ডলির ছবির খোঁজে
ডলি আনোয়ারের নাম শুনলে সবার আগে আমাদের মাথায় আসে 'সূর্য দীঘল বাড়ি'র জয়গুনের মুখ। সিনেমা-মঞ্চ ও টেলিভিশন শক্তিশালী অভিনেত্রী ছাড়াও তিনি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, শিল্প নির্দেশনা দিতেন। এই পরিচয়ের বাইরে তার আরও পরিচয় আছে। তিনি প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. নীলিমা ইব্রাহিমের কন্যা কিংবদন্তি আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী। ডলির এসব পরিচয় মানুষের কমবেশি জানা। কিন্তু তার আরেকটি পরিচয় আমাদের মেইন স্ট্রিম ন্যারেটিভে একেবারেই নেই। আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি কতটা শক্তিময়ী ছিলেন কিংবা এ দেশের আলোকচিত্রশিল্পে তার অবদান কী—সেই আলাপটা একেবারেই সামনে আসে না। তাই আমার এই প্রবন্ধ ডলি আনোয়ারের ফটোগ্রাফিকে ঘিরে রচিত হয়েছে।
অনেক বছর ধরেই ভাবছিলাম ডলির ফটোগ্রাফি নিয়ে লিখব। কিন্তু লেখার মতো পর্যাপ্ত তথ্য পাচ্ছিলাম না। বছর পাঁচেক আগে 'বিপিএস নিউজলেটার'-এ প্রকাশিত একটি সাদাকালো ছবি দেখে আমার চোখ আটকে যায়। সাগরপাড়ে পাখির ডানার মতো দুহাত মেলে দিয়ে সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছেন এক অচেনা নারী। অসীমানায় তার দৃষ্টি। পড়ন্ত বেলার আলোর রঙে চিক চিক করছে সাগরের পানি। তীরের কাছে যে চর, সেখানে গুটিকয়েক মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। চরের পরে সাগরটা মিশে গেছে দিগন্তে। 'বিপিএস নিউজলেটার'-এর ডিসেম্বর ১৯৮৬ সংখ্যায় প্রকাশিত ছবিটির শিরোনাম—'দেবতা'। ছবিটির আলোকচিত্রী ডলি আনোয়ার। ক্যাপশনে লেখা, ১৯৮২-৮৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৃতীয় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে 'মানুষ ও পৃথিবী' ক্যাটাগরিতে প্রদর্শিত ছবি। শিরোনামের সঙ্গে ছবির বিষয়বস্তু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। ছবিতে রূপান্তরের বিষয়টি প্রবলভাবে ধরা পড়ে। ছবির মানুষটির যিশুর মতো হাত বাড়িয়ে রাখা। শরীরে জড়ানো কাপড়টাও একটু অন্য রকম, ফিনফিনে সাদা কাফনের মতো। মানুষ থেকে দেবতায় রূপান্তরের ধাপ—সেটাই হয়তো রুপালি রসায়নে তুলে ধরতে চেয়েছেন ডলি।
ছবিটির বিষয়বস্তুর সঙ্গে ডলির বাস্তব জীবনেরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ছবির বেশির ভাগ অংশই কালো। সেখানে সামান্য আলোর বিচ্ছুরণও আছে। এই ছবির ফিগারের যে ভাষা—তাতে সিল্যুটের মধ্যে তার ব্যক্তিচরিত্রও ফুটে ওঠেছে। ছবিটির পুরো ফ্রেমে ভর করে আছে নির্জনতা আর একাকিত্ব। ছবির মানুষটির ভেতরের যে নিঃসঙ্গতা, তা যেন তার বাইরের অবয়বেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পথিকৃৎ আলোকচিত্রীদের কোনো দুর্লভ-দুষ্প্রাপ্য ছবির সন্ধান পেলে আমি সাধারণত সেই ছবির ভেতরের মানুষের নাম ও পরিচয় খুঁজি। এটা আমার আলোকচিত্রবিষয়ক গবেষণার একটি পদ্ধতি। তবে ডলির তোলা এই ছবিটি দেখে আমি একবারও ছবির মানুষটির নাম-পরিচয় খুঁজে বের করার চেষ্টা করি নাই। ছবিটি দেখে আমার কেবলই মনে হয়, এই ছবির ভেতরের মানুষটি ডলি নিজে—অসংখ্য মানুষের মধ্যে থেকেও যিনি বড্ড একাকী।
'বিপিএস নিউজলেটার'-এর ফাইল উল্টাতে উল্টাতে ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যার প্রচ্ছদে পেলাম ডলি আনোয়ারের তোলা আরও একটি ছবি। ছবিটির শিরোনাম—'স্বপ্ন'। পত্রিকাটির ইনার পেজে লেখা—চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটির (সিপিএস) প্রথম জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় সম্মানসূচক পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি। ডলির ছবির সঙ্গে এভাবেই আমার পরিচয়। আশির দশকে আলোকচিত্রশিল্পের প্রতি ডলির এমন ধ্যানমগ্নতা সত্যি বিস্ময়কর, যা আমাকে তার প্রতি কৌতূহলী করে তোলে। কিন্তু কৌতূহলী হয়ে আমি পড়লাম এক মস্ত বিপদে। কারণ, তার ছবি দেখার কোনো উপায় নাই। তারপর এক দীর্ঘ বিরহবেলা!
