হুলিও কোর্তাসার: এক আর্হেন্তাইন, নিজেকে যিনি সকলের আশ্রয় করে তুলেছিলেন
[এই বক্তৃতাটি হুলিও কোর্তাসারের মৃত্যুর কয়েক দিন পর, ১৯৮৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি একটি নিবন্ধ হিসাবে প্রথম প্রকাশিত—কোর্তাসারের মৃত্যুর এক দশক পর তার প্রতি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের শ্রদ্ধার্ঘ্য এটি। ১৯৯৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মেক্সিকোর ফাইন আর্টস প্যালেসে মার্কেস আবার এটা বক্তৃতা করেন। তারপর ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৪-এ, মেক্সিকোর গুয়াদালাখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হুলিও কোর্তাসার চেয়ারের ট্রিবিউট হিসেবেও লেখাটি পঠিত হয়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। আর্হেন্তাইন লেখকের মৃত্যুর বিশ বছর পর গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং কার্লোস ফুয়েন্তেসের নেতৃত্বে মেক্সিকোর গুয়াদালাখারা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'হুলিও কোর্তাসার চেয়ার' প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৯ সালে প্রখ্যাত ভিন্টেজ প্রকাশনা সংস্থা থেকে 'আমি এখানে বক্তৃতা করতে আসিনি' নামে মার্কেসের গদ্য-সংকলনের আন্তর্জাতিক সংস্করণ প্রকাশ হয় এডিথ গ্রসম্যানের অনুবাদে, এই বক্তৃতাটি সেই বইয়েও স্থান পায়।]
ঐতিহাসিক বছর ১৯৬৮ সালে কার্লোস ফুয়েন্তেস এবং হুলিও কোর্তাসারের সঙ্গে শেষবারের মতো আমি প্রাগে গিয়েছিলাম। আমরা ট্রেনে প্যারিস থেকে প্রাগ গিয়েছিলাম; কারণ, আমাদের তিনজনেরই উড়ানভীতি ছিল; আমরা ট্রেনে জার্মানির বিভিন্ন শহরের রাত, তাদের সমুদ্রবিস্তৃত সবজিখেত এবং কলকারখানাগুলো, যেখানে সবকিছুই তৈরি হয়, তাদের যুদ্ধের নৃশংসতা এবং ভালোবাসার ধ্বংসলীলা—অতিক্রম করতে করতে সবকিছু নিয়েই কথা বলছিলাম।
ট্রেনে, ঘুমোনোর সময় হয়ে গিয়েছিল তখন, মনে পড়ছে, ফুয়েন্তেস কোর্তাসারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—কীভাবে এবং ঠিক কখন, কার হাতে জ্যাজ অর্কেস্ট্রায় পিয়ানোর চল শুরু হয়েছিল? ফুয়েন্তেসের প্রশ্নটি খুবই সাধারণ ছিল; শুধু একটি তারিখ এবং একটি নাম খুঁজে বের করার জন্য অবশ্যই নয়, কিন্তু কোর্তাসারের উত্তরটি ছিল জমকালো বক্তৃতার মতো, গ্লাসের পর গ্লাস বিয়ার আর আলুসহ বরফের সসেজের সঙ্গে সে বক্তৃতা চলছিল ভোর পর্যন্ত। হুলিও কোর্তাসার—যিনি সতর্কতার সঙ্গে নিজের কথাগুলোর মাপ নিতে জানতেন, ওজন করতে পারতেন, কথার মাত্রা বুঝতে পারতেন—দীর্ঘ বক্তৃতায় একটি ঐতিহাসিক এবং নান্দনিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করেছিলেন, যাকে আমাদের মনে হয়েছিল প্রখ্যাত মার্কিন জ্যাজ পিয়ানিস্ট থেলোনিওয়াস মঙ্কের প্রতি মহাকবি হোমারের আত্মসমর্থন! সে রাতে কোর্তাসার শুধু যে একটি গভীর অর্গান-স্বরেই কথা বলেছেন, তা-ই নয়; বরং তিনি তার দীর্ঘ দুটি হাতের ততধিক দীর্ঘ হাড়গুলোকেও কথা বলিয়েছেন, যা ছিল অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে অনেক বেশি অভিব্যক্তিপূর্ণ। না ফুয়েন্তেস না আমি—কেউই আমরা সেই অবিস্মরণীয় রাতের বিস্ময় ভুলতে পারব না।
