলা নিয়ে আসার বাসনায়। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন পথ তৈরির ইচ্ছাও ছিল তাঁর। কিন্তু পূর্বের বদলে পশ্চিমে যাত্রা করে তিনি পৌঁছে গেলেন এক নতুন ভূখণ্ডে। সেখানে গিয়ে দেখলেন, স্থানীয় মানুষ মরিচ দিয়ে রান্না করে খাচ্ছে। তাঁর বিশ্বাস আরও জোরদার হলো। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই এটি ভারতবর্ষের কোনো দ্বীপ। স্থানীয়দের ঝাল-ঝাল খাবারের কথাও তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন। প্রায় চার হাজার বছর ধরে সেখানকার মানুষ 'আজি' নামে এক ধরনের লঙ্কা খেত। কলম্বাস সেই আজিকেই গোলমরিচের জনক বা একধরনের রূপ বলে ধরে নিলেন।
মরিচ থেকে লঙ্কা, নাকি লঙ্কা থেকে মরিচ?
আমাদের 'মরিচ' শব্দটির শিকড় সংস্কৃত 'মরিচ' বা 'মরীচ' শব্দে। কিন্তু সেই মরিচ ছিল আজকের লাল বা সবুজ লঙ্কা নয়—ছিল গোলমরিচ, অর্থাৎ পাইপার নিগ্রাম। ভারতীয় উদ্ভিদতাত্ত্বিক তথ্যভান্ডারেও পাইপার নিগ্রাম-এর সংস্কৃত নাম 'মরিচ' এবং হিন্দি নাম 'কালি মির্চ' দেয়া হয়েছে।
তারপর আমেরিকা মহাদেশের ক্যাপসিকাম ভারতে এল। নতুন এই ঝাল ফলের জন্য উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় পুরোনো 'মরিচ' নামটিরই নানা রূপ ব্যবহার হতে শুরু করল। ১৮৬২ সালের একটি নথিতে ক্যাপসিকাম ফ্রুটেসেন্স-এর নাম হিসেবে সংস্কৃত 'ব্রহ্ম-মরিচ', বাংলায় 'লাল-লঙ্কা-মরিচ' এবং দাক্ষিণাত্যে 'লাল মিরচি'র মতো নাম পাওয়া যায়। অর্থাৎ নতুন ঝাল ফলটিকে পুরোনো ঝাল মসলার নামের সঙ্গে মিলিয়ে চেনানোর প্রবণতা ছিল।
দক্ষিণ ভারতের ভাষাতেও একই কাহিনি। তামিল 'মিলাগু' মানে গোলমরিচ; তার সঙ্গে 'কায়' অর্থাৎ কাঁচা ফল যোগ হয়ে 'মিলাগায়' হয়েছে, যার অর্থ লঙ্কা। তেলুগুতে 'মিরাপ' থেকে 'মিরাপাকায়া'—অর্থাৎ মরিচের ফল—চলেছে। আর হিন্দির 'মির্চ'ও সংস্কৃত 'মরিচ'-এর উত্তরসূরি; সেখানে আজ 'মির্চ' বললে লাল-সবুজ লঙ্কা যেমন বোঝায়, তেমনি 'কালি মির্চ' বললে বোঝায় গোলমরিচ।
ইউরোপ বলতে পারে, কলম্বাসই তাদের লঙ্কা চিনিয়েছিলেন। কিন্তু সারা দুনিয়াকে তিনি প্রথম লঙ্কা চেনাননি। আমেরিকার আদি অধিবাসীদের রান্নায়, মায়া ও ইনকা সভ্যতার নানা খাবারে লঙ্কার ব্যবহার ছিল। সেখানকার ওষুধেও লঙ্কা ব্যবহার করা হতো। লঙ্কাগাছের উৎপত্তি হয়েছিল ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার মাঝামাঝি পাহাড়ি অঞ্চলে। সেখান থেকে পাখিদের ঠোঁটের পর ঠোঁটে এবং স্থানীয় মানুষের হাত ধরে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল এই গাছ।
