শরিয়া আইনের তালেবান শাসনে আফগানদের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে?
আফগানিস্তানে তালেবান দখলের পর দেশটিতে আবারও শরিয়া আইনের কঠোর ব্যাখ্যা চালু হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনেক মুসলিম জাতিই তাদের আইনী ব্যবস্থায়, বিশেষ করে পারিবারিক আইনে শরিয়া ভিত্তিক নিয়ম-কানুনকে অন্তর্ভুক্ত করে থাকে।
কিন্তু শরিয়া আইনে প্রচলিত শাস্তির বিধান, যা হুদুদ নামে পরিচিত, খুব কম লোককেই সে বিধান পালন করতে দেখা যায়। এমনকি মুসলিম পন্ডিতেরাও এ বিষয়ে সার্বজীনভাবে একমত নন।
ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম প্রেস ব্রিফিংয়ে তালেবানের একজন মুখপাত্র বলেন, গণমাধ্যম এবং নারীর অধিকারের মতো বিষয়গুলোকে "ইসলামী আইনের কাঠামো"-এর মধ্য দিয়ে সম্মান করা হবে। তবে, সেই কাঠামোর বাস্তব অর্থ কী হতে পারে, সে সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানায়নি দলটি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ধারণা করছে, আফগান নারীদের জীবনে হয়তো আগের সেই অন্ধকার যুগই নেমে আসতে শুরু করেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথমবারের তালেবান শাসনে নারীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কঠোর সব বিধিনিষেধ। "মাহরাম" (ইসলাম অনুমোদিত একজন বৈধ পুরুষ সঙ্গী। যেমন- স্বামী, বাবা অথবা আপন ভাই) ছাড়া তাদের ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল নিষিদ্ধ। বাইরে যেতে হলেও নিজেকে আগে সম্পূর্ণভাবে বোরকায় আবৃত করে নিতে হতো। এছাড়া, ১০ বছরের বেশি বয়সী মেয়ে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণেও ছিল নিষেধাজ্ঞা।
তালেবানরা মূলত শরিয়া আইনের কঠোর ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। হত্যা এবং ব্যভিচারের মতো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে, তারা প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধানও অনুসরণ করে।
শরিয়া আইন কী?
শরিয়া আইন হলো হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর বাণী বা কাজের আলোকে কোরআন ও হাদিস থেকে প্রাপ্ত একটি ধর্মীয় আইনব্যবস্থা।
কিন্তু এই আইনী ব্যবস্থার ব্যাখ্যা এবং এটি কীভাবে প্রয়োগ করা উচিত, তা নিয়ে রক্ষণশীল ও উদারপন্থী মুসলিমদের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক।
তবে এর কিছু কিছু দিক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ পরিসরেই গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন- ব্যাংকিং ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার আলোকে মুসলিম গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য, পশ্চিমা কোম্পানিগুলো ইসলামী পণ্য বা হালাল পণ্যে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, আরবি শব্দ "হুদুদ" অর্থ হলো "সীমানা"। ইসলামে "হুদুদ"-এর মাধ্যমে ব্যভিচার, ধর্ষণ, সমকামীতা, চুরি এবং হত্যার মতো অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে, চরম শাস্তির বিধানগুলো খুব কমই বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়। কারণ, অনেক অপরাধই স্বীকারোক্তিমূলকভাবে প্রামাণিত হতে হয় অথবা ক্ষেত্র বিশেষে, বেশ কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষদের দ্বারা সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
যে দেশগুলো চরম শরিয়া আইন অনুসরণ করে তাদের মধ্যে রয়েছে:
সৌদি আরব
সৌদি আরবের সকল আইনের ভিত্তি হলো শরিয়া আইন। দেশটিতে এখনও পর্যন্ত কিছু কিছু ক্ষেত্রে চরম হুদুদ শাস্তির প্রচলন রয়েছে।
সমকামী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে চরম শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে; তবে, সাধারণত এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত এবং কারাদণ্ডই দেওয়া হয়ে থাকে।
এছাড়া, গুরুতর অপরাধের জন্য তলোয়ার দ্বারা শিরশ্ছেদের বিধান সাধারণত, শুক্রবার দুপুরে জুম্মার নামাজের আগে কার্যকর করা হয়। গুরুত্বর অপরাধের ক্ষেত্রে, দণ্ডিত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরেও কখনও কখনও ক্রুশবিদ্ধ করা হয়।
ব্যক্তিগতভাবে কেউ কাউকে ক্ষতি করলে, এই আইনী ব্যবস্থায় "কিসাস" নামে পরিচিত একটি শাস্তির বিধান রয়েছে।
