যারা পরিবার থেকে দূরে, উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ ছাড়া তাদের আর কী করার আছে!

"সব শেষ অই গ্যাছে আমার। বাড়িঘর সব পানির নিচে। হাঁস-মুরগি যা আছিল সেগুলোও নাই। বউরে ফোন দিসি। কেউ ফোন ধরে না, কারো খবর পাই না। আল্লাহ জানে তারা কই আছে, কেমন আছে। আমার ছোড ছোড ৩টা বাচ্চা আছে। সকাল থেইক্কা অস্থির লাগতেছে। কী করবো তাও বুঝতেছি না," হতবিহ্বল হয়ে কথাগুলো বলছিলেন মো. হানিফ।
জীবিকার তাগিদে রিকশা চালান। থাকেন ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে। ফেনীর পরশুরামে তার স্থায়ী ঠিকানা। সেখানে স্ত্রী আর তিন সন্তান নিয়েই তার পরিবার। বন্যার পানি কেড়ে নিয়েছে হানিফের ঘর-বাড়ি। পাচ্ছেন না স্ত্রী-সন্তানের কোনো খবর। প্রতিবার ফোন করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন পাচ্ছেন। সকাল থেকে যোগাযোগ করতে পারেননি কারো সাথেই। তাই অজানা এক ভয় চেপে ধরেছে তাকে। মিনিটে মিনিটে ফোন দিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছু যেন আপাতত হানিফের ভাগ্যে লেখা নেই।
যাত্রী এলেও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। মনের অস্থিরতা কাটানোর জন্য যাকেই পাচ্ছেন একবার করে জিজ্ঞেস করছেন ফেনীর বন্যার কী অবস্থা! চিন্তিত হানিফের অসহায় চোখজোড়াই বলে দেয় স্ত্রী-সন্তানের সাথে কথা বলার জন্য কতটা উদগ্রীব। ফোনে সংযোগ পাচ্ছেন না বলে ভয়টা তার আরও বেড়েছে। রাত হলেই রওনা করবেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। তার আগেই যেন খারাপ কিছু না হয়, তাই তার আর্জি, "দোয়া কইরেন মামা, বউ বাচ্চা যাতে বেঁচে থাকে।"

পরিবার ছেড়ে দূরে থাকাই যেখানে কষ্টসাধ্য ব্যাপার, সেখানে আপনজনদের হারানোর শঙ্কায় সময় গুনছেন ঘর ছেড়ে দূরে থাকা মানুষরা। জীবিকার তাগিদে নিজ বাড়ি ত্যাগ করে প্রতিদিন অন্য শহরে আনাগোনা হয় শত শত মানুষের। কিন্তু দিনশেষে তাদের মন পড়ে থাকে শান্তির সেই নীড়ে। এই বন্যার সময়ে সে মানুষগুলো পার করছেন জীবনের চরম দুঃসময়। আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছেন প্রতিটি মিনিট। বৃদ্ধ মা-বাবার কথা মনে পড়তেই কান্নায় কণ্ঠ জড়িয়ে আসে কারো কারো। আবার কেউ একবার তার শিশুসন্তানের চেহারা দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
সোহেল ইসলামের কথাই ধরা যাক। গ্রামের বাড়ি ফেনীর সোনাইমুড়ি। ঢাকায় এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। বর্তমানে ইস্কাটনে চায়ের টংয়ে কাজ করেন। সেখান থেকে যা আয় হয় তার অর্ধেকটা পাঠিয়ে দেন বাড়িতে। এভাবে করে তাদের ৩ ভাইয়ের আয়েই চলে সংসার। ঘরে তার বৃদ্ধা মা, ভাই, বোন। বাবা নেই অনেক বছর হলো। এখন আপন বলতে মায়ের কথাই বারবার স্মরণ করলেন তিনি।
"সকাল থেকে কারো কোনো খোঁঁজ পাচ্ছি না। ঘরে আমার বৃদ্ধ মা। পানি বাড়লে বাকিরা সাঁঁতরে যেতে পারলেও মা পারবেন না। তার উপর উনি অসুস্থ! গতকাল অব্দি মেইন রোডে পানি ছিল। এখন বাড়ি পর্যন্ত পানি। সব দোকানপাট বন্ধ। খাওয়ার জন্যও কিছু পাবে না তারা তার উপর আম্মার ওষুধ লাগে নিয়মিত। একদিন ওষুধ না খেলে অসুস্থ হয়ে যান। আমার আম্মা কেমন আছেন, আল্লাহ জানে," অসহায় সোহেল কথাগুলো বলে যান একটানা।