বারো বছর পর মানাগুয়ার (নিকারাগুয়ার) একটি পার্কে আমি কোর্তাসারকে বিপুল ভিড়ের সামনে বক্তৃতা করতে দেখলাম; তার গমগমে সুন্দর কণ্ঠস্বর এবং তার সবচেয়ে কঠিন গল্পগুলির একটি ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র তার হাতে নেই: এক মুষ্টিযোদ্ধার গল্প যার ভাগ্যের ওপর কালোমেঘের ছায়া পড়েছিল। গল্পের নায়ক ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন বুয়েনস এইরেসের অপরাধজগতের স্ল্যাং-ভাষা আর্হেন্তিনো লুনফারদোয় যার বোধগম্যতা কিংবা উপলব্ধির ক্ষমতা অন্যদের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হবে, যদি না আমরা এ জগতের নৃশংসতার মাধ্যমে আভাস না পেতাম; তবু কোর্তাসার নিজেই নিকারাগুয়ার কবি থেকে কর্মহীন পাথরখনির শ্রমিক, বিপ্লবের কমান্ড্যান্ট এবং তাদের বিরোধীদের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল জমায়েতের সামনে পড়ার জন্য এই গল্পটিকেই বেছে নিলেন। যদিও গল্পের তাৎপর্য অনুধাবন কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না, এমনকি আর্হেন্তাইন স্ল্যাং লুনফারদোর সবচে বিজ্ঞ লোকের পক্ষেও অসম্ভব ছিল। কল্পনা করুন, আপনি কেবল এক ভরাট গলায় গল্পের শব্দগুলোকেই কেবল অনুভব করেছেন; লড়াইয়ের রিংয়ে মুষ্ঠিযোদ্ধার শরীরের প্রতিটি আঘাতে আপনি নিজেই আহত হচ্ছেন এবং তার স্তব্ধ বিভ্রমে, হেরে যাওয়ার দুঃখে, নিঃসঙ্গতায়, একাকিত্বে আপনি কাঁদতে চাইছেন; কারণ, কোর্তাসার তার শ্রোতাদের সঙ্গে এতটাই যোগাযোগ-ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন যে গল্পের শব্দগুলোর মানে কী বা এসবে আসলেই কী বোঝায়, তাকে কেউই আর পাত্তা দেয়নি; এবং পার্কের ঘাসে নিঃসঙ্গে বসে পড়া জনতার সামনে কোনো সাধকের দ্বারা শূন্যে ভাসমান উচ্ছ্বসিত এক তরঙ্গ বলে মনে হচ্ছিল কোর্তাসারের তীব্র গলায় গল্পের অভিঘাত, যা এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার কোথাও দেখা যায়নি।
কোর্তাসার সম্পর্কে আমার এ দুটি অনন্য স্মৃতি, আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছিল; কথাটি এভাবেও বলা যায় যে কোর্তাসারকে সবচেয়ে নির্দিষ্টভাবে দেখিয়েছিল, চিনিয়েছিল। দুটি স্মৃতিই তার ব্যক্তিত্বের দুই চরম প্রকাশ। একান্তে বললে—প্রাগের সেই ট্রেনে, তিনি তার বাগ্মিতা, উত্তেজনাপূর্ণ পাণ্ডিত্য, তার অসামান্য সব স্মৃতি, তার ভয়ানক রসিকতা দিয়ে আমাদের এমনভাবে প্রলোভিত করেছিলেন যে তা তাকে পরবর্তী সময়ের জন্য একজন মহৎ বুদ্ধিজীবী করে তুলেছিল। আর খোলাখুলি বললে, লোকের কাছে দর্শনীয় হতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও, তিনি তার অনিবার্য উপস্থিতি দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে ফেলতে পারতেন, যা সত্যিকার অর্থেই এক অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা; একই সঙ্গে স্পর্শকাতর, দয়ার্দ্র আর বিস্ময়কর। সকল দিক থেকেই তিনি ছিলেন সবচেয়ে অসাধারণ এক মানুষ, যাকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
বহু বছর পর—যখন আমরা পরস্পরের বন্ধু—ভেবেছিলাম তাকে প্রথম দিন যেমন দেখেছি, এবারও তাকে সেই একই রকম দেখতে পাব; মনে হয়েছিল, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর একটি 'এল অত্রো সিয়েলো'র নায়কের সঙ্গে নিজেকেও তিনি পুনর্নির্মাণ করেছেন যে নায়ক এক লাতিন আমেরিকান, যিনি প্যারিসে নিছক কৌতূহল থেকে গিলোটিনে মারা গিয়েছিলেন, যেন তিনি গিলোটিনে মৃত্যুর পুরো ব্যাপারটি আয়নার সামনে করেছিলেন; কোর্তাসার গল্পে তাকে এভাবে বর্ণনা করেন: 'তার মধ্যে একটি দূরবর্তী এবং কৌতূহলী স্থির অভিব্যক্তি ছিল, তার মুখটি হয়ে ওঠেছিল এমন একজনের মুখ, যে মুখ ঘুমের মুহূর্তে একদম অবশ হয়ে পড়েছে এবং যার পা-দুটি পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করছে, যা তাকে জাগরণে ফিরিয়ে দেবে।' গল্পের নায়ক একটি দীর্ঘ কালো ওভারলে নিজেকে ঢেকে চারপাশে ঘুরে বেড়ায় ঠিক কোর্তাসারের ওভারকোটের মতো; লেখক তাকে প্রথম যেদিন দেখলেন সেই ওভারলে ঢাকা, হাঁটছেন, দেখবার পর গল্পের নায়ককে তিনি তার অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করেননি এই ভয়ে যে নায়ক যদি উল্টো তার কাছেই তার ঠিকুজি জানতে চান!