কলম্বাস ইউরোপে ফিরে আসার পর পরিষ্কার হয়ে গেল যে তিনি ভারতবর্ষে যাননি। বরং একটি নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছেছেন। স্প্যানিশরা সেখানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পৌঁছাল। আর দেখতে দেখতে নিজেদের খানাপিনায় মরিচ মাখাতে শুরু করল। কলম্বাস দেশে ফিরে তাঁর আবিষ্কারের জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে স্পেনের সান্তা মারিয়ার গির্জায় তীর্থযাত্রী হয়ে গেলেন। মরিচও সাথে ছিল। নিজের আবিষ্কার করা গাছের ফল। যাকে তিনি তখনো গোলমরিচেরই রকমফের বলেই হিসাবে করতেন। তিনি গির্জার সাধুদের যে উপহার দিলেন, তার মধ্যে সে ফলও ছিল। বেশ। সেই সাধুদের মাধ্যমে লঙ্কা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল গোটা স্পেনে। তারপর ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে।
এদিকে আমাদের উপমহাদেশ তখনো লঙ্কার অপেক্ষায়। আমাদের রান্নাঘরে গোলমরিচেরই রাজত্ব। বহু শতাব্দী ধরে গোলমরিচ নিয়ে উপমহাদেশীয়দের গর্ব ছিল। এটি শুধু রান্নায় ঝাঁজ যোগ করত না, ইউরোপেও এর বিপুল চাহিদা ছিল। রোম, ভেনিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রে ভারতীয় গোলমরিচ রপ্তানি হতো এবং সেখানে এর জন্য চড়া দাম মিলত।
খাদ্য-ইতিহাসবিদ কে টি আচায়া লিখেছেন, কলম্বাস আমেরিকায় পৌঁছে নতুন ধরনের গোলমরিচ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে করার আগ পর্যন্ত ভারতে মরিচ কী, সে সম্পর্কে কারও সামান্যতম ধারণাও ছিল না। তাঁর ভাষায়, '১৬ শতকের আগে ভারতীয় সাহিত্যে মরিচের কোনো উল্লেখই নেই।' তিনি আরও দেখিয়েছেন, ভারতের কোনো ভাষাতেই মরিচের নিজস্ব কোনো শব্দ ছিল না। শেষ পর্যন্ত এটি ভারতীয় উপকূলে এসে পৌঁছানোর পর কলম্বাসের মতো ভারতীয়রাও গোলমরিচের সঙ্গে নাম গুলিয়ে ফেলেন। হিন্দিতে 'মিরচ', তামিলে 'মিলাগু' ও 'মিলাগাই'—এই নামগুলোর মধ্যেও সেই বিভ্রান্তির রেশ রয়েছে।
ভারতে মরিচ ঠিক কবে পৌঁছেছিল, তার নির্ভুল কোনো নথিপত্র নেই। তবে ধারণা করা হয়, ভাস্কো-দা-গামার নেতৃত্বাধীন পর্তুগিজ নৌবহর মরিচের বীজ গোয়ায় নিয়ে আসে। সেখানেই প্রথম চাষ শুরু হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে বোম্বাইয়ে, যেখানে এর নাম হয় 'গোয়া মিরচ'। আর এখান থেকেই শুরু হয় এক আশ্চর্য হিমালয়ান উপমহাদেশীয় কাহিনি—এক বিদেশি স্বাদ কীভাবে আমাদের নিজেদের স্বাদ হয়ে উঠল।
গোলমরিচের সিংহাসন দখল
ভারত উপমহাদেশে এসে মরিচ প্রথমেই দাক্ষিণাত্যে জায়গা করে নেয়। কারণ, সেখানকার মানুষ আগে থেকেই ঝাল খাবারে অভ্যস্ত ছিলেন। তখনকার রান্নায় গোলমরিচের শাসন। মরিচ এসে সেই গোলমরিচকেই হারিয়ে দিল। একই রকম ঝাঁজ, চেহারাতেও কিছুটা মিল, অথচ পাওয়া ভীষণ সহজ। বাড়ির উঠোনে, রান্নাঘরের বাইরেও গাছ লাগানো যায়। রান্না করতে করতে গাছ থেকে টপাটপ পেড়ে এনে ব্যবহার করা যায়। এমন সবজি বা মসলা গৃহিণীদের প্রিয় হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে গোলমরিচকে সরিয়ে পাকঘর দখল করতে মরিচের বেশি সময় লাগল না।