অনেক দিন পর হঠাৎ ফেসবুকে দেখি, আলোকচিত্রী স্বপন সাহার তোলা ডলি আনোয়ার ও আনোয়ার হোসেনের একটা দুর্দান্ত ছবি। বাঁশঝাড়ের নিচে খরগোশ কোলে ডলি। বাতাসে নড়ছে বাঁশপাতা। পাতার ফাঁক গলে আসছে মায়াবি আলো। সেই আলোয় ক্যামেরায় চোখ রেখে ডলির আদরমাখা ভঙ্গির ছবি তুলছেন আনোয়ার। এই ছবির পটভূমি জানতে স্বপন সাহাকে ফোন করি। স্বপন সাহা বললেন, 'ছবিটি ১৯৮৩ সালে তোলা। তখন "দহন" সিনেমার শুটিং চলছিল। দহনের মূল অভিনেত্রী ডলি আর আনোয়ার প্রধান চিত্রগ্রাহক।' আনোয়ারের সহকারী হিসেবে দহনের স্টিল ছবি তুলতেন স্বপন। স্বপন জানালেন, 'সেদিন ইস্কাটনের একটি বাড়িতে শুটিং চলছিল। কিন্তু ওই দিন ডলির কোনো শুট ছিল না। শুট না থাকলেও আনোয়ারকে সঙ্গ দিতে ডলি প্রায় শুটিং স্পটে আসতেন। ওই দিনের শুটিংয়ের ফাঁকে হঠাৎ এল সাদা কাফনের মতো ধবধবে একটি খরগোশ। খরগোশটিকে কোলে নিয়ে খেলায় মেতে উঠলেন ডলি। আনোয়ার দৌড়ে গিয়ে ডলির ছবি তুলতে লাগলেন। আর তখন এই দুই শিল্পীর অপূর্ব মুহূর্তটা ক্যামেরায় ধরলেন স্বপন।
স্বপন সাহার সামনে বসে তার মুখে ডলির আরও কথা শুনতে চাই। স্বপন সাহা আমার কাছে সপ্তাহখানেক সময় চাইলেন। বললেন, এর মধ্যে ডলির কিছু জিনিসপত্র গোছাই। সাত দিন যায়, দশ দিন যায়, স্বপন সাহার ফোন আসে না। বারো দিনের মাথায় এক রাতে ফোন পেলাম। পরদিন সকালে গিয়ে হাজির হলাম তার হাতিপুলের বাসায়। তার কাছেই শুনলাম, ডলি আর আনোয়ারের পরিচয়, প্রেম, পরিণয় আর বিরহের কাহিনি।
মাত্র ৪৩ বছরের জীবন ছিল ডলির। এর মধ্যে টানা এক যুগ তিনি ফটোগ্রাফিচর্চায় নিবেদিত ছিলেন। 'সূর্য দীঘল বাড়ি' সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে আনোয়ারের সঙ্গে ডলির পরিচয়। এরপর একসঙ্গে ঘর বাঁধা। ওই সময়ই আনোয়ারকে দেখে দেখে ফটোগ্রাফির প্রতি প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠেন ডলি। আনোয়ারের ছবি তোলার জাদুটোনাটাও তিনি রপ্ত করে ফেলেছিলেন। ফলে আশেপাশের খুবই ছোট ছোট বিষয়ও তার ক্যামেরায় শিল্প হয়ে উঠত। প্রথমে তার ক্যামেরা ছিল না। আনোয়ারের ক্যামেরায়ই ছবি তুলতেন। একবার আনোয়ার বিদেশের আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতে একটি অলিম্পাস ওএম-১০ ক্যামেরা উপহার পান। ক্যামেরাটি তিনি ডলিকে ব্যবহার করতে দেন। ছবি তোলার পাশাপাশি ডার্করুমে ছবি পরিস্ফুটন কাজেও দক্ষ হয়ে ওঠেন ডলি। ওই সময় আনোয়ার ছবি তোলায়ই এত ব্যস্ত থাকতেন যে ছবি প্রিন্ট করার আর সময় পেতেন না। ফলে আনোয়ারের সমস্ত ছবি আলোক সংবেদনশীল কাগজে ফুটিয়ে তুলতেন ডলি। এ কাজটা তিনি পরমানন্দের সঙ্গে করতেন। ডলিকে ডার্করুমে সহযোগিতা করতেন স্বপন। ওই সময় সিনেমা-নাটকে ডলির প্রচুর চাহিদা ছিল। কিন্তু ওসবে তার অতটা মন ছিল না, যতটা ছিল ফটোগ্রাফির প্রতি। ফটোগ্রাফি তাকে অর্থ দেয়নি, আনন্দ দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে। একদিন ডার্করুমে কেমিক্যালে পেপার ডুবিয়ে ছবি ফুটিয়ে তুলতে তুলতে ডলি বলছিলেন, 'এত অর্থ দিয়ে কী হবে স্বপন! আমরা তো শেষ জীবনে একটি নৌকা কিনে নদীতে ভেসে বেড়াব।'
