টাকার বিনিময়ে সন্তান দত্তক দিয়ে ‘অপহরণ নাটক’, দেবিদ্বারে উদ্ধার নবজাতক
কুমিল্লার দেবিদ্বারে প্রকাশ্য দিবালোকে হাসপাতাল থেকে নবজাতক অপহরণের চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি আসলে ছিল একটি সাজানো নাটক। নিজের ২৭ দিন বয়সী কন্যাশিশুকে টাকার বিনিময়ে দত্তক দিয়ে পরে অপহরণের নাটক সাজান মা আকলিমা আক্তার। আজ শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দত্তক নেওয়া পরিবারের কাছ থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করার পর পুলিশ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকা থেকে শিশুটি অপহৃত হয়েছে বলে তার মা আকলিমা আক্তার স্বজনদের জানিয়েছিলেন। আকলিমা দেবিদ্বার পৌর এলাকার বিনাইপাড়া গ্রামের অটোরিকশাচালক কামাল হোসেনের স্ত্রী। এই দম্পতির ঘরে ৮ ও ৬ বছর বয়সী আরও দুই সন্তান রয়েছে।
শিশুটিকে দত্তক নেওয়া আবু সাঈদ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপহরণের খবর দেখে তিনি বিব্রত হয়েছেন। তার দাবি, আকলিমা আক্তার সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় শিশুটিকে দত্তক দিয়েছিলেন। আবু সাঈদ বলেন, "বৃহস্পতিবার আকলিমা দেবিদ্বার সদরের আল মদিনা হাসপাতালে এসে চিকিৎসক ও নার্সের উপস্থিতিতে শিশুকে আমার হাতে হস্তান্তর করেন। শর্ত ছিল পরদিন স্বামীকে নিয়ে এসে চুক্তির ফরমে সই করে টাকা নেবেন। ১৭ বছর বিবাহিত জীবনেও আমি সন্তানের বাবা হতে পারিনি। শিশুটিকে পেয়ে আমাদের পরিবার আনন্দে ভরে যায়। শুক্রবার বিকেলেই প্রায় ১৫ হাজার টাকার পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনি।"
আল মদিনা হাসপাতালের নার্স রহিমা আক্তার জানান, আকলিমা তার স্বামীর নেশাগ্রস্ত আচরণ ও আর্থিক অক্ষমতার কথা বলে শিশুটিকে দত্তক দিতে চেয়েছিলেন। এর আগে তার আরও দুই সন্তান থাকায় অভাবের সংসারে ভরণপোষণে কষ্ট হচ্ছিল বলে তিনি দাবি করেন। পরে পরিচিত সূত্রে আবু সাঈদের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. ফিরোজ আহমেদ বলেন, "তিন দিন ধরে ওই নারী আমার কাছে এসে শিশুকে দত্তক দেওয়ার কথা বলছিলেন। আমি স্পষ্ট জানাই, স্বামীকে নিয়ে এসে নিয়ম অনুযায়ী কাগজপত্র সম্পন্ন করতে হবে।"
পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ময়নামতি সংলগ্ন সাবের বাজার এলাকায় আকলিমাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিলেও শিশুটির কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই রাতেই আকলিমার স্বামী কামাল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ২-৩ জনের বিরুদ্ধে দেবিদ্বার থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, "অপহরণের ঘটনাটি প্রথম দিক থেকেই সন্দেহে ছিল। আকলিমার আচরণ ও কথাবার্তায় আমাদের সন্দেহ হয়। এ ঘটনায় পুলিশ হয়রানি হলেও সমাজে সত্যটা প্রকাশিত হয়েছে। অবশেষে নবজাতক শিশুটি মায়ের কোলে ফিরে এসেছে।"
মা নিজের অভাব ও স্বামীর আচরণের কথা বলে গোপনে শিশুটিকে হস্তান্তরের পর অপহরণের নাটক সাজালেও পুলিশের তদন্তে তা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এল। বর্তমানে শিশুটি উদ্ধার হয়ে নিজ পরিবারে ফিরেছে।
