হলুদপুর: মাঝেরচর ও ফোর্ডনগর
যদি ভৈরব বা নরসিংদী কিংবা আখাউড়া নামতে চান এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন থেকে ট্রেন ধরতে আপনার বেশি কষ্ট পোহাতে হবে না। যেকোনো এক জায়গায় নামার পরই আপনি কিছুটা পথ নৌকায়, কিছুটা অটোতে করে মাঝের চর পৌঁছে যেতে পারবেন।
আমরা (আমি, হেলেন ও হেলেনের বড় ছেলে) গতবার গিয়েছিলাম উবার করে, একদম মেঘনার ধার পর্যন্ত।
তারপর মাঝের চর। উবারে লেগেছিল ৩ হাজার টাকার মতো। হেলেনের ইচ্ছা ছিল চর দেখবে। কারণ চরের জীবন আলাদা; আর মাঝের চরে তখন ছিল বিস্তীর্ণ হলুদ ক্ষেত। নদীর ওপারে আমাদের অপেক্ষায় ছিল রাশেদ ও তার বাবা-মা।
মাঝের চরে বিদ্যুৎ গেছে মোটে দেড় বছর আগে। এই চরে কোনো কুকুরের দেখা পাবেন না। চরের মাঝখানে একটা ছোট্ট বাজার, যেখানে আছে দুটো ফার্মেসি। হোমিওপ্যাথিক, অ্যালোপ্যাথিক আর আয়ুর্বেদিক ওষুধও পাওয়া যায় এক দোকানেই। বাজারে আছে কয়েকটি চায়ের দোকান। একটা বড় কনফেকশনারিও আছে।
জানতে চাইলাম, কারেন্ট আসার আগে কি করতেন? উত্তরে আইসক্রিমের বাকশো ভরে আইসক্রিম আনার কথা জানান দোকানি।
এমন বাকশো ছোটবেলায় সব গ্রামেই দেখা যেত। আর দোকানও এতো বড় ছিল না। দোকানে দেখছি ওরিও বিস্কুট, প্রিঙ্গল চিপসও আছে! দোকানি হাসতে হাসতে বলেন, "আমরা তো বড়লোক। চর বলে ভাবছেন, আমরা গরীব? আমাদের এখানকার প্রতি ঘর থেকে এক দুজন বিদেশ থাকে। এই যে, রাশেদের শশুরবাড়ির পাড়াটায় তো তিন-চারটা বড় বড় বিল্ডিং দেখতে পাবেন। তবে আমাদের এখানে উচ্চ শিক্ষিত লোক বেশি পাবেন না। কিন্তু প্রত্যেকের মোবাইলে ডেটা পাবেন, কেউ গুগল করছে, কেউবা ফেসবুকিং। লোকজন প্রচুর খবর রাখে।"
তিনি আরও বলেন, আপনার দোষ নাই। সবারই এমন ধারণা। আসলে তো চর বলতে পিছিয়ে পড়াই মনে হয়। আমাদের এখানে বড় মাদ্রাসা আছে, তবে হাই স্কুল নেই। মায়েরা রাঁধতে খুব পছন্দ করে, খাওয়াতে পছন্দ করে। রায়হানের (রায়হান রাশেদ) মা নিশ্চয়ই আপনাদের অনেক খাওয়াচ্ছে?"