স্বপন সাহা ওই দিন আমাকে ডলির অলোকচিত্র প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগ দেখান। ওই ক্যাটালগে ডলির তোলা ছয়টি ছবি আমার তৃষ্ণার আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। কমনওয়েলথ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ক্যাটালগে দেখতে পাই ডলির ব্রোঞ্জজয়ী ছবিটি। আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত ফটোগ্রাফিবিষয়ক ত্রৈমাসিক 'আয়নার পত্র'-এর প্রথম সংখ্যায় (এপ্রিল ১৯৮৯) দেখি ডলির তোলা আরও একটি ছবি। দেখতে পাই ডলির সম্পাদিত 'সাতদিন'-এর একটি সংখ্যাও। স্বপন সাহার সঙ্গে আলাপ করতে করতেই ডলির আরও কয়েকটি ছবি দেখার একটি রাস্তা খুঁজে পাই। যোগাযোগ করি ৩৬৫ ফটোগ্রাফি রিচার্স সেন্টারের পরিচালক সাইফুল আমিন কাজলের সঙ্গে। ডলির আককু পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিটি তিনি আমার হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে পাঠান। এরপর জানতে পারি, ১৯৮৫ সালে ডিএফপি থেকে প্রকাশিত 'বাংলাদেশ: ল্যান্ড অ্যান্ড পিপল ও বাংলাদেশ: লাইফ অ্যান্ড কালচার' নামের ফটো অ্যালবাম দুটিতে ডলির পাঁচটি ছবি ছাপা হয়। বহু জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর প্রয়াত আলোকচিত্রী কাজী মিজানুর রহমানের বাসায় গিয়ে অ্যালবাম দুটি দেখতে পাই। এভাবে ডলির ১৫টি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। ডলির বাকি ছবির রত্নভান্ডার—কোথায়, কী অবস্থায় আছে অজানা।
ডিএফপির অ্যালবাম দুটিতে আলোকচিত্রী ডলি আনোয়ারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ছাপা হয়। ১৯৭৯ সালে আলোকচিত্রচর্চা শুরু করেন ডলি। ১৯৮০ সালে তিনি সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কমনওয়েলথ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কমনওয়েলথ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় 'কালচার অ্যান্ড ট্র্যাডিশন' ক্যাটগরিতে ব্রোঞ্জ পদক পান। তার ছবির শিরোনাম 'দ্য নিউ কামার'। ওই প্রতিযোগিতায় 'ফরেস্ট ফ্রান্টাসি' ছবির জন্য এনভায়রনমেন্ট ক্যাটাগরিতে সার্টিফিকেট অব মেরিট লাভ করেন। একই বছর তিনি ১৭তম ফিয়াপ কংগ্রেসে অংশগ্রহণ, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে তৃতীয় আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। ওই বছর নভেম্বর মাসে 'স্বপ্ন' শিরোনামের ছবির জন্য চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটি আয়োজিত প্রথম জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় সম্মানসূচক পুরস্কার পান। ১৯৮৭ সালে পান জাপানের এশিয়া প্যাসিফিক কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেসকো আয়োজিত আককু পুরস্কার। ১৯৭৯-১৯৮৫ সময়কালে তিনি বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় নিজের কাজ প্রদর্শন করেন। ১৯৮২ সালে তিনি ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাবের মাসিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার পান।
