ঢাকা ছাড়তে মানুষের ঢল, স্থায়ীভাবে চলে যাচ্ছেন অনেকে
কঠোর লকডাউনের খবরে গতকালও ছিল গ্রামমুখী মানুষের ঢল, তবে এদের কেউ কেউ একেবারেই ছেড়ে যাচ্ছেন এই ব্যস্ত নগরী।
মালামাল ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন অনেকে। হয়তো আর কখনও তারা ফিরবেন না এই রাজধানীতে।
এমনই একজন রিকশা চলক মোহাম্মদ বেলাল। তিনি থাকতেন কামরাঙ্গীরচরের এক ভাড়া বাসায়। একটি পিকআপ ভ্যানে করে ঘরের সকল মালামাল নিয়ে যাচ্ছেন তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর। সাথে তার স্ত্রী, মেয়ে ও দুই নাতি।
"গত এক বছর ধরে রিকশা চালিয়ে আয় খুবই কম ছিল, তিন বেলা খেতেই কষ্ট হচ্ছিল। তার উপর গায়ে আগের মত শক্তিও পাই না। রিকশা চালাতে কষ্ট হয়। আর এখন সামনে লকডাউন আসছে। এখানে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে", পিকআপে বসেই বলেন বেলাল।
"সব হারিয়ে আট বছর আগে এই শহরে এসেছিলাম একটু ভাল থাকতে। কিন্তু আজ ফিরে যেতে হচ্ছে, বলতে বলতে গলা ভারী হয়ে আসে তার। আমার চারটি মেয়ে। সবার বিয়ে দিয়ে যেতে পারলাম। এটাই শান্তি," বলেন তিনি।
বেলাল জানান, গ্রামের বাড়িতে তার ছোট একটি ঘর আছে। "সেইখানে থাকব। আর যা পারব তাই করে বাকি জীবন কাটাব," বলেন তিনি। এরই মধ্যে জ্যাম ছেড়ে দেয়, তার ট্রাকটিও চলে যায়।
বেলালের মতোই ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন আমেনা বেগম। বিয়ে হয়েছে তিন বছর। স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রায় দেড় বছর আগে স্বামীর সাথে থাকার জন্য কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় আসেন আমেনা। কিন্তু গত বছর লকডাউনের পর স্বামীর আয় কমে যায়।
তিনি বলেন, "এতদিন কষ্ট করে চললেও এখন আর পারছি না। তাই ঘর ছেড়ে দিয়ে একেবারে চলে যাচ্ছি।"
একেবারে চলে যাওয়া আরও দুই পরিবারকে পাওয়া যায় গাবতলী ও বিজয় সারণিতে। আয় কমে যাওয়া ও সামনের অনিশ্চয়তার কারণেই চলে যাচ্ছেন বলে জানান তারা।
এদিকে গাবতলীতে দেখা যায় হাজারও মানুষ হেঁটে ও রিকশায় আমিন বাজার যাচ্ছেন। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় মাইক্রো বাস, প্রাইভেট কার ও মিনি বাস ছেড়ে যাচ্ছে। তবে তারা ভাড়া নিচ্ছে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
কয়েকজন দালালের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০টি মাইক্রো ও প্রাইভেট কার বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্যে গাবতলি থেকে ছেড়ে যায়। এছাড়াও ৫০০টির মত বাইক ও ১০০ থেকে ১৫০টি সিএনজি এখান থেকে ছাড়ে।
এমনই একজন দালাল কামাল খান বলেন, রংপুর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, রাজশাহীর ও খুলনার যাত্রী সবচেয়ে বেশি। ভাড়া জনপ্রতি ১২০০-২০০০ টাকা, তবে আগে ছিল ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।
এছাড়া কিছু মিনিবাস পাটুরিয়া ঘাটে যায়। জনপ্রতি ভাড়া ৪০০ টাকা, তবে আগে ছিল ৭৫ টাকা, বলেন তিনি।
এদিকে বিগত কয়েকদিনের চেয়ে গতকাল শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের ফেরিতে দক্ষিণ বঙ্গগামী যাত্রীদের ভিড় বেশি ছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, নৌরুটের প্রতিটি ফেরিতেই অল্প সংখ্যক যানবাহন, কিন্তু যাত্রীদের ভিড়। শুধুমাত্র পণ্যবাহী ও জরুরি যানবাহন পারাপারের কথা থাকলেও ফেরিতে ব্যক্তিগত গাড়ি পারাপার হতেও দেখা যায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডাব্লিউটিসি) শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) শাফায়েত আহমেদ জানান, 'নৌরুটে বর্তমানে ১৫টি ফেরি সচল রয়েছে। সকাল থেকে যাত্রীদের কিছুটা ভিড় রয়েছে। তবে গাড়ির চাপ নেই। জোর করে প্রতিটি যাত্রীরা ফেরিতে উঠে যায়'।
মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ জাকির হোসেন জানান, 'লকডাউনের নির্দেশনা মানার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা বিভিন্নভাবে ঢাকা থেকে ঘাটে আসছেন। আবার বাংলাবাজার ঘাট থেকে আসা যাত্রীরা ঢাকা যাওয়ার চেষ্টা করছেন।'
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড মোড়েও যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মত।
গণ পরিবহন কম থাকায় সেখানেও অতিরিক্ত ভাড়ায় মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে করে যাত্রীরা গন্তব্যের পথে রওনা দেয়। পিকআপে করে রওনা দেন অনেকেই।
অন্যদিকে, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে যাত্রীর চাপ আগের তুলনায় কিছুটা কম ছিল।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশন আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম জিল্লুর রহমান বলেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ১৪টি এবং আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে তিনটি ফেরি চলাচল করছে। নৌরুটের উভয় ফেরিঘাট এলাকায় যাত্রী ও যানবাহনের বাড়তি কোন চাপ নেই। প্রতিটি ফেরিতে ৪০ থেকে ৫০ জন বা এর সামান্য বেশি যাত্রী নৌরুট পার হচ্ছেন।
মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সুমন দেব জানান, সকাল থেকে শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রীদের চাপ ছিল মহাসড়কে চেকপোষ্টের তদারকির কারণে। নিমতলা চেকপোষ্টে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স ও অতি জরুরী ছাড়া কোন যানবাহন ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
প্রতিবেদনটি তৈরি করতে আমাদের মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি সহায়তা করেছেন।