ষোড়শ শতকের শেষ দিকে মোগল আমলের হিন্দুস্তানে লেখা 'আইন-ই-আকবরি'-তে চল্লিশটি পদের রান্নার বিবরণ দেওয়া আছে। কিন্তু কোনো পদেই মরিচের নামগন্ধ নেই। সব পদেই গোলমরিচের ব্যবহারের কথা লেখা। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের প্রবাদপ্রতিম চারণকবি পুরন্দরদাস, যিনি ১৪৮৪ থেকে ১৫৬৪ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, মরিচের ভালোবাসায় গান পর্যন্ত লিখেছেন—'তোমায় আমি প্রথম দেখি সবুজ—অভিজ্ঞতা তোমায় রাঙা করেছে হে সুন্দরী। তুমি সুস্বাদু কিন্তু পরিমিতি মাপা। হে গরিবদের মসিহা, তোমায় পেলে বিটঠল ভগবানকেও ভুলতে বসি।' (বিটঠল—মহারাষ্ট্রের পন্ধরপুরে কৃষ্ণ-বিষ্ণুর এক জনপ্রিয় রূপ, যার পূজা করা হয়।)
খাদ্য-ইতিহাসবিদ লিজি কলিংহ্যামের মতে, ভারতীয়রা কত দ্রুত মরিচকে গ্রহণ করেছিল, তার বড় প্রমাণ হলো আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরাও। দ্রুত একে নিজেদের চিকিৎসাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তারা। সাধারণত বৈদিক যুগে পরিচিত ছিল না এমন কোনো উপাদান গ্রহণে তাঁদের অনীহা ছিল। কিন্তু মরিচের বেলায় সেই অনীহা টেকেনি। সময়ের সঙ্গে এটি আয়ুর্বেদেও ঢুকে পড়ে; এমনকি বিদেশি উপাদান গ্রহণে অনাগ্রহী এই চিকিৎসাব্যবস্থায় কলেরার ওষুধ হিসেবেও মরিচের স্থান হয়।
ভাস্কো-দা-গামার ভারতে আসার এক শ বছরের মধ্যেই ভারত সফলভাবে মরিচের চাষ শুরু করে। এতই সফল ছিল সে চাষ যে দেশটি শুকনো মরিচ ও মরিচের গুঁড়ার নিট রপ্তানিকারকে পরিণত হয়। ব্যবসায়ীরা গোলমরিচ, জায়ফল ও অন্যান্য মসলার সঙ্গে ভারতীয় মরিচও পশ্চিমে নিয়ে যেতে শুরু করেন। কলিংহ্যামের মতে, মরিচ রপ্তানির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত তুর্কিরা। তারা ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে মরিচ কিনে কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোতে এবং নিজেদের দেশে নিয়ে যেত। সেখান থেকে মরিচ পৌঁছাত উত্তর ইউরোপের ইংল্যান্ড, জার্মানি, হল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে।
এর ফলে অনেক ইউরোপীয় মরিচকে উপমহাদেশের আরেকটি মসলা বলে ভাবতে শুরু করেন। অথচ মরিচ কিন্তু মসলা নয়। সবজি। মরিচের মসলা বনে যাওয়ার এই ধারণা এখনো টিকে আছে।
