আবাসন শিল্পে দেশকে এগিয়ে নিতে যে সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন
দেশের বর্তমান অর্থনীতির বৃহত্তর খাত আবাসন শিল্প। এ শিল্প যেভাবে সাফল্যের ধারায় এগিয়ে গিয়েছিলো, বর্তমানে সেখান থেকে অনেক দূরে পিছিয়ে গেছে। যার একমাত্র কারণ সরকারের অসহযোগিতা, গ্যাস বন্ধ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রিতা।
বর্তমানে এ খাতে ২৫ হাজার ফ্ল্যাট অবিক্রিত এবং বিক্রিত ফ্ল্যাটগুলো সঠিকভাবে সঠিক সময়ে হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। ২০১২ সাল থেকে এ খাতে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ফ্ল্যাটের বিক্রি কমে যাওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগ থমকে গেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসলেও এ খাতের মন্দাভাব কাটেনি। অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এখাতে অর্থায়ন করা থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে।
অর্থনীতির সমৃদ্ধশালী এ বৃহৎ খাতটি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি উদ্যোগ অপ্রতুল। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য একমাত্র আবাসন খাতের উন্নয়নই দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় যথেষ্ট। আবাসন খাতের উন্নয়নে সরকারকে কম লাভে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দিতে হবে, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা শহরের সকল তফসিলী ব্যাংকের শাখায় সন্তোষজনক একটি অ্যামাউন্টসহ আবাসন খাতের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমরা ব্যাংক ঋণ পাচ্ছি না, ৯% ইন্টারেস্ট বলা হলেও হোম লোন এখন ১৪% পড়ে। এরপরও ঋণ দেওয়াতে অনেক গড়িমসি, অথচ বিদেশে আবাসন খাতে ব্যাংক ঋনের সুদ ৪% থেকে সর্বোচ্চ ৬%। দুর্নীতিবাজরা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দেয়, আর অসাধু ব্যবসায়ীরা জাল দলিলের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণের বিপরীতে টাকা লোপাট করে নেয়। কিন্তু রিহ্যাব সদস্যরা ব্যাংকের সামনে বিশাল বিশাল অট্টালিকা বানিয়ে রাখল অথচ ব্যাংক আমাদেরকে ঋণ দিল না। বাংলাদেশে এমন কোন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবেনা যে, কোন ফ্ল্যাট ক্রেতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পর ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেনি। বাংলাদেশে সব খাতে কম বেশি ব্যাংক ঋণ না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, একমাত্র আবাসিক খাতে শতভাগ ঋণ পাওয়া যায়।
আমার এ কথা বুঝে উঠতে কষ্ট হয়, সরকার ঠিক কী কারণে বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিল। অথচ বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের ৫% গ্যাস আবাসন এবং বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট। অথচ গ্যাসের মোট উৎপাদন ১৫% সিস্টেম লস আর অবৈধভাবে ব্যবহার হচ্ছে। অথচ সরকার সিস্টেম লস না কমিয়ে, অবৈধ গ্যাস জ্বালানি বন্ধ না করে উল্টো আবাসন/বাসাবাড়িতে গ্যাস বন্ধ করে রাখল।
সরকার শত শত সিএনজি স্টেশন করে কোটি কোটি ঘনফুট গ্যাস জ্বালিয়ে ফেলছে। এই সিএনজির ফলে গুটি কয়েক প্রাইভেট গাড়ির মালিকের উপকার হলেও সাধারণ জনগণ এতে করে কোনো উপকৃত হয়নি। যেখানে গাড়ি ভাড়া ৪০ টাকার জায়গায় ২৫ টাকা হওয়ার কথা সেখানে ৪০ টাকার ভাড়া ৮০ টাকা হয়েছে। প্রতিদিন একটি সিএনজি যে গ্যাস পোড়ায় তা দিয়ে একটি পরিবার ৩ মাস রান্নাবান্না করতে পারে। একটি ট্রাক একটি বাস প্রতিদিন যে গ্যাস পোড়ায় তা দিয়ে একটি পরিবার এক বছর রান্নাবান্না করতে পারে। সরকার বাস, ট্রাক, টেক্সিতে গ্যাস দিয়ে সব গ্যাস পুড়িয়ে ফেলছে অথচ আবাসন শিল্পে গ্যাস দিতে সরকারের অনীহা।
তবে রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ভাইয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যুতের সমস্যা অনেকাংশই সমাধান পর্যায়ে। একটি কুচক্রি মহল আবাসিকে গ্যাস বন্ধ রাখার পক্ষে উঠে পড়ে লেগে আছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই, বিপু ভাই আপনি আমাদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে বোঝান এই শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগ যেন চালু করে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের পর আবাসন শিল্পের অবস্থান, তবে গার্মেন্টস শিল্পের চাইতে অনেকগুণ বেশি বিনিয়োগ রয়েছে এ খাতে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে, এ খাতের বিনিয়োগ দেশে সর্বোচ্চ। তাই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এ খাতে সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা আমরা আশাকরি।
গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগের অভাবে এ শিল্প যেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে না পৌঁছায়। অথচ উৎপাদনের ১০-১২% বিদ্যুৎ হলেই আবাসনে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান হয়। অথচ উৎপাদনের ৮-১০% বিদ্যুৎ সিস্টেম লস আর অবৈধভাবে ব্যবহার হচ্ছে। সরকার অবৈধ সংযোগ আর সিস্টেম লস বন্ধ না করে উল্টো দেশের উন্নয়নের স্বপ্নধার আবাসন খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘসূত্রিতা করে রেখেছে। আবার সংযোগে নতুন প্রতিবন্ধকতা ও সোলার সিস্টেম আমাদের মরার উপর খাড়ার ঘা।