ডলির জীবদ্দশায় কোনো একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়নি। মৃত্যুর পর তার দুটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম প্রদর্শনী হয় ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর ঢাকার ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। প্রদর্শনীর আয়োজক ছিল বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ। প্রদর্শনীতে ডলির ৬৮টি ছবি প্রদর্শিত হয়। প্রদর্শনী উপলক্ষে আট পৃষ্ঠার একটি ফোল্ডিং ক্যাটালগ প্রকাশ করা হয়। ক্যাটালগে ডলি সম্পর্কে লেখেন কবি শামসুর রাহমান, কথাশিল্পী রাহাত খান, স্থপতি রবিউল হুসাইন, শিল্প নির্দেশক কালাম মাহমুদ, শিল্পী সৈয়দ ইকবাল, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব খ. ম. হারুন, আলোকচিত্রী স্বপন সাহা ও সেলিম নেওয়াজ ভুঁইয়া। ডলির দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালের ৯ এপ্রিল চট্টগ্রামের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে। ফটোগ্রাফি সংগঠন 'আলোকচিত্রম'-এর ব্যানারে সপ্তাহব্যাপী ওই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন আলোকচিত্রী মৃণাল সরকার।
ডলির প্রথম প্রদর্শনীর ক্যাটালগের ভূমিকায় লেখা হয়, 'ডলি আনোয়ার ছিলেন বাংলাদেশের এমন একজন অভিনেত্রী, যার তুলনা করা যেতে পারে আন্তর্জাতিক প্যারালাল সিনেমার প্রথম শ্রেণির প্রতিভার সঙ্গে। শোনা যায়, ১৯৮২ সালে কলকাতায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে "সূর্য দীঘল বাড়ি" দেখে সত্যজিৎ রায় বলেও ছিলেন এ রকম কথা। দেশে আলোকচিত্র কর্মীদের নানা সংস্থা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে তার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ। তার আলোকচিত্র সম্পর্কে ঝোঁক ছিল অল্প দিন। সেই অল্প সময়ে তিনি কি অপূর্ব কাজ করেছেন, তা দর্শকের সামনে তুলে ধরাই আমাদের ইচ্ছা। তার এই অল্প সময়ের কাজ কমনওয়েলথ প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পেয়েছে, যে প্রতিযোগিতায় মনোনীত হওয়াই বিশে^র নানা দেশের ফটোগ্রাফারদের স্বপ্ন।'
ডলি সম্পর্কে শামসুর রাহমান লিখেছেন, 'ডলি ভালো ছবি তুলতে পারতেন। তার কোনো কোনো আলোকচিত্র পুরস্কৃতও হয়েছে। আনোয়ার হোসেন ডলির ক্যামেরার কাজের কথা তারিফ করেছেন আমার কাছে। সেই তারিফ স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দুর্বলতার প্রকাশ ছিল না, একজন শিল্পীর অন্য শিল্পীর কাজের চমৎকারিত্বের প্রতি কদরের পরিচয় ফুটে উঠত। ডলি একপর্যায়ে সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন। তার সম্পাদনায় "সাতদিন" নামে একটি রুচিশীল সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। অবশ্য "সাতদিন" দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে এই ক্ষীণায়ু সাপ্তাহিকটি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ডলির যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে জেগে থাকবে আমাদের স্মৃতিতে, আমরা যারা এই হাশিখুশি, অস্থিরচিত্ত শিল্পী মানুষটিকে চিনতাম। ডলি আনোয়ার মনেপ্রাণে আধুনিক ছিলেন, এই আধুনিকতা ফাঁপা কিংবা লোকদেখানো কোনো ব্যাপার ছিল না। সব