কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন রেখে আসা ইকবাল ধরা পড়লেন মাছ পাহারার ক্যামেরায়
দারোগা বাড়ি মাজার পুকুরে মাছ চাষ করেন হাজি সেলিম নামে এক ব্যক্তি। তার বাড়ি দারোগা বাড়ি মাজার পুকুরের পূর্ব পাড়ে।
ওই বাড়ির দোতলায় তিনি তিনটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেন। এর একটি উত্তর দিকে এবং আরেকটি দক্ষিণ দিকে মুখ করা। মাঝখানের ক্যামেরাটি সোজাসুজি পশ্চিমমুখী।
এ ক্যামেরাটি অত্যাধুনিক। রাতের বেলা কেউ মাছ চুরি করছে কি না, তা দেখতে ক্যামেরাটি চালু করেন তিনি। এটি ঘূর্ণায়মান ফ্যানের মতো ডানে-বামে ঘুরতে সক্ষম। এমনকি পুকুরের পশ্চিম পাড়ের মসজিদ গেট পর্যন্ত নজরদারি করতে সক্ষম এই সিসি ক্যামেরা। ডানে-বামে ঘোরার কারণে সিসিটিভি ফুটেজকে ক্যামেরার ভিডিও বলে মনে হতে পারে।
১২ অক্টোবর দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে মাজার থেকে পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে বের হন ইকবাল। পরবর্তীকালে পুকুরের উত্তর পাড় হয়ে নানুয়ার দিঘির পাড়ের দিকে অগ্রসর হন তিনি। হাজি সেলিমের সিসিটিভি ক্যামেরা ও মাজারের নিজস্ব ক্যামেরায় দুটি দৃশ্যই ধরা পড়ে। মাজার থেকে মন্দিরের দূরত্ব ৫০০ থেকে ৬০০ মিটার।
রাত ৩টা ১২ মিনিটের আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ইকবাল হনুমানের গদা কাঁধে করে এদিক-ওদিক ঘুরছেন। ওই ভিডিও ফুটেজ নানুয়ার দিঘির পাড়ের পশ্চিম পাশের লিলি গার্ডেন নামে একটি বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে পুলিশ। লিলি গার্ডেন থেকে মণ্ডপের দূরত্ব ১০০ থেকে ১২০ মিটার।
দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে ও উত্তর-পূর্ব কোণে দুটি রাস্তা রাজগঞ্জ ও কাশারিপট্টির দিকে চলে গেছে। মাঝ বরাবর ছিল অস্থায়ী পূজামণ্ডপটি, যেখানে স্পর্শকাতর ঘটনাটি ঘটে।
ঘোরাঘুরি শেষে ওই স্থান থেকে উত্তর-পশ্চিমের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যান ইকবাল। মাঝখানের এক ঘণ্টা কী করেছিলেন তিনি, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
মামলার অগ্রগতি নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোতোয়ালি থানায় পাঁচটি মামলা করা হয়েছে। দুটি মামলা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে। একটি মামলার বাদি পুলিশ, অপরটির বাদি র্যাব। এছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইনে পুলিশ বাদি হয়ে দুটি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের আরেকটি মামলা করা হয়।
ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে এজহারনামীয় দুইজন, বিশেষ ক্ষমতা আইনে এজহারনামীয় ৬০ জন ও অজ্ঞাতনামা ৯০০ জনকে আসামি করা হয়। এ চার মামলায় গ্রেপ্তার ৪৪ জন।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে ওই মামলায় মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে, যা নিয়ে অনুষ্ঠানিকভাবে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফ করার কথা রয়েছে।
একটি সূত্রে মূল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্ভাব্য তিনজনের নাম পাওয়া গেছে। এদের একজন সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া ইকবাল হোসেন, ৯৯৯-এ কল করা ইকরাম হোসেন এবং হুমায়ুন কবির নামে অপর এক ব্যক্তি।
ইকরাম ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকিরা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে মুখ খুলছে না পুলিশ।
কুমিল্লা নগরীর ১৭নং ওয়ার্ড পাথুরিয়াপাড়া লস্করপুকুর এলাকার নূর আহম্মদ আলমের ছেলে ইকবাল। নূর আলম মাছ ব্যবসা করেন। হুমায়ুন কবিরের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায়। তিনি কুমিল্লা নগরীর একটি স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। ইকরামের বাড়ি কাশারিপট্টি এলাকায়। তিনি ওই এলাকার রিকশাচালক বিল্লাল হোসেনের ছেলে।
এদের মধ্যে হুমায়ুন কবির আহলে সুন্নাতের ওয়াল জামাতের সমর্থক। বাকি দুজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দুজনই অতিরিক্ত মাদকাসক্ত বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
দারোগা বাড়ি মসজিদের ইমাম ইয়াছিন নূরী জানান, এ মসজিদে মাঝে মধ্যেই এমন কোরআন শরিফ হাদিয়া দেওয়া হয়। এটা এখানকার হতে পারে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে কুমিল্লার পুলিশ সুপারের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা ডিআইজি ক্রাইম (হেড কোয়াটার্স) ওয়াইএম বিলালুর রহমান জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ (বৃহস্পতিবার) ব্রিফিং করে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন।
গত ১৩ অক্টোবর নানুয়ার দিঘির পাড়ের একটি অস্থায়ী মণ্ডপে হনুমানের মূর্তির কোলে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