আশ্চর্যের বিষয় হলো—সেই বিকেলে ওল্ড নেভি পানশালায় কোর্তাসারের কাছে ঘেঁষার সাহস আমি করতে পারিনি। একই ভয়ের কারণে। কথককে এই গল্পের বীজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সাহস হয়নি। একদিন কোর্তাসারকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লিখতে দেখেছি, লিখতে লিখতে কিছুক্ষণ ভাবারও বিরতি না নিয়ে; আধগ্লাস পানি ছাড়া পেটে আর কিছুই নয়, যতক্ষণ না অন্ধকার হতে শুরু করেছে, তিনি লেখার কলমটি পকেটে রেখে বাইরে চলে গেলেন, সঙ্গে নিলেন তার নোটবুক—বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা, অস্থিচর্মসার এক স্কুলছাত্র। হয়তো বছরখানিক পর আমাদের দেখা হয়েছে, আমরা একে অপরকে দেখছি; চোখে বিস্ময়—তার একমাত্র যে জিনিসটি বদলে গিয়েছিল, তা হলো তার মুখের ঘনবদ্ধ গাঢ় দাড়ি; কারণ, মৃত্যুর দুই সপ্তাহ আগপর্যন্ত কিংবদন্তি ছিল যে কোর্তাসার অমর। এ কিংবদন্তি সত্য বলে মনে হয়েছিল; কারণ, তিনি কখনোই বেড়ে ওঠা বন্ধ করেননি, সব সময়ই দীর্ঘ হয়েছেন এবং সব সময়ই তিনি সেই বয়সী ছিলেন, যে বয়সে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাকে কখনোই জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনি যে বিষয়টি সত্য কি না, ঠিক যেমন ১৯৫৬ সালের বিষাদিত শরৎকালে আমি তাকে দেখেছিলাম ওল্ড নেভির এক কোণে, কিছু বলার মতো সাহস সেদিনও পাইনি এবং আমি জানি যে তিনি যেখানেই থাকুক না কেন, অবশ্যই আমার ভীরুতার জন্য এখন অভিশাপ দিচ্ছেন। মূর্তি আপনাকে শ্রদ্ধা, প্রশংসা, মমত্ব এবং অবশ্যই মহৎ ঈর্ষায় পূর্ণ করে।
হুলিও কোর্তাসার এই সমস্ত অনুভূতিকে ঐশীপ্রেরণার মতো উসকে দিয়েছিলেন, যেমনটা খুব কম লেখকই করেন, কিন্তু তিনি আরও একটি বিশেষ কারণেও অনুপ্রাণিত করেন: একনিষ্ঠতা। তিনি, সম্ভবত নিজের অজান্তেই এমন এক আর্হেন্তাইন, যিনি নিজেকে সকলের কাছে প্রিয়তর করেছিলেন। আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন। যা-ই হোক, আমি ভাবতে সাহস পাই যে যদি মৃতরা মারা যায়, কোর্তাসার অবশ্যই আবার বিব্রতকর অবস্থায় মারা যাবেন; কারণ, তার মৃত্যুর কারণে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ এবং আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। মরণোত্তর সম্মাননা এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আড়ম্বরকে বাস্তবে কিংবা বইপত্রে তার চেয়ে বেশি ভয় পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কেউ পায়নি। তা ছাড়া আমি সব সময় ভেবেছিলাম মৃত্যু কোর্তাসারকে মানায় না। তার কাছে মৃত্যু শোভন নয়। 'আশি বিশ্বে দিন ভ্রমণ'-এর (লা বুয়েলতা আল দিয়া এন ওচেন্তা মন্দস) কোনো একটি অধ্যায়ে, একদল সমমনা বন্ধু কিছুতেই তাদের হাসি ধরে রাখতে পারে না এটি প্রমাণে যে তাদেরই এক বন্ধু মৃত্যুর অযৌক্তিকতাকে সমর্থন করেছে। খুব ভালোভাবে জানতাম এবং ভালোবাসতাম বলেই মৃত্যুর পর কোর্তাসারের এলিজি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আমি অস্বীকার করি।
হুলিও কোর্তাসারের লেখকজীবন নিয়ে আমি ভাবতাম, এই ভাবনা নিঃসন্দেহে অপার আনন্দের বিষয় ছিল, এটি তার প্রাপ্যও ছিল; তার অস্তিত্বের অপার আনন্দের সঙ্গে আমি মিশে থাকতেই চেয়েছিলাম, তিনি পৃথিবীর ধুলোমাটিতে মিশে যাওয়ার পরও চেয়েছি; আমার কাছে বিপুল স্মৃতিসমবায়ে তিনি ফিরে ফিরে আসেন তার দুর্দান্ত লেখকজীবনকে সঙ্গে নিয়ে।
- ভাষান্তর: এমদাদ রহমান
