করোনাকালে থমকে আছে নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন, লোকশিল্পীরা বেকার

শৈশব থেকে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের বাউল শিল্পী সিরাজ উদ্দিন খান পাঠান। ষাটোর্ধ্ব এ বাউল শিল্পী এখন পুরোপুরি বেকার। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে গত সাড়ে চারমাসে একটি পালাও গাইতে পারেননি তিনি। উপার্জন বন্ধ হওয়ায় ধার-দেনা করে খেয়ে না খেয়ে চালাচ্ছেন সংসার।
শুধু বাউল সিরাজ উদ্দিনই নন, সংস্কৃতির জেলা হিসেবে খ্যাত নেত্রকোনায় তার মতো আরও হাজারও লোকশিল্পী চরম অসহায় অবস্থায় দিন পার করছেন। এক কথায়, গোটা জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই পড়েছে করোনার ভয়াবহ প্রভাব। বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন উপজেলার ৫০টিরও বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রম।
বাউল সিরাজ উদ্দিন বলেন, বৈশাখ মাসের ধান ঘরে তোলার পরবর্তী সময়ে আমাদের বাউলগানের একটি মৌসুম শুরু হয়। কারণ কৃষিজীবী মানুষ তখন অবসর সময় কাটায়। তাছাড়া গ্রাম-গঞ্জ ও হাটবাজারের দোকানপাটগুলোতে তখন হালখাতা উৎসব হয়। এ অঞ্চলের হালখাতা উৎসবে বাউলগান একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এ কারণে এই সময়ে আমরা প্রচুর গানের বায়না পাই।
''এ মৌসুমে যে উপার্জন হয় তা দিয়ে আমাদের কয়েক মাস চলে যায়। কিন্তু এবার করোনাভারইরাস পরিস্থিতির কারণে একটি গানেরও বায়না পাইনি। এক টাকাও উপার্জন করতে পারিনি। তাই বড় অভাব ও দুশ্চিন্তায় আছি'' বললেন সিরাজ উদ্দিন।
নেত্রকোনা শহরের সাতপাই রেলক্রসিং এলাকার যাত্রাপল্লীতে বাস করেন প্রায় দুই শতাধিক পেশাদার যাত্রাশিল্পী। তারা কেউ যাত্রাপালায় অভিনয় করেন। আবার কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজান। এটিই তাদের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় জনসমাগমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পর থেকে কোথায়ও কোনো যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়নি। সঙ্গত কারণে তারাও এখন বেকার।
যাত্রাশিল্পী দীন ইসলাম জানান, জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে পুরুষ শিল্পীদের কেউ কেউ দিনমজুরি করছেন। রিকশা বা ইজিবাইক চালাচ্ছেন। কিন্তু নারী শিল্পীরা কোনো কাজ পাচ্ছেন না। তারা সীমাহীন কষ্টে আছেন। একজন নারী যাত্রাশিল্পী সম্প্রতি অসুস্থ হলে বিভিন্নজনের সহযোগিতা নিয়ে তার চিকিৎসা করানো হয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রামমঙ্গলের পালা গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন সদর উপজেলার সহিলপুর গ্রামের বিভা রানী চক্রবর্তী। তিনিও এখন বেকার। বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কীর্তন গেয়ে প্রতিদিন সামান্য চাল সংগ্রহ করে তা দিয়ে দিন গুজরান করছেন।
কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর গ্রামের বাউলশিল্পী আবুল বাশার তালুকদার বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাউলগান করি। এর বাইরে অন্য কোনো কাজ শিখিনি। তাই চাইলেও এ মুহূর্তে একটা কিছু করতে পারছি না। ব্যবসা-বাণিজ্য করলে পুঁজি দরকার। সে সামর্থ্যও নেই।
এদিকে সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে যারা গান বা তালযন্ত্রের ব্যবহার শিখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের অবস্থাও তথৈবচ। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সঙ্গীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ। জেলা শহরের অজহর রোডে অবস্থিত হায়দার-শেলী সঙ্গীত বিদ্যানিকেতনের পরিচালক মুখলেছুর রহমান বলেন, কার্যক্রম না থাকায় আয়ের পথ একেবারে বন্ধ। প্রথম দুইমাস বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে শিক্ষকদের বেতন দিয়েছি। পরবর্তী দুইমাস যাবত বেতন দিতে পারছি না।
যারা বাসাবাড়িতে গিয়ে সঙ্গীতের টিউশনি করতেন তারাও এখন ঘরে। জেলা শহরের সাতপাই নিবাসী সঙ্গীতের প্রবীণ ওস্তাদ নিখিল সরকার বলেন, সংক্রমণের ভয়ে অভিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের গান শেখানো বন্ধ রেখেছেন।
শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের দুরাবস্থা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম বলেছেন, করোনা পরিস্থিতিতে সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ রাখা হয়েছে। তাই সংস্কৃতিকর্মীরা আগের মতো অনুষ্ঠানাদি করতে পারছেন না। তবে জেলা প্রশাসন ও শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে সংস্কৃতিকর্মীদের সাধ্যমতো অর্থ-সহায়তা দেয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা বলেছেন, সরকারি সহায়তার পরিমাণ খুবই সামান্য। তা দিয়ে এক সপ্তাহও চলা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া অনেকেই এ সহযোগিতা পাননি।
জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলা সদর এবং ১০ উপজেলায় ৫০টিরও বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এসব সংগঠন নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতি উদ্ভবের পর থেকে সংগঠনগুলোর অফিসও তালাবদ্ধ। সংক্রমণের ভয়ে শিল্পী-কর্মীরা কেউ আগের মতো সেসব প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে না।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে গত সাড়ে চারমাসে একদিনের জন্যও তালা খোলা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় প্রশাসন বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে যেসব মেলা বা সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করা হত সেগুলোও এখন বন্ধ আছে। এ কারণে গত চারমাসে জেলার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম একেবারেই ঝিমিয়ে গেছে। আবশ্যকীয় অনুষ্ঠানগুলো পর্যন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেত্রকোনা জেলা সংসদের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, আমাদের সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিমাসে কমপক্ষে চারটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। কিন্তু গত চারমাসে একটি অনুষ্ঠানও করতে পারিনি।
''শিল্পীদের বাসা থেকে গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের রেকর্ড নিয়ে তা অনলাইনে সম্প্রচার করে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উদ্যাপন করেছি। দু'জন সাংস্কৃতিক সংগঠকের মৃত্যুতে অনলাইনে স্মরণানুষ্ঠান করেছি। এভাবে কর্মীদের চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছি'', যোগ করেন তিনি।
জেলা কালচারাল অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে জেলার ৫০ জন শিল্পীর প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা করে করোনাকালীণ আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে প্রায় তিনশ জনকে।
আবদুল মজিদ তালুকদার শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি আবুল বাশার তালুকদার বলেন, জেলায় গ্রামগঞ্জে প্রায় সহস্রাধিক শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। যারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেড়েছেন তারা কিছু সহযোগিতা পেয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগই কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা পাননি।
লোকশিল্পীদের সংগঠন 'শিকড় উন্নয়ন কর্মসূচি'র সভাপতি রফিকুল ইসলাম আপেল বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় লোকশিল্পীদের গানের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিভিন্ন বার্তা প্রচার করা যেতে পারে। এতে করে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পীদের আয়ের পথ সৃষ্টি হবে।