কলিংহ্যামের মতে, তুর্কিরাই হাঙ্গেরি জয় করার পর সেখানে মরিচের প্রচলন ঘটায়। ফলে হাঙ্গেরির বিখ্যাত পাপরিকা আসলে উপহমহাদেশীয় মরিচ। উদ্ভিদতাত্ত্বিক বিচারে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে কাশ্মীরি মিরচ কিংবা দক্ষিণ ভারতের বেডগি মরিচের সঙ্গে। এখানে একটি সহজ ব্যাখ্যাও সামনে আসে। গরম দেশের মানুষ ঝাল খাবার পছন্দ করেন, ঠান্ডা দেশের মানুষের খাবারের স্বাদ তুলনামূলক মৃদু। কলিন টেইলর সেনের ব্যাখ্যাতেও গরম অঞ্চলে মসলাদার খাবারের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা এসেছে। মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও জিরার মতো উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার করলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়। কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষের মরিচ গ্রহণের গল্প শুধু জলবায়ু দিয়ে শেষ করা যায় না। কারণ, এখানকার রান্নায় মরিচ ছিল বহু মসলার মধ্যে মাত্র একটি। অন্য সব মসলা বহু আগে থেকেই ছিল। মরিচ এসে তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে একেবারে নতুন এক স্বাদ তৈরি করল।
আর এই নতুন স্বাদকে ভারত শুধু নিজের কাছে আটকে রাখেনি।
ভারতবর্ষ হয়ে উঠল মরিচের পৃথিবী
পাঠ্যবইয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, পর্তুগিজরাই মরিচকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিল। এর পরিচিত উদাহরণ পেরি-পেরি মরিচ। পর্তুগিজরা আফ্রিকায় তাদের উপনিবেশগুলোতে এই মরিচের চাষ করেছিল। পরে তা থেকে তৈরি হয় বিখ্যাত ঝাল সস। সেই সূত্র ধরেই জন্ম নেয় ন্যানডোস ও বার্সেলোসের মতো নাম। গোয়াতেও ক্যাথলিকদের রান্নায় পেরি-পেরি মসলা মৌলিক উপাদান হয়ে ওঠে।
থাইরাও পেরি-পেরি মরিচের একটি ভিন্ন ধরন ব্যবহার করেন, যদিও সেটি সাধারণত 'বার্ডস আই চিলি' নামে পরিচিত। এই মরিচ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে পাখির বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু থাইল্যান্ড কি এটি ভারত থেকে পেয়েছিল? কারণ, তখন সারা ভারতজুড়েই মরিচের চাষ হচ্ছিল।
প্রচলিত ধারণা অবশ্য তা নয়। বলা হয়, পর্তুগিজরা এখন মালয়েশিয়ার অংশ, মালাক্কার বন্দর দখল করার পরপরই প্রাচীন থাই রাজধানী আয়ুথিয়ায় একজন দূত পাঠিয়েছিল। আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয়, থাইল্যান্ডে পর্তুগিজদের সেই স্বল্পস্থায়ী ও সীমিত উপস্থিতিই থাইদের মরিচের স্বাদের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
চীনে মরিচ পৌঁছানোর ইতিহাস নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। মরিচ ছাড়া সিচুয়ান রান্নার কথা ভাবাই কঠিন। কিন্তু সিচুয়ানে মরিচ নিয়ে গিয়েছিল কে? একটি তত্ত্ব বলছে, ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরাই এটি সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সিচুয়ান তো উপকূলীয় অঞ্চল নয়। কোন ইউরোপীয় ব্যবসায়ী সেখানে পৌঁছেছিলেন, কীভাবে এবং কখন—তার উত্তর স্পষ্ট নয়। আরেকটি তত্ত্ব হলো, স্থলপথে মরিচ সেখানে পৌঁছেছিল, সম্ভবত বার্মা হয়ে। এই ব্যাখ্যাটি তুলনামূলকভাবে বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
