টেকসই উন্নয়নে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব কমানো যায় কিভাবে
কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। এই মহামারি শুধু আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়নি, বরং জীবন, অর্থনীতি এবং সমাজকে নজিরবিহীনভাবে বিপর্যস্ত করছে। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে, জাতিসংঘের ফাইনান্সিং ফর সাসটেইনএবল ডেভেলভমেন্ট রিপোর্ট-২০২০ বলছে, কোভিড-১৯ সংকটের জন্য টেকসই উন্নয়নের অনেক কার্যক্রম প্রবলভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনগনের স্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধি উপর (এসডিজি ৩)। একইভাবে প্রভাবিত করেছে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এবং কর্মসংস্থানকে (এসডিজি ৮)। গবেষণা দেখাচ্ছে, বড় দাগে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো যেমন ঢাকা, কাঠমান্ডু এবং নিউ ইয়র্ক কোভিড-১৯ আক্রমণে সুরক্ষিত নয় এবং এই ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থা কোভিড-১৯ ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা।
যে হারে কোভিড-১৯ ছড়াচ্ছে, তার পরিমাণই র্নিদেশ করে আমরা এই ভাইরাসের প্রতি কতটুকু অসুরক্ষিত এবং আমাদের (জাতীয়) স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা অপ্রস্তত! কোভিড-১৯ মহামারির সংকটাপূর্ণ অবস্থা ইঙ্গিত দেয় সরকারের 'জনস্বাস্থ্যের সামর্থ্য' নিরুপণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত।
স্পষ্টত, সরকারকে স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন বাড়াতে হবে উল্লেখযোগ্য হারে। একইসঙ্গে, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, এবং তাদের উন্নয়নে সরকারকে কার্যকরী ভুমিকা রাখতে হবে।
এই মহামারি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে মন্থরগতি এবং নিম্নদিকে ধাবিত করছে, যা অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত কর্মীদের মধ্যে অধিকহারে বেকারত্ব এবং আংশিক বেকারত্বকে বাড়িয়ে তুলছে (এসডিজি ৮)।
কোভিড-১৯ খাদ্য ব্যবস্থাকে প্রতক্ষভাবে প্রভাবিত করছে যা খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা এবং সরবরাহকে মারাত্বকভাবে ব্যাহত করছে। অন্যদিকে, এই খাদ্য ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হচ্ছে ক্রয়, উৎপাদন এবং বন্টন ক্ষমতা কমে যাওয়ার জন্য (এসডিজি ২)।
কোভিড-১৯ দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত মানুষদের খাদ্যের চাহিদা মেটানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের জরুরি বীজ, সার, ঔষধ, তথ্য সরবরাহ করা কৃষি সম্প্রসারণ এবং অ্যাডভাইসরি সার্ভিসকে (ইএএস) অবশ্যই মেটাতে হবে। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) এর মতে, এই সার্ভিসকে খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দারিদ্য বিমোচনের যুদ্ধে সামনের সারিতে রাখতে হবে।
ইএএস মাঠের সার্বিক অবস্থা নিরুপণ, কৃষি-বিষয়ক সর্বশেষ অবস্থা জানানো এবং কৃষকের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সরকারকে পরামর্শ দেওয়া উচিত। এর ফলে কৃষকদের স্বাস্থ্য এবং খাদ্য সংকট বিষয়ে দ্রুত এবং কার্যকরী সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। এই সার্ভিস অংশীদারিত্বমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থার ভাঙ্গন রোধ, যোগান এবং সরবরাহের কার্যকারিতা অটুট রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনোমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলভমেন্ট (ওইসিডি) দেখিয়েছে কোভিড-১৯ বাজেভাবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের (যেমন উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা) উপর প্রভাব বিস্তার করছে (এসডিজি ১৬)। এ বিষয়ে গবেষণা, সম্প্রসারণ এবং সরকারের আশু হস্তক্ষেপ দরকার।
কোভিড-১৯ মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী 'সামাজিক-অর্থনৈতিক বিভাজনকে' আরও বাড়িয়ে তুলছে (এসডিজি ১-৫)। অবস্থাগত প্রমাণ বলছে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এর মুলকারণ হচ্ছে আয়ের উৎস বন্ধ হওয়া এবং ন্যূনতম অর্থনৈতিক সুরক্ষা না থাকা।
জনগনের এবং সমাজের সুরক্ষার জন্য সরকারের দ্রুত এবং নিণার্য়ক পদক্ষেপ গ্রহণ খুব জরুরী। তার জন্য, উদারমনা এবং সমন্বিত পলিসি অত্যাবশ্যক। এজন্য সরকারের উচিত সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং আবাসন সেবাকে শক্তিশালী করা। এই সেবার মধ্যে অসুরক্ষিত কর্মী, ছোট ব্যবসায়ী, শিশু, মহিলা, যুবক এবং অবহেলিত এলাকা গুলোকে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে।