কিছু টাকা হাতে পেলেই ছুটে যাবেন। তবে এই যে সময়টুকু তিনি অতিবাহিত করছেন, সেটার কষ্ট অনুভব করাতে গিয়ে চোখ ছলছল করে তার।
কাজের প্রয়োজনে কাতার গিয়েছেন ২ বছর হতে চললো। এই দুইবছরে এমন কোনো দিন যায়নি যখন ফোনে আপনজনদের সাথে কথা হয়নি ইমরানের। কিন্তু গত দুইদিন যাবত সংযোগ পাচ্ছেন না। জানেন না পরিবারের কে কোথায় আছেন, কেমন আছেন।
এ নিয়ে দুইশো বারের অধিক ফোন করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হতে হয় তাকে। ফেনীভিত্তিক বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখছেন। এমনকি গ্রুপে গ্রুপে মেসেজ করে অনুরোধ করছেন তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে যেন নিরাপদে কোথাও নিয়ে আসা হয়। আত্মীয়দের সাথে কথা বলতে না পেরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাঝে দিন কাটছে ইমরানের।
কাতর কণ্ঠে বলেন, "দেশে থাকলে আজই ছুটে যেতাম গ্রামে। বিশ্বাস করেন, আগে কখনো এত অসহায় লাগে নাই।"
ঘরকুনো তাসলিমা বাবার ইচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার সূত্রে দীর্ঘদিন বাড়িতেই ছিলেন। সপ্তাহখানেক আগে হলে ফেরেন। এরই মধ্যে বন্যায় বাড়িঘর তলিয়ে যাবার খবর পান। তার মা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকলেও বাবার খবর পাচ্ছেন না কোনোভাবে। একাধিকবার কল করেও সাড়া মেলেনি।
"আব্বার কোনো খবর নাই লাস্ট ৬০ ঘণ্টা ধরে। বাড়ির সবাই অস্থির হয়ে আছে তার জন্য। আমাদের বাড়ি জেলা শহরে। সেখানেই যদি এই অবস্থা হয়, জানিনা গ্রামের দিকে কী হচ্ছে। আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কিছু করার নাই আমাদের," বলছিলেন তাসলিমা।
বন্যার ভয়াবহতা চিন্তিত করে তুলেছে সুইড বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুবুল মনিরকেও। বাড়ি লক্ষ্মীপুর। নিজের পরিবারের কেউ নেই সেখানে। সবাইকে নিয়ে স্থায়ী হয়েছেন ঢাকায়। তবু কাছের আত্মীয়স্বজনদের খোঁজ নিচ্ছেন বারবার। নিজের শঙ্কা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "শুধু আমার পরিবার ঢাকায়, কিন্তু আমার সব স্বজন তো ওখানে। যদিও ফেনীর মত পানি লক্ষীপুরে এখনো হয়নি। তবুও তাদের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। আমার যদি এই অবস্থা হয়, না জানি অন্যদের কী হচ্ছে!"

এই দুর্যোগের দিনে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের (বুদ্ধি বা শারীরিক প্রতিবন্ধী) কথাও ভাবছেন আলাদা করে। সাথে তাদের পরিবারের যে দুঃসময় যাচ্ছে তাও উল্লেখ করেন। "সাধারণ শক্ত সমর্থ মানুষদেরই কত কষ্ট হয় পানির স্রোত অতিক্রম করে যেতে, কিন্তু যারা অক্ষম তাদের কী হবে ভাবেন একবার। তাদের পরিবারের উপর দিয়ে কী যাচ্ছে, সেটা তারা ছাড়া কেউই আঁচ করতে পারবে না।"
লক্ষ্মীপুরের মইফুল ইসলামের ঘরের ভিতর হাঁটুপানি। তার সাড়ে তিন মাসের ভাগ্নি আছে, ভাইস্তার বয়স ছয় বছর। মা-সহ বাড়িতে থাকেন ছয়জন। ভাইদের দুজনেই ঢাকায় কাজ করেন। মইফুল একটি হোটেলে খাবার পরিবেশনকারী।
"খাটের ওপর ফ্রিজ তুলে রেখে মা অন্যদের নিয়ে নানীবাড়ি চলে গেছেন। নানীবাড়ির উঠানে পানি উঠলেও ঘরের ভিতর ঢোকেনি। সেখানকার তিনটি ঘরে এখন বিশ জনের বেশি মানুষ বাস করছে। তার মধ্যে আশি বছর বয়সী নানা শয্যাশায়ী। মামারা সবাই কাজের প্রয়োজনের বাড়ির বাইরে। বাড়িতে বয়স্ক পুরুষ বলতে কেউ নেই এই মুহূর্তে," জানালেন মইফুল।
মইফুলেরও বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ ছুটি মিলছে না আর গিয়ে থাকবেনই বা কোথায়? মইফুলের তাই ফোনে যোগাযোগ করাটাই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায়।
মনির হোসেন; নোয়াখালীর ৮নং সোনাপুর তার বাড়ি। ঢাকা লেডিস ক্লাবে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন মনির। তার একার আয়েই চলে পুরো পরিবার। মেয়ের কাছে জানতে পারেন বাড়ির উঠোন পর্যন্ত বন্যার পানি উঠেছে। তবে পানি বাড়ছে বলে ঘরেও পানি উঠে যেতে পারে বলে জানান।

মনির বলেন, "১৯৮৮ সালে যে বন্যা হইছিল, তখন আমার রাস্তাতেই পানি উঠে নাই। এই প্রথম এত পানি উঠছে। আমি নিজেই কোনোদিন এত পানি দেখি নাই। আমার বউ বাচ্চা, বোন-ভাই সব দেশে। আমি এখানে আসছি চাকরি করতে। অথচ আমার মনটা পড়ে আছে ওখানে। আসার সময় চাল-ডাল কিনে দিতে পারি নাই। এখন তারা কী খাবে কে জানে।"
বাড়ি যাবেন সে উপায়ও নেই। কিছুদিন আগেই ছুটি নিয়ে প্রিয়জনদের দেখে আসেন। তাই পুনরায় ছুটি পাবেন কিনা সে চিন্তাও ঘিরে ধরেছে তাকে।
শুধু মনির নয়, নিজ বাড়ি ছেড়ে যারা শহরে বা দেশের বাইরে বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন সবারই মানসিক স্থিতি একই বলা চলে। সবাই দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত পার করছেন আর সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করছেন। রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে তাদের আর্তনাদও। এই যেমন প্রবাসী ইমরান বলেই বসলেন, "যত রাত বাড়ে তত ভয় লাগে, বুক ধড়ফড় করে। হাজার চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছি না কয়েকদিন ধরে।"