তবে, সুন্নি রাজ্যে ভুক্তভোগীর পরিবার চাইলে টাকার বিনিময়ে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারে।
ইরান
শরিয়া আইনের উপর ভিত্তি করে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ইরানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হার অনেক বেশি। তবে, শিয়া প্রধান এই দেশে অন্যান্য দেশের শরিয়া আইনের সঙ্গে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
বিচারকদের পরিস্থিতির ভিত্তিতে প্রমাণাদি বিবেচনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে; এছাড়া, শাস্ত্রীয় শরিয়া আইনের বিপরীতে ইরানে কারাবাস দেওয়া হয় অনেক বেশি।
যাই হোক, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০১৭ সালে দেশটির বিভিন্ন ধরনের শরিয়া ভিত্তিক শাস্তি যেমন- বেত্রাঘাত, শিরশ্ছেদ এবং জোরপূর্বক অন্ধ করা সহ নিষ্ঠুর ও অমানবিক সব শাস্তির কঠোর সমালোচনা করেছিল।
ব্রুনেই
২০১৯ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্রুনেই শরিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষোভের শিকার হয়েছিল।
তবে পরবর্তীতে, সমকামিতা এবং ব্যভিচারের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সহ আরও কিছু কঠোর শাস্তির বিধান বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশটির সুলতান।
ইন্দোনেশিয়া
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, ইন্দোনেশিয়ার একমাত্র আচেহ প্রদেশেই রক্ষণশীল ইসলামী আইনের প্রচলন রয়েছে।
ব্যভিচার, জুয়া খেলা, মদ্যপান এবং সমকামিতার শাস্তি হিসেবে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে এই প্রদেশে। তবে, কেন্দ্রীয় সরকার শিরশ্ছেদের অনুমোদন দেয় না এসব ক্ষেত্রে।
দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ দমনে ২০০১ সালে প্রদেশটিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই আচেহ অঞ্চল ধর্মীয় আইন গ্রহণ করে।
পাকিস্তান
১৯৭৯ সালে সামরিক স্বৈরশাসক মুহাম্মদ জিয়া-উল হক, ব্যাপকভাবে সমালোচিত 'হুদুদ' অধ্যাদেশ প্রবর্তন করেন পাকিস্তানে।
আইন বাস্তবায়নকারী শরিয়া আদালত, ব্রিটিশ আইন ভিত্তিক দণ্ডবিধির সঙ্গে একত্রে পরিচালিত হয়। তবে, সেই আইনগুলো খুব কমই কার্যকর হতে দেখা যায়। ব্যভিচার, আদালতে মিথ্যা অভিযোগ, সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ এবং মাদক ও অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এ আইনে।
ধর্ষণ এবং ব্যভিচারের মতো অপরাধগুলো ধর্মীয়ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে ২০০৬ সালে, এমপিরা নারী সুরক্ষা আইন পাস করে।
এছাড়া পাকিস্তানে এখন শরিয়া আদালতের দেওয়া রায় নিয়ে মূলধারার আদালতে আপিল করারও সুযোগ রয়েছে।
নাইজেরিয়া
নাইজেরিয়ার ৩৬টি রাজ্যের মধ্যে উত্তরের ১২টি রাজ্যেই ফৌজদারি মামলায় শরিয়া আইনের প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া, আদালত শিরশ্ছেদের আদেশ দিতে পারে; যদিও কঠোর আইনের খুব একটা বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না।
কাতার
যেসব মুসলিম মদ পান করে বা অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়ায়, তাদের শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে; তবে, এখানেও এই বিধান খুব কমই কার্যকর হতে দেখা যায়।
ব্যভিচারের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ বেত্রাঘাত। আবার, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়; বিশেষ করে যদি মুসলিম নারী এবং অমুসলিম পুরুষ সেই অপরাধে জড়িত থাকেন।
কিন্তু বাস্তবে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চিত্র তখনই দেখা যায়, যদি ভুক্তভোগীর পরিবার অপরাধীকে ক্ষমা না করে।
ইসলামিক স্টেট
২০১৯ সালে তথাকথিত "খিলাফত" ভেঙে পড়ার আগে, ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী সিরিয়া এবং ইরাকে তাদের দখল করে নেওয়া অঞ্চলে শরিয়া আইনের কঠোর ব্যাখ্যা বাস্তবায়ন করেছিল।
তারা নিজস্ব আদালত পরিচালনার মাধ্যমে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ, পাথর ছোঁড়া এবং অঙ্গ কেটে ফেলা সহ সমকামী বলে সন্দেহ করা পুরুষদের উঁচু ভবনের উপর নিচে ফেলে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তিগুলোর প্রয়োগ করেছিল।
- সূত্র- ফ্রান্স ২৪ ও বিবিসি