যদিও উপাদান এবং সংক্রমণের ধারার ভিত্তিতে, কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০০৮ গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসের মধ্যে কিছুটা মিল আছে, তথাপি এই মহামারির প্রভাব কর্মসংস্থান, আয়, স্বাস্থ্য (মানসিক স্বাস্থ্য) এবং সার্বিক সমৃদ্ধির উপর অনেক বেশী (এসডিজি ১, ১০ এবং ১২)। এইসব সমস্যার সমাধান বের করা রাজনীতিবিদের জন্য আজ বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতিসংঘের রির্পোট দেখিয়েছে করোনা সংকট আর্থিক বাজারকে টালমাটাল করেছে, যা এসডিজি ১, ৮ এবং ১১ অর্জনে বিশেষ বাধার সৃষ্টি করছে, ভবিষ্যতেও করবে। তিনটি পদক্ষেপ জরুরিভিত্তিতে নেওয়া দরকার।
(ক) বড় আকারের অর্থনৈতিক প্যাকেজ প্রবর্তন করা (অর্থনীতিবিদের মতে, প্রণোদনার আকার হওয়া উচিত অন্তত জিডিপির ৫ শতাংশ)
(খ) জাতীয় সামাজিক সুরক্ষার জাল শক্তিশালীকরণ,
(গ) নীতিগতভাবে ঋণ পরিশোধ বিলম্বিতকরন। এই পদক্ষেপগুলোকে জাতীয় মুদ্রানীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ হতে হবে।
এনার্জি খাত ইতিমধ্যেই প্রভাবিত হয়েছে (এসডিজি ৭)। করোনা সংকট প্রবলভাবে তেলের চাহিদা কমিয়েছে, এতে করে তেলের দাম এবং উৎপাদন অস্বাভাবিক হারে কমেছে, বিশেষকরে তেলের-মূল্য নির্ধারণে রাশিয়া-ওপেক যুদ্ধের কারণে।
অনেকে মনে করছেন, কোভিড-১৯ মহামারি ক্লিন এনার্জি অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ করবেই। এর ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে, নির্ভরযোগ্য এবং আধুনিক এনার্জি সার্ভিস পাওয়ার যে প্রতিশুতি তা সম্ভব নাও হতে পারে।
এই মহামারি অনিচ্ছাকৃতভাবে জলবায়ুগত উপকার বয়ে এনেছে, যেমন বাংলাদেশসহ অনেকদেশে বাতাস, পানি এবং শব্দ দূষণ অনেকাংশে কমেছে। আবার বিপরীতভাবে এই মহামারির জন্য জলবায়ু সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান আয়োজন সম্ভব হয়নি, যেমন যুক্তরাজ্য সরকার কপ ২৬ (সিওপি ২৬) এর আয়োজন ২০২১ পযর্ন্ত মুলতবি ঘোষণা করেছে।
করোনা সংকটের জন্য সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে, যা এসডিজি ৪ এর জন্য অপূরনীয় ক্ষতি। গবেষকদের মতে, এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে অসমতাকে বাড়াবে (এসডিজি ৪ এবং ১০)।
প্রারম্ভিক প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে, করোনা সংকট পুরুষ এবং মহিলাদের সমানভাবে প্রভাবিত করে না, পুরুষদের ঝুঁকি এই ভাইরাসে বেশি। কিন্তু নারীরা কোভিড-১৯ এ বেশি অরক্ষিত। কারণ নারীরা তুলনামূলকভাবে অধিকহারে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত। ওইসিডি বলছে, আনুমানিক ৭০ শতাংশ স্বাস্থ্য কর্মীরা হলেন নারী। এই অবস্থা এসডিজি ৫ (জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি বা লিঙ্গসমতা) এর গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
লিঙ্গসমতা অর্জনে অবিলম্বে রাষ্ট্রের কার্যকরী নীতি এবং বাস্তবায়ন দরকার। মৌলিকভাবে, করোনা সংকট উওরণের সকল নীতি-বিষয়ক ক্রিয়াকলাপ 'জেন্ডার লেন্স' ভিত্তিক হওয়া উচিত। এছাড়া, এসডিজি ৫ (এবং ১৬) অর্জনে জেন্ডার ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট, জেন্ডার বাজেটিং, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হল অন্যতম চাবিকাঠি।
কোভিড-১৯ নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে আমাদের দরকার টেকসই অবকাঠামো স্থাপন, সমন্বিত এবং টেকসই শিল্পায়ন এবং (গবেষণা ভিত্তিক) উদ্ভাবনকে উৎসাহ প্রদান (এসডিজি ৯)। একইসঙ্গে, করোনা সংকট বুঝিয়ে দিয়েছে, এই মহামারির সময় এবং পরে 'ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা' কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের তিনটি শিক্ষা দিয়েছে (ক) সংকট মোকাবিলায় জনগণের অন্তর্ভুক্তিকরণ কতটা কার্যকরী, (খ) জনগণের চাহিদা মেটানোয় বিভিন্ন ক্ষেত্রের অংশীদারদের অংশীদারিত্বমূলক ভুমিকা এবং (গ) রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোয় ডিজিটাল প্রযুক্তির অপরিসীম গুরুত্ব।
এই সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপগুলোকে টেকসই উন্নয়নের কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করাই হবে কোভিড-১৯ মহামারি প্রশমনের মূলভিত্তি। টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারকে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কার্যকরী বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির হাল ধরতে হবে ।
অর্থায়নের সহজলভ্যতা হলো টেকসই উন্নয়নকে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব প্রশমিত করার অন্যতম মূল বিষয়। তবে, অর্থায়নের সহজলভ্যতাই শেষ কথা নয়। এর জন্য দরকার মুদ্রা ও আর্থিক নীতির কার্যকরী এবং দক্ষ বাস্তবায়ন। একইসঙ্গে, অর্থায়নকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশের অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
- লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কৃষি সম্প্রসারণ এবং ইনফরমেশন সিষ্টেম বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১০২৭।