মানুষ খেয়ে-পরে ভালোভাবে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকুক, এ ছিল ডলির একান্ত কাম্য। প্রগতি আর মানবকল্যাণের পক্ষে তার উচ্চারণের স্পষ্টতা আমাকে মুগ্ধ করত। ধর্মান্ধতা ছিল তার দুচোখের বিষ। কারণ, ধর্মান্ধতা তার বিবেচনায় অকল্যাণ ডেকে আনে, প্রগতিশীলতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আরেকটি কথা—ডলি আনোয়ারের মধ্যে জীবনবিমুখতা আমি কখনো লক্ষ করেছি বলে মনে হয় না। রবং তার কথাবার্তায় বেঁচে থাকার আনন্দ প্রস্ফুটিত হতো। কখনো কখনো বিষাদ তাকে ছুয়ে যেত বটে, দখল করতে পারত না। তার উচ্চারিত বাক্যসমূহে জীবনতৃষ্ণার ছলছল ধ্বনি আমি শুনেছি বারবার।'
রবিউল হুসাইন লিখেছেন, 'সংসারে কিছু কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করে, যারা জন্মগতভাবে উন্মূল, তুলোর মতোন ভেসে ভেসে বেড়ায়। সুগন্ধী ফুলের সুবাসের মতোন বাতাসের ভেতর দিয়ে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে কিংবা আলোর মতোন শুধু অন্ধকারকে আলোকিত করে যায় আজীবন। তারা নিজেদের তাই সব সময় উহ্য রাখে, গৌণ রাখে অপরের কাছে। প্রচণ্ড অস্থির, বর্তমান সময়ের থেকে সর্বদা অগ্রগামী, চলনে, বলনে, পোশাকে, ব্যবহারে এবং বোধে ও অনুভবে শুধু দুঃখ পায় অপরকে সুখী করতে গিয়ে, নিজেকে যেমন বুঝতে গিয়ে লক্ষ্যহীনতায় ভোগে, তেমনি অপরকেও। তারপর প্রচণ্ড অভিমানের পাহাড়ে নিজেকে সমাসীন করে অত উঁচু থেকে সবাইকে দেখতে গিয়ে কেমন যেন ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে, কারও সঙ্গে আর কারও হিসাব মেলাতে পারে না—ডলি আনোয়ারের কথা মনে হলেই আমার প্রাগুক্ত কথাগুলো মনে হয়। আনোয়ার, আমাদের স্নেহভাজন; মূলত স্থপতি, তবে মূল পেশায় না গিয়ে অন্যদিকে অর্থাৎ আলোকচিত্রী হয়ে সে অসম্ভব সাধন করেছে। তারই যোগ্য বন্ধু ও সহধর্মিণী ছিল ডলি। শাকের আর নিয়ামতের "সূর্য দীঘল বাড়ি"র অসামান্য ক্যামেরার শিল্পকর্মে যেমন আনোয়ারের ক্ষমতা ধরা পড়ে, তেমনি প্রমাণিত হয় ডলির সেই জয়গুন চরিত্রের একীভূত আশ্চর্য রূপায়ন। এ সময়েই দুইজনের পবিত্র পরিচয় এবং ঘর-বাঁধা।'
কালাম মাহমুদ ডলিকে নিয়ে লিখেছেন, 'অহংকারী হওয়ার মতো জন্মলব্ধ মর্যাদা ছিল তার, যা খুব বেশি মানুষের থাকে না। ডলি ইব্রাহিম। ব্যক্তিত্বের পর্যায় পেরিয়ে যাওয়া সম্মানের অধিকারী ছিলেন বাবা-মা। কিন্তু অনেক গুণ এগিয়ে যান ডলি নিজে, অনেক দূর। শরীরে-স্বভাবে, মননে-মেধায় স্বতন্ত্র, সৃজনশীল ডলি শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে নিরন্তর সনিষ্ঠ চর্চায় হয়ে ওঠেন শিল্পশুদ্ধতার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এক শিল্পী। অভিনয়ে, আলোকচিত্রে, এমনকি সাংবাদিকতা, সম্পাদনায়। মঞ্চে, টিভিতে, চলচ্চিত্রে তার ঈর্ষণীয় উজ্জ্বল অবস্থান ছিল উৎকর্ষের সন্নিকট। আর তার সাহস! জীবনে যেমন ছিল কিছুকেই তোয়াক্কা না করার সহজাত অভ্যাস, তেমনি মৃত্যুতেও। স্বেচ্ছামৃত্যুর আত্মহত্যাকাণ্ডে তা হয়ে ওঠে আরও তীক্ষ্ণ, নিষ্ঠুর। টনটনে সচেতনবোধ নিয়ে স্বজ্ঞানে স্বেচ্ছায় নিজেকে মেরে ফেলার মতো অসীম অন্যায় সাহস বুঝি শুধু একজন শিল্পীরই থাকে। ডলির ছিল সেই সাহস।'
