সাম্প্রদায়িকতার আগুনে পুড়েছে বসতভিটা, নিখিল চন্দ্রের প্রশ্ন- ‘পরিবার নিয়ে যাব কোথায়?’
রংপুরে হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। আক্রান্তদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
এই আকস্মিক হামলা ও অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সর্বস্বান্ত হয় এলাকার অসংখ্য মানুষ। তাদেরই একজন ৩০ বছর বয়সী উপেন। কৃষক। ঘটনার দিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে নিজের ঘরের উঠানে বসে ছিলেন তখন একটি সাদা মাইক্রোবাস দেখে কৌতূহলে এগিয়ে গিয়ে দেখেন কাছের বাজারেই প্রচুর লোক। পুলিশ প্রতিবেশী প্রসন্ন রায়ের ছেলে পরিতোষকে খুঁজছে। পরিতোষ তার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে পবিত্র কাবা শরিফকে অবমাননা করেছে।
এই ঘটনায় ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকেও ডাকা হয়েছে। ততক্ষণে চাউর হওয়া ঘটনার ফলে ছোট বাজারে শত শত লোক জড়ো হয়ে গেছে। এবং এখানকারই একটি অংশ উত্তেজিত হয়ে পাঁচশো গজ দূরে পরিতোষের বাড়ির উপর হামলা চালায়।
আক্রমণকারীরা বাড়িঘরে ভাঙচুর করে। পরিতোষ তার আগেই সপরিবারে পালিয়ে গিয়েছে। এরপরই উপেনের বাড়িতে আক্রমণ চালায় তারা। উপেন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে মারধোর করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি কোনোকিছু রক্ষা করতে পারেননি। প্রাণ নিয়ে তিনি পালিয়ে আসেন। পরে ফিরে এসে দেখেন, তার বাড়িঘরের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, সব আগুনে পুড়ে ছাই। আগুন লাগার আগমুহূর্তে তার স্ত্রীও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এখন সর্বস্বান্ত উপেনের পরিবারের জন্য গাছতলাই রাতের শয্যা।
কথা হয়, ৪০ বছর বয়সী নিখিল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। কৃষিকাজ করেন। বাবা-মা, স্ত্রী আর ছোট এক ছেলে নিয়ে পাঁচ জনের সংসার। আগুনের লেলিহান শিখায় সবকিছু হারিয়ে পুরো পরিবার নিয়ে একেবারে নিঃস্ব অবস্থা, সর্বস্বান্ত নিখিলের এখন একটাই প্রশ্ন- 'আমি কী অপরাধ করেছি?'
'পরিবার নিয়ে এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? বাচ্চাদেরই খাওয়াব কী?' আরও অজস্র প্রশ্নে উঠে আসে তার মুখে।
একই ধরনের হাহাকার ঝরে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আরেক পরিবারের ৩৬ বছর বয়সী মিনতি রানীর কণ্ঠেও। তার জিজ্ঞাসা, একজনের অপরাধের ফল কেন তাদের সম্প্রদায়ের সবাইকে ভোগ করতে হলো। তিনি বলেন, 'আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। পরিতোষ যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে পরিতোষের শাস্তি হওয়ার কথা। আমাদের ওপর তো এরকম নির্যাতন হওয়ার কথা না।'
কে এই পরিতোষ?
ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া পরিতোষকে স্বভাবে শান্ত ও নিরীহ হিসেবে জানে এলাকার লোকজন।
রংপুরে পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের উত্তর করিমপুর কসবা মাঝিপাড়ার ১৬ বছর বয়সী কিশোর পরিতোষ রায়। কবিরাজ প্রসন্ন রায়ের ছেলে সে।
এসএসসি শেষে কলেজে ভর্তি হওয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই পরিতোষের বিরুদ্ধে রোববার অভিযোগ ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের পবিত্র কাবা শরীফকে অবমাননা করে পোস্ট দেওয়ার।
আক্রমণকারীরা পরিতোষ বা তার পরিবারের অন্য সদস্যদের না পেলেও, এই রাতে একে একে পুড়িয়ে দেয় ওই এলাকার ১৯টি বাড়িঘর।
'মাথা গোঁজার শেষ ঠিকানা গাছতলা'
২৭ বছর বয়সী সদ্য বিবাহিত নিতেন চন্দ্র রায় জানান, দুটি ঘর নিয়ে ছিল তার পরিবারের বসবাস। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে ঘরগুলোর সব আসবাবপত্র। এখন তাই তাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠিকানা গাছতলা।
৩২ বছর বয়সী মুনি চন্দ্র রায়ও হয়েছেন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার। তিনি বলেন, 'আমার ঘরে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ২০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। খাবারদাবারসহ আর যা কিছু ছিল, সেগুলোও পুড়ে গেছে আগুনে।' ঘরের চাল রক্ষা পাওয়ায় মাটিতে খড় বিছিয়ে রাতের মতো আশ্রয় নিয়েছে তার পরিবার।
ঘুমন্ত ৪২ বছর বয়সী শ্যামল প্রচুর লোকজনের হইচই শুনে বাইরে বেরিয়ে এসেই আক্রমণের মুখে পড়েন। কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। প্রাণ নিয়ে দৌড়ে ধানক্ষেতে আশ্রয় নেন তিনি। চোখের সামনে দূর থেকে নিজের বাড়িঘর পুড়তে দেখেন শ্যামল। হামলা থেকে তার স্ত্রীও কোনোরকমে প্রাণ বাঁচান।
কয়েক বাড়ি পরের ৬০ বছরের ভুট্টুর আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে আছে। মারধোরের শিকার হয়ে স্ত্রী ও পুত্রবধূকে নিয়ে প্রাণ বাঁচলেও তার জিজ্ঞাসা, তার বাড়িঘর কেন পুড়িয়ে দেওয়া হলো। তার দোষ কী। এর বিচার কী হবে।
আক্রান্ত নিতেন চন্দ্র ও মুনি চন্দ্ররা এখন প্রশাসনের কাছে চায় ন্যায়বিচার। ইতোমধ্যেই পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি মামলা করা হয়েছে। সেসব মামলার একটি অগ্নিসংযোগের, অপরটি নাশকতার। এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি আরও পাঁচ শতাধিক অজ্ঞাতানামা ব্যক্তির নামেও অভিযোগ রয়েছে পুলিশের দায়ের করা মামলায়।
ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকেও দুটি মামলা দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে।
গ্রেপ্তার আতঙ্কে পীরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় এই মুহূর্তে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেসব এলাকা থেকে বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা ও অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছিল, সেসব এলাকার পুরুষেরা সকলে একযোগে গা ঢাকা দিয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে বর্তমানে কেবল নারী ও শিশুরাই অবস্থান করছে।
আরও পড়ুন: রংপুরে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনায় কমিটি গঠন, আটক ৪৫
এদিকে, সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব ভূঁইয়া, ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য ও জেলা পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার।
পুনর্বাসনের উদ্যোগ
রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান আশ্বাস দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার।
দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ১০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং পরিবারপ্রতি ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি লবণ, ১ লিটার তেল এবং একটি করে শাড়ি ও লুঙ্গি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থলে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও পরিবেশ শান্ত রাখতে ও সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চার স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে আক্রান্তদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সোমবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি শাফিউর রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান রনিসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
আরও পড়ুন: রংপুরে ১৮ হিন্দু বাড়িতে আগুন
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রংপুর জেলায় একটি মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়, যেখানে অতিসত্ত্বর মাঝিপাড়ায় অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
উল্লেখ্য, গত ১৩ অক্টোবর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন কুমিল্লা শহরের একটি পূজা মণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ ওঠে। এরপর ওই পূজা মণ্ডপের পাশাপাশি পরের তিন দিন নোয়াখালী, ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পূজা মণ্ডপ ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে।