পূর্ব এশিয়ায় মরিচের যাত্রা নিয়ে স্প্যানিয়ার্ডদের নিজস্ব তত্ত্ব রয়েছে। পর্তুগিজরা বলিভিয়া থেকে মরিচের গাছ নিয়ে গিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিল—এই প্রচলিত ব্যাখ্যা নিয়ে তাদের আপত্তি আছে। তাদের যুক্তি, মেক্সিকোর সঙ্গে স্পেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল; দেশটি তখন স্পেনের শাসনাধীন। একইভাবে ফিলিপাইনও ছিল স্পেনের অধীনে। স্প্যানিয়ার্ডদের দাবি, তারা মেক্সিকোর মরিচ ফিলিপাইনে নিয়ে গিয়েছিল এবং সেখান থেকেই তা এশিয়ার অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
এই সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু তাতেও ভূত জলকিয়ার রহস্যের সমাধান হয় না। ভূত জলকিয়া আবার নাগা মরিচ নামেও পরিচিত, নাগাল্যান্ড এবং হিমালয়ান উপমহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চলে কীভাবে পৌঁছাল—এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সেই সময়ে ভারতের অন্য অংশ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলগুলোতে উপনিবেশকারীরা মরিচ নিয়ে গিয়েছিল, এমন কোনো গল্পও নেই। আবার যে অল্প কয়েকজন মিশনারি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছেছিলেন, তাঁরা এক হাতে বাইবেল আর অন্য হাতে মরিচ নিয়ে গিয়েছিলেন। না, এমনটা মনে করার কারণও নেই।
তার ওপর নাগা মরিচের উদ্ভিদতাত্ত্বিক প্রজাতি 'ক্যাপসিকাম চিনেন্স'; ভারতের অধিকাংশ অন্য মরিচের মতো 'ক্যাপসিকাম অ্যানুয়াম' নয়। তাহলে এই জাতটির বিকাশ ঘটল কীভাবে? দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা এমনকি গোয়া থেকে বহু দূরের ওই পাহাড়ে এটি কীভাবে বুনো অবস্থায় জন্মাল এবং এত তীব্র ঝাল হয়ে উঠল? আমরা জানি না।
তবে মরিচের বিস্তার নিয়ে এই রহস্যের মধ্যেও একটি বিষয় পরিষ্কার। এশিয়ায় মরিচ ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস এখন পর্যন্ত মূলত ইউরোপীয়রাই লিখেছেন। আর সেই ইতিহাসে ভারত উপমহাদেশের ভূমিকা অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয়েছে, যেন উপমহাদেশটি শুধু ইউরোপীয়দের কাছ থেকে একটি নতুন স্বাদ পেয়েছিল। অথচ একবার আমাদের উপমহাদেশের রান্নাঘরে ঢোকার পর মরিচকে স্থানীয়রা এমনভাবে নিজেদের করে নিয়েছিল যে পরে সেটিই আবার বিশ্বের নানা রান্নাঘরে পৌঁছে যায়। এই জায়গাতেই গল্পটি আবার ফিরে যায় তার শুরুতে।