ডলির মৃত্যুর বহু বছর পর রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় 'অদ্বিতীয়া ডলি' নামে একটি বই প্রকাশিত হয়। বিভিন্নজনের লেখায়, স্মৃতিকথায় ডলির বিস্ময়কর জীবনের কথা জানা যায়। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. নীলিমা ইব্রাহিম ও চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের ঘরে জন্ম নেওয়া ডলি ছিলেন পাঁচ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় পিয়ারা ইব্রাহিম ডলি। শৈশব থেকেই থিয়েটার ও শিল্পের প্রতি তার গভীর অনুরাগ। ফলে খুব অল্প বয়সেই তার সহজাত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটতে শুরু করে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় জগন্নাথ কলেজের সাহিত্য বিভাগের ছাত্রী হিসেবে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আর এখানেই তৎকালীন ছাত্রনেতা রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর (পরবর্তী সময়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী) সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। রাজু ও ডলির ঘরে এক ছেলে জন্ম হয়। 'সূর্য দীঘল বাড়ি' ছবিতে অভিনয়ের সময় তিনি স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরপর তিনি আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। 'সূর্য দীঘল বাড়ি' সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর মর্যাদা পান। আনোয়ার পান শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহকের মর্যাদা। ডলি 'দহন' ও 'হুলিয়া' ছবিতেও অভিনয় করেন। টেলিভিশনের প্রথম নাটক 'একতলা দোতলা'য় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ডলির অভিনয়জীবন শুরু হয়।
২০০৯ সালের ১ জুলাই ডলির ৬১তম জন্মদিনে সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটি তার না-বলা গল্পের এক স্মৃতিচারণা। এই বইয়ে নীলিমা ইব্রাহিম তুলে ধরেন ডলির জন্ম ও শৈশবের কথা—'উনিশ শ আটচল্লিশ সালের জুলাই, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ডলির জন্ম। ওর বাবা তখন জেলখানার ডাক্তার। জেলের অন্য এক ডাক্তার সুনীতি সরকারের হাতেই ওর জন্ম। ওর জন্মের পর মুহূর্তেই সুনীতি বাবু আমার কানের কাছে মুখ এনে বলেছিলেন, বৌদি, আপনার এই মেয়েটি অত্যন্ত ভাগ্যবতী হবে। ওর জন্ম বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। চারদিকে শাঁখ, উলুধ্বনি ও ধূপ-ধোঁয়ার গন্ধে ম-ম করছে। আজ মনে হয় সেদিন ভাগ্যবিধাতা বোধহয় মনে মনে হেসেছিলেন সুনীতি বাবুর ঐ আশাবাদী উক্তি শুনে। আমার একটি ছোট বোন আগেই মারা গিয়েছিল। তার নামও ছিল ডলি। আমার মেয়ে ডলি হুবহু তার মতো দেখতে হওয়ায় আমরাও ওর নাম রাখি "ডলি"। আমার স্বামী সব সময় ওকে কোলে দিয়ে বলতেন, দেখো, তোমার বোন ডলিই আবার তোমার কোলে ফিরে এসেছে। আমার বাবার বাড়ির লোকেরা প্রত্যেকে ওকে ভীষণ ভালোবাসতেন অনেকটা সেই কারণেই। জন্মের পর থেকেই ডলি অত্যন্ত দুর্বল, বেশির ভাগ সময়ই ও অসুস্থ থাকত। আমাদের পাঁচটি মেয়ে থাকা সত্ত্বেও সেই কারণে ওর প্রতি আমাদের মনোযোগ বেশি দিতে হতো। সব সময় ও আমাদের বিছানায় ঘুমাত। কোনো দিন জোর করে অন্য বিছানায় দিয়ে এলে ওর সেদিন জ্বর আসত।'