আমি দ্রুতই মাথা ঝাকিয়ে সায় দিলাম।
তবে এখানে বংশ মর্যাদা মানে কৌলিণ্যের ব্যাপার কিন্তু খুব কাজ করে। মনে হবে একেকটা বংশের একেক সংস্কৃতি। টেটা লড়াইয়ের কথা তো শুনেছেন, নরসিংদীতে বিখ্যাত।
"পত্রিকায় আগে খুব দেখা যেত দুই বংশের মারামারির ছবি। এটা দুই গ্রামের মধ্যেও হতো। যারা হারতো তারা গ্রাম ছাড়া হতো। তাদের বাড়ির টিনের চালও আস্ত থাকত না। অনেক অনেক বছর পর, মাস কয়েক আগে আমাদের গ্রাম, মানে মাঝের চরেও ভীষণ লড়াই হয়েছিল। আমরা তাই একটু বুঝেশুনে চলছি।
মুফতি রায়হান রাশেদ আমাদের লেখক বন্ধু। তিনি হিউম্যান স্টোরি লিখতে পছন্দ করেন। তিনি নরসিংদীতে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন।
দুপুরে খাওয়ার পর আর নড়তে পারছিলাম না। ওদিকে রায়হানের বাবা আমাদের জন্য একটি ছইওয়ালা নৌকা ঠিক করে রেখেছেন। মাঝি বললো, "নৌকাতেই গড়াইয়েন চলেন। বেশি দেরি হলে আর আলো থাকবে না, ছবি তুলতে পারবেন না।"
প্রকৃতির হলুদ ক্যানভাস
শরতে আকাশ দেখায় নীল, বৈশাখে কালো আর শীতে জমিন ফোটায় হলুদ। মাঝের চরে বিস্তীর্ণ সরিষার ক্ষেত মানে বিস্তীর্ণ হলুদ। সূর্য তখন পশ্চিমে চলেছে। আমরা ছইয়ের ওপর চড়ে বসলাম। চলতে চলতে নৌকা-ডোঙায় করে মাছ ধরতে দেখলাম অনেককে। নৌকা চলেছে ভৈরব-আশুগঞ্জ ব্রিজের দিকে। দশ মিনিট যাওয়ার পরই আমরা হলুদের দেখা পেয়ে গেলাম।
জানুয়ারির মধ্যভাগ ছিল সেটি। প্রায় সব সরিষা গাছই ডাটো হয়ে গেছে। হলুদও গাঢ় হয়েছে। ঝাঝালো গন্ধে মাতোয়ারা বাতাস। আমরা লাফিয়ে নামলাম নৌকা থেকে। তারপর দিকবিদিক দৌড়। গায়ে হলুদ মাখামাখি। বেশ অনেকক্ষণ পর রায়হান ধরেবেঁধে থামালো। বললো, "ভাই এবার যে ছবি না তুললেই নয়।"
চেয়ে দেখি সূর্য ঢলে পড়েছে বেশ। সোনালি গায়ে বুলিয়েছে লাল রং। তাড়াতাড়ি পোজ দিতে দাঁড়িয়ে ও বসে গেলাম। প্রথমে কিছু সেলফি তারপর স্টুডিও ফটোগ্রাফি। মাঝি আর রায়হান প্রধান আলোকচিত্রী, মাঝে মধ্যে আবার আমিও।
হিম বাতাস সন্ধ্যা বয়ে আনলে আমরা ফেরার পথ ধরলাম। নদীর এক জায়গায় দেখি সদ্যই এক বোয়াল মাছ ধরা পড়েছে। কাছে গিয়ে দেখি, ওজন তিন কেজির কম হবে না। রায়হান দরাদরি করে হাজার টাকায় রফা করে দিল। মাঝের চরে ফেরার পর রায়হানের মা আমাদের রাতে থেকে যেতে জোর করতে থাকলেন। পিঠা বানাবেন তিনি। কিন্তু নগরের মানুষের পিছুটান অনেক। তাই ফিরতেই হলো। রাত আটটার ট্রেন পেলাম ভৈরব গিয়ে। দেড় ঘণ্টায় ঢাকায় পৌছালাম। সঙ্গে নিয়ে এলাম বোয়াল মাছ আর হলুদ স্মৃতি।
ফোর্ডনগর, সাভার