আমরা ১৫/২০ লক্ষ টাকা খরচ করে এপার্টমেন্টে জেনারেটর বসাই বিদ্যুৎ যাওয়ার পর আলোর ব্যবস্থা করতে। অথচ সোলার সিস্টেম দিয়ে আমাদের সংযোগ পেতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সোলার সিস্টেম লাগানোর পর নষ্ট হয়ে গেলে এটি আর মেরামত হয় না, আমরা বাধ্য হয়েই বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার জন্য সোলার সিস্টেম লাগাতে হচ্ছে অথচ এটি আমাদের জন্য বোঝা। সোলার লাগাতে হবে পাহাড়ে খামার বাড়িতে যেখানে বিদ্যুৎ নেওয়া সম্ভব নয় সেখানে, অথচ সরকার সেটি আমাদের উপর অহেতুক চাপিয়ে দিয়েছে।
সারা পৃথিবীতে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার একমাত্র খাত আবাসন শিল্প। যত বেশি আবাসন প্রকল্প মার্কেটে আসে ততবেশি দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে এবং দেশের সাধারণ মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি গৃহায়ণ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান যেমন রড, সিমেন্ট, টাইলস, পেইন্টস, অ্যালুমিনিয়াম, ফার্নিচার, ইলেকট্রিক, ইট, বালি, পাথরসহ ৩০০ লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলে সরকারের রাজস্ব আয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশে আবাসন শিল্পের একমাত্র সংগঠন রিহ্যাব প্রতি বৎসর ১৫ হাজার ফ্ল্যাট রেডি অবস্থায় হস্তান্তর করছে, যার তিন ভাগের এক অংশ ক্রেতা প্রবাসে বসবাসকারী। প্রতি বৎসর প্লট ও ফ্ল্যাট মিলে ৮/১০ হাজার টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ হচ্ছে, অন্য দিকে দেশের আবাসন শিল্পের বিকাশ হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হচ্ছে।
অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাত সেদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রমাণ বহন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ জানিয়েছে, গত বৎসরের তুলনায় এ বৎসরের আবাসন খাতের অর্জন এসেছে ২৬ শতাংশ। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখে আবাসন খাত। অথচ আমাদের দেশে এখাতে সকল দিক থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা হলফ করে বলতে পারি আবাসন খাতে গ্যাস বিদ্যুৎ ব্যাংক ঋণ এবং বৈধভাবে উপার্জিত অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিলে অবশ্যই আগামী এক বৎসরের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন হবে ইনশাল্লাহ।
বাংলাদেশের রাজনীতি আর অর্থনীতি মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকলে দেশের অথনৈতিক অবস্থাও ভাল থাকে। রাজনৈতিক অবস্থা ঘোলাটে থাকলে বিশেষ করে আবাসন খাতে এর প্রভাব বেশি পড়ে। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এ ব্যবসা পরিচালনা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। সরকার এখাতে গ্যাস বিদ্যুতের সংযোগ অব্যাহত রাখবে। কম লাভে ক্রেতা সাধারণের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করবে। রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো ভ্যাট এবং ট্যাক্স এর ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা প্রদানসহ এখাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদান করা এবং এ খাতের বিনিয়োগে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রকম প্রশ্ন না তোলা। বর্তমানে ২৫ হাজার রেডি ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে এগুলোর বাজার মূল্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। আমাদের বর্তমান রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর সামসুল আলামীন কাজল ভাইয়ের প্রতি এক বুক আশা নিয়ে দেশের ১৫০০ এর অধিক আবাসন ব্যবসায়ী এক পলকে তাকিয়ে আছেন তিনি এবং তার বোর্ড অব ডিরেক্টরদের সঙ্গে নিয়ে বিজিএমই এর মত সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে আমাদের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং আমাদের দাবি আদায় করে আনবেন। আমরা আশাকরি সভাপতি আপনার পক্ষে এটি সম্ভব যার বাস্তবায়ন কিছুটা আপনি দেখিয়েছেন।
ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের সব আবাসন প্রকল্পে প্রিপেইড গ্যাস ও বিদ্যুৎ মিটার বসালে এতে করে গ্যাস ও বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ হবে এবং নতুন নতুন আবাসন প্রকল্পে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে প্রবাসীদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ায় দুই হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কমে গেছে বর্তমানে দেশে এবং বিদেশিদের কাছে শতকরা ৭৫ শতাংশের বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি কমে গেছে। বর্তমান এ পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পেতে এবং দেশের অর্থনীতির গতি পরিবর্তনের জন্য আবাসন শিল্পে পূর্বের ন্যায় সকল তফসিলি ব্যাংকে ৮-৯% লাভে হোমলোনের ব্যবস্থা করা আমাদের রিহ্যাবের সকল সদস্য এবং সকল ফ্ল্যাট ক্রেতার দাবি। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, ব্যবসা বাণিজ্যের স্বার্থে, অর্থনীতির গতি আরও বেশি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আবাসন শিল্পে সরকারের সকল প্রতিষ্ঠানের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছি।
সরকার আবাসন ব্যবসায়ীদের ঋণ না দিক তবে সহজ শর্তে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করুক। আজ থেকে ৭-৮% এর সকল তফসিলি ব্যাংক থেকে আবাসনে ঋণ দেওয়া শুরু করুক কালকেই দেশের অর্থনীতির গতি আরও বেশি করে ফিরে আসবে।
লেখক :
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্ট ডেলটা হোল্ডিংস লিমিটেড, চট্টগ্রাম