রাজকুমারী, পঙ্খিরাজ আর আমাদের রান্নাঘর
আমাদের দেশের ভারী প্রিয় খাবার আচার। শব্দটিও এদেশীয় নয়। মরিচকে মধ্য আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে 'আচা' বা 'আছা' বলা হয়। সেখান থেকেই 'আচার' শব্দটির সঙ্গে যোগসূত্রের কথা বলা হয়।
মরিচের এই উপমহাদেশ বিজয়ের পুরো কৃতিত্ব দাবি করতে পারে পর্তুগিজরা। কারণ, তাদের হাত ধরেই মরিচ ভারত উপমহাদেশে পৌঁছেছিল। মুম্বইয়ের বাজারে কয়েক দশক আগেও মরিচকে 'গোয়াই মিরচি' বলা হতো। পর্তুগিজরা শুধু এ দেশের মানুষকে মরিচের স্বাদ খাইয়ে ক্ষান্ত থাকেনি। ১৫৪২ সালে পর্তুগিজ যাজকেরা জাপানে আসেন। সঙ্গে আসে মরিচ। পরে তারা কোরিয়াতেও পৌঁছে যায়। বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী পর্তুগিজরা হয়তো বুঝেছিল, আগামী দিনে মরিচ গোলমরিচকে কোণঠাসা করে দেবে এবং সারা বিশ্বের রান্নাঘর নিজের দখলে নেবে। মরিচ ফলানো সহজ। তাই অন্যরা জেগে ওঠার আগে যতটা সম্ভব ব্যবসা করে নেওয়াই ছিল তাদের স্বার্থ।
কিন্তু মরিচের এই যাত্রাপথ যখন ভারতবর্ষকেন্দ্রিক হয়ে উঠল, তখন ইউরোপের লোকজন ভুলতে শুরু করল যে মরিচের আদি দেশ মধ্য আমেরিকা। বরং তাদের মনে এই ধারণা মজবুত হলো—ভারতবর্ষই মরিচের মাতৃভূমি। অর্থাৎ চলতি কথায় বলা যায়, বাপের নাম না ভুলালেও জন্মভূমির নাম ভুলিয়ে দিয়েছে মরিচ!
অন্যদিকে ইউরোপের কিছু অংশে, যেমন হাঙ্গেরিতে, মরিচ বা পাপরিকা গিয়েছিল তুর্কিদের মাধ্যমে। তুরস্কে আবার লঙ্কা পৌঁছেছিল ভারতবর্ষ থেকে আরব বণিকদের হাত ঘুরে পারস্য হয়ে।
এই ব্যবসায়িক বুদ্ধি পর্তুগিজদের জন্য দারুণ সফল হয়েছিল। কারণ, ভারতবর্ষ ছিল সত্যিই সোনার দেশ। সেখানে গোলমরিচ ও মরিচ দুই-ই পাওয়া যেত। ইউরোপের যেসব দেশে মরিচের প্রচলন তখনো হয়নি, সেখানে গোলমরিচ জোগান দিত তারা। আর বাকি দেশগুলোতে পাঠাত লঙ্কা।
সময়ের সঙ্গে মরিচ হয়ে উঠেছে আমাদের উপমহাদেশের স্বাদের অন্যতম পরিচয়। এমনকি একসময় মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে, এই ঝাল রাজকুমারীর জন্ম হয়েছিল এত দূরের এক দেশে।
১৯১২ সালে আমেরিকার ফার্মাসিস্ট উইলবার স্কোভিল লঙ্কার ঝাল মাপার একটি স্কেল তৈরি করেন। এরপর ভারত আর লাতিন আমেরিকার মধ্যে শুরু হয় হাড্ডাহাড্ডি ঝালবাজির প্রতিযোগিতা। ২০০৭ সালে নাগাল্যান্ডের 'ভূত জোলোকিয়া'কে বিশ্বের সবচেয়ে ঝাল মরিচের রাজমুকুট পরায় গিনেস বুক। এ মরিচ মেক্সিকোর টাবাসকোর চেয়েও ৪০০ গুণ বেশি ঝাল। ২০১১ সালে হঠাৎ সেই শিরোপা কেড়ে নেয় ইংল্যান্ডের 'ইনফিনিটি চিলি'। কিন্তু বেশি দিন নয়—২০১৪ সাল থেকেই নাগা জোলোকিয়ার মাথায় ফিরে আসে সেরা ঝালবাজের রাজমুকুট। এর স্কোভিল ইউনিট ১৩,৮২,১১৮। ভারতবর্ষের নাগামরিচ তাই বিশ্বে ঝালবাজিতেও সবার সেরা।