'সাতদিন' নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন ডলি। পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন তিনি পত্রিকা নিয়ে কী সিরিয়াস! ছবি তোলেন, লেখা দেখেন, প্রেসে ছুটেন। আনোয়ার তখন কানাডার এক সংস্থার হয়ে ছবি তোলার অ্যাসাইনমেন্টে আফ্রিকা মহাদেশের বোতসোয়ানার গ্যাবোরন শহরে। প্রথম সংখ্যা যেদিন প্রকাশিত হলো, ওই দিন আনোয়ার ডলিকে ফোন করেন। পত্রিকা বেরোনোর উত্তেজনা আর আনোয়ার মনে করে ফোন করার আনন্দে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলেন ডলি। বেশ কিছুক্ষণ কথার পর ফোন রেখে আনোয়ার খুব ফাঁকা অনুভব করলেন। আর তখনই লিখে ফেললেন জীবনের প্রথম কবিতা—'প্রবাস—ডলির প্রতি'। কবিতাটি ডাকে ডলির কাছে পাঠিয়েও দিলেন। ১৯৮৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রেরিত কবিতাটি পরে 'সাতদিন'-এ ছাপা হয়। ডলিকে উৎসর্গ করা কবিতায় আনোয়ার হোসেন লিখেছেন—
তোমার চুলের মসৃণ চিক চিক আর
পেলব ঠোঁটের গোলাপি রেখাগুলো
সবুজ কার্পেটের বুনুনি থেকে বিমানের জানালায়
হীরাসম কুচি কুচি চেরা দাগগুলি
নদী-নালা শ্যামলিমা অশেষ পেরিয়ে
অবশেষে অজানা আরেক দেশ।
উঁচু-নিচু বাদামি সবুজ পাহাড়ে ঘেরা
ঘরে ফেরা রাখালের আকাঙ্ক্ষার অবশেষ।
মসী-মাখা ষোড়শীর পাপড়ি-চেরা
সাদা চোখে তোমার প্রতিচ্ছবি-পেরিয়ে
শাটারের মরুভূমে আমি হলাম কবি!
কালাহারির তপ্ত শ্বাসে মরীচিকা তুমি,
ঝিরঝির বারি মাঝে রংধনু রবি
চিরসাথী মেঘরাজি চোখ যায় চুমি।
ছবি কবি, শিলা মেঘ, রথ পথ, কেশ দেশ-পেরিয়ে
সকচিত দিবালোকে, ঘুমহীন রজনী।
মিলনের রেশ প্রত্যাশায় যাযাবর আমি;
আবার পথে পথে অজানার হাতছানি।
তোমার কাছাকাছি, ঠোঁট আর কেশ
এগুবে একান্ত কাছে আমার, একালের উল্টোরথে।
মহাদেশ মহাকাশ, মহাসাগর পারাবার-পেরিয়ে
হঠাৎ কোন এক সকাল, দুপুর কিংবা রাতে
তোমার শ্যামলিমায় আমি একাত্ম আবার;
এবার ক্যামেরা নয়, চাতকের চিবুক মোর হাতে।
তবু—
ভয় হয়, পাছে বনলতা সেন কয়
এত দিন কেন প্রবাস ছিলেন?
আনোয়ার কবি ছিলেন না, ছিলেন ফটোগ্রাফার; ক্যামেরাপাগল এক মানুষ। কিন্তু আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমির পাশে বসে তিনি ডলিকে নিয়ে যে কবিতাটা লিখেছেন, তাতে হয়তো ভাষার ঠিক নেই কিংবা প্রথাগত কবিদের মতো বাক্যবিন্যাসে হয়তো অতোটা সতর্ক থাকেননি; কিন্তু বিপরীতে কবিতায় তিনি যা রোপণ করেছেন, তা হলো—বিশুদ্ধ আবেগ আর তার রুঢ় বাস্তবতা। বোতসোনা থেকে বাংলাদেশ—এই যে দূরত্ব, ফটোগ্রাফি দিয়ে এই দূরত্বকে অতিক্রম করে যাওয়া তখন তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই নিজের মায়ের ভাষা দিয়ে পাঁজরের ব্যাকুলতা উজার করে, প্রেয়সীর কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন।
ডলি তার সময় ফুরোবার বহু আগে চলে গেছেন। আনোয়ারও চলে গেছেন কিছুটা অসময়ে। ডলি আর আনোয়ারের কবিতার কথা যখন লিখছিলাম, তখন আমার বাসার সামনে অঝোরে বৃষ্টি নামছে। শ্রাবণের বৃষ্টি।