এবারের বিশ্বকাপে যা কিছু নতুন
জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর পাঁচ দিন হতে চলল। প্রায় এক যুগ আগে ২০১০ সালে আয়োজক দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল দেশটির নাম। এর মধ্য দিয়ে এক নতুন ইতিহাস রচনা করতে শুরু করে কাতার, কারণ এটিই বিশ্বকাপ আয়োজক হিসেবে নির্বাচিত মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে প্রথম দেশ।
তাইতো ফিফার এই ঘোষণার পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের বিশেষ উপলক্ষ্যে মগ্ন হয়ে পড়েছিল মরুর এ দেশটি। ২২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ফুটবল ভেন্যু নির্মাণসহ সমগ্র দেশটিকে রাঙিয়ে তুলতে শুরু হয় তোড়জোড়।
এসব ছাড়াও আরও অনেক কারণে এবারের বিশ্বকাপ অনন্য। এ টুর্নামেন্টে সংযোজন করা হয়েছে নতুন অনেক কিছু যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারেই প্রথম। খবর আল জাজিরার।
অফসাইড প্রযুক্তি
চলতি বছরের জুলাই মাসে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ঘোষণা করে এবারের বিশ্বকাপে চালু হবে একটি সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেম। উদ্দেশ্য অফসাইড নির্ধারণে দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বিশ্বকাপে ব্যবহৃত বলগুলোর ভেতরে লাগানো থাকে একটি সেন্সর, যার দৌলতে খেলোয়াড়দের স্পর্শের সঙ্গে বিচার করে বলের অবস্থান যাচাই করতে পারেন রেফারি। তাছাড়া খেলোয়াড়দের চলাফেরা অনুসরণের জন্য প্রতিটি স্টেডিয়ামে স্থাপন করা হয়েছে ১২টি লিম-ট্র্যাকিং ক্যামেরা।
বাড়ি থেকে খেলা উপভোগ করা ভক্ত ও দর্শকরা যেন রেফারির সিদ্ধান্ত বুঝতে পারেন, যেজন্যে স্টেডিয়ামের স্ক্রিনে থ্রিডি ছবিতে দেখানো হয় অফসাইডের দৃশ্যগুলো।
বদলি খেলোয়াড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি
এবারের বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে পাঁচজন খেলোয়াড় বদলের সুযোগ থাকছে, যেখানে গত রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮-তে সর্বোচ্চ কেবল তিন জন খেলোয়াড় বদলের সুযোগ ছিল। তবে পাঁচ ফুটবলারের বদল করা গেলেও সেটি করতে হবে তিন বারের মধ্যে। অর্থাৎ বিরতির সময় বাদ দিয়ে মোট তিন বারের মধ্যে পাঁচ জন খেলোয়াড় পরিবর্তন করা যাবে। এই নিয়ম খেলোয়াড়দের সতেজ রাখার পাশাপাশি কোচকে কৌশল পরিবর্তনে সাহায্য করবে।
তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপ আসরে প্রতি দলে একাদশসহ মোট ২৬ জন খেলোয়াড় থাকতে পারছেন, যেখানে এর আগের থাকতে পারতেন ২৩ জন।
২০২০ সালে ফুটবলে আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন বোর্ড করোনা মহামারির নানা দিক বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
শীতকালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ
এবারেই প্রথম নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস অর্থাৎ শীতে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগের বিশ্বকাপগুলো উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল অর্থাৎ জুন ও জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হতো।
এটি করার পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে কাতারের উচ্চ তাপমাত্রা। জুল-জুলাই মাসে দেশটির তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন হলে বাইরে থেকে আগত দর্শক কিংবা দেশবাসীর জন্যেও টুর্নামেন্টটির উপভোগ্যতা ফিকে হয়ে যেত।
অন্যদিকে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে কাতারের তাপমাত্রা সাধারণত ১৪ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে।
নারী রেফারি
প্রথমবারের মতো এবারের পুরুষ বিশ্বকাপে নিযুক্ত হয়েছেন নারী রেফারি। ৩৬ জন রেফারির মধ্যে এবারে দায়িত্বে আছেন তিন জন নারী রেফারি।
তারা হলেন, ফ্রান্সের স্টেফেনি ফ্র্যাপার্ট, জাপানের ইয়োশিমি ইয়ামাশিতা এবং রুয়ান্ডার সালিমা মুকানসাঙ্গা। তাদের তিন জনেরই এর আগে পুরুষ টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। উয়েফা সুপার কাপ এবং আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন)-এর মতো টুর্নামেন্টের রেফারি ছিলেন তারা।
এটিকে ফিফার দারুণ একটি উদ্যোগ বলে মনে করেন স্টেফেনি।
এছাড়াও এই মূল তিনের পাশাপাশি থাকবেন মোট ৬৯ জন সহকারী রেফারির মধ্যে আছেন আরও তিন সহকারী নারী রেফারি। তারা হলেন, ব্রাজিলের নিউজা ব্যাক, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথরিন নেসবিট এবং মেক্সিকোর ক্যারেন ডিয়াজ মেদিনা।
আয়তনে সবচেয়ে ছোট আয়োজক
মাত্র ২৯ লাখ জনসংখ্যা এবং ১১,৫০০ বর্গ কিলোমিটারের একটু বেশি আয়তনের কাতার এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট আয়োজক দেশ।
বিশেষভাবে বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত মোট আটটি স্টেডিয়ামের সবকটির অবস্থান রাজধানী দোহা থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটারের মাঝেই।
গ্রুপপর্বে একদিনে চারটি ম্যাচ পর্যন্ত খেলা হতে পারে। ছোট পরিসরের এ দেশটিতে একই দিনে একাধিক ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকায় অনেকে আবার সমালোচনাও করছেন। তাদের মতে, বিশ্বকাপ উপভোগের উদ্দেশ্যে আগত ১২ লাখ দর্শকের জন্য রাস্তায় অতিরিক্ত ভিড় দেখা দিতে পারে। এতে করে দেশেটির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোও কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির সদস্য আব্দুলাজিজ আলী গত মাসে বলেন, 'একদিনে চারটি ম্যাচ থাকা দোহার মতো শহরের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ বটে। শহরের রাস্তায় ভিড় হবে, এমনটা অনুমান করা যাচ্ছে।'
বিশ্বকাপের পুরো সময় জুড়ে কাতারের বিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকবে এবং অফিসগুলোর কর্মঘণ্টাও কমানো হয়েছে।