যাদের হাতে একবেলাও সময় আছে তাদের কিন্তু হলুদের এই হাতছানি এড়ানো ঠিক হবে না। সদরঘাট থেকে ফার্মগেট তারপর মিরপুর বা গাবতলী সব জায়গা থেকেই সাভারের বাস ধরতে পারবেন। ভোর বেলা রওনা হলে তো পৌছাতে ঘণ্টাও লাগবে না। নামবেন থানা রোডে তারপর মানুমিয়ার বাড়ির কাছ থেকে নৌকায় করে অল্প সময়ে ওপারের বেঙ্গল জুট ফ্যাক্টরির ধারে পৌছে যেতে পারবেন। তারপর আর কিছুদূর হাঁটলেই মিলবে হলুদের দেখা।
জায়গাটার নাম ফোর্ড (ফোর্ট সম্ভবত) নগর। এখন কিন্তু বংশীর ওপর ব্রিজও হয়ে গেছে। তাই গাড়ি নিয়ে রুপনগর হয়েও ফোর্ডনগর যেতে পারবেন। ফোর্ডনগর পড়েছে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে। তবে লোকে ডাকে ফুডনগর বা ফুটনগর। বংশী নদীর চর এই ফোর্ড নগর। একসময় এখানে নগর ছিল, ছিল তোপখোলা। আগেকার দিনে দুর্গ নগরীতে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় সামরিক উপকরণ, রসদ ও যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহের জন্য কাছাকাছি তোপখোলা নির্মিত হতো। অবস্থানগত কারণে এ নগর প্রতিরক্ষা ব্যুহ হিসেবে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বংশী ও ধলেশ্বরী নদীর প্রাচীন ও বর্তমান প্রবাহ আর এ নদী দুটির দেশের অন্যান্য নদীগুলোর সঙ্গে সংযোগের দিকটা খেয়াল করলেই ব্যাপারটি বোঝা কঠিন হবে না। ওই বংশী নদীর তীরেই ধামরাই, গণকপাড়া বা পাঠানতলীতে আফগানদের শক্তিশালী দুর্গ ছিল। আর সাভারের কাছে কাটিবাড়িতে ছিল রাজা হরিশ্চন্দ্রের রাজধানী। কাটিবাড়িতেও বড়সড় দুর্গ ছিল।
যাহোক, এখনকার ফোর্ডনগর দেখে যে কারো এটি আন্দাজ করাই কঠিন হবে, এখানে গোলাবারুদের মজুদ ছিল এক সময়। এখনকার ফোর্ডনগর হলুদের রানী। আমি অনেকবারই গিয়েছি সেখানে, তবে বেশিরভাগই বর্ষায়। তাই ফোর্ডনগরে আমার হলুদ দেখা হয়নি। ফেসবুকে দেখলাম বন্ধু মিঠু (শিল্পী শামসুল আরেফিন মিঠু) ছবি দিয়েছে।
পুরো পরিবার নিয়ে ফোর্ডনগরের হলুদ মেখে এসেছে। এরপর আবার সাবেক সহকর্মী ইশতিয়াকের (বন্যপ্রাণীপ্রেমী ইশতিয়াক হাসান) ছবি দেখেও মন টানল।
ইশতিয়াক লিখেছে, "জায়গাটির নাম মনে ধরেছিল খুব, ফোর্ড নগর। সেখানে বংশী নদীর ওপরের সেতু পেরিয়ে, কিছুটা পথ পাড়ি দিতেই রূপনগর। সোজা চলে যাওয়া এক সড়কের দু'পাশে হলুদের রাজত্ব। আশ্চর্য সুন্দর সেই হলুদরাজ্যের অংশ হয়েছিলাম অনেকটা সময়। চারপাশে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল মৌমাছিরা। শালিকদের ওড়াউড়ি চলছিলই, আর মাঝে মাঝেই ডানা মেলছিল বকের বড় এক ঝাঁক।"
এরপর কি আর না যেয়ে পারা যায়? কেবল সুযোগের অপেক্ষা। মনে হয় আপনারাও না যেয়ে পারবেন না। মাত্রই দেড়ঘণ্টার পথ। ভাবছি খুব সকালে বেরিয়ে ফোর্ডনগর গিয়ে নাস্তা সারবো। তাহলে দেখা হচ্ছে ফোর্ডনগরে।
