পোল্যান্ডে বাড়ছে করোনার সংক্রমণ, আক্রান্ত হচ্ছেন বহু বাংলাদেশি
পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড। আয়তনের (১,২০,৭৩৩ বর্গমাইল) দিক থেকে ইউরোপের নবম বৃহত্তম রাষ্ট্র। সর্বশেষ গত বছরের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটিতে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। ওয়ারশ বা ভারসাভা দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম নগরী। জাতীয় মুদ্রার নাম জোলিটি।
পশ্চিমে জার্মানি, দক্ষিণে চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া, পূর্বে ইউক্রেন ও বেলারুশ এবং উত্তরে বাল্টিক সাগর, লিথুয়ানিয়া ও রাশিয়া। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে জাগিয়েলনীয় রাজবংশের তত্ত্বাবধায়নে পোল্যান্ড ইউরোপের অন্যতম এক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে ভৌগলিক অবস্থান ও সমৃদ্ধশালী ইতিহাসের কারণে দেশটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শাসকদের আগ্রাসনের শিকার হয়।
এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে হিটলারের নাৎসি বাহিনী এ দেশে আক্রমণের মধ্য দিয়ে। আবার নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পোল্যান্ড সর্বপ্রথম রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয় থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় এবং কার্যতভাবে পোল্যান্ডের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন।
মেরি মাদাম কুরি, খ্রিস্টান ধর্মগুরু জন পল, নিকোলাস কোপার্নিকাস, অ্যাডাম মিকিউইকজ, ফ্রেদেরিক শোপা থেকে শুরু করে বিশ্ববরেণ্য অনেক ব্যক্তিত্বের জন্ম এ দেশে। ১৯৯৯ সালে পোল্যান্ড ন্যাটো ও ২০০৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করে। ওয়ারশ, ক্র্যাকো, জিদান্স্ক, পোজনান, রাক্লোসহ এ দেশের বিভিন্ন শহরের ওল্ড টাউনগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর সমাগম ঘটে হাজারও পর্যটকের।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পোল্যান্ডে জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক কম। এমনকি দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অনেক কম খরচে পড়াশোনা করা যায়। এ কারণে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তানসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল অনেক দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে পোল্যান্ড উচ্চশিক্ষার জন্য এক পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
এছাড়া, বিনিয়োগবান্ধব অভিবাসন নীতির কারণে ব্যবসায়িক সূত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে অভিবাসী হিসেবে পোল্যান্ডে পাড়ি জমাচ্ছেন। এক সময় ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দেশে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা অনেক সহজে পাওয়া যেত। বাংলাদেশ থেকেও কাজের ভিসায় অনেকে পোল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছেন।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্য কোনো দেশের ভিসা কিংবা রেসিডেন্ট পারমিট নিয়েও পোল্যান্ডে এসে অনেকে ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অবশ্য বর্তমানে দেশটির সরকারের গৃহীত কিছু পদক্ষেপের কারণে এ ধরনের সুযোগ অনেকটা সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।
করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবা থেকে নিষ্কৃতি পায়নি এ দেশও। গত ৪ মার্চ পোল্যান্ডের জিয়েলোনা গোরাতে জার্মানি ফেরত ৬৬ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তির শরীরে প্রথম কোভিড-১৯ উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। তবে ফার্স্ট ওয়েভে, অর্থাৎ মার্চ থেকে শুরু করে জুন- এ চার মাসে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়াসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে আমরা করোনার প্রভাবে হাজারও মানুষের মৃত্যুর মিছিল দেখেছি, সেই তুলনায় পোল্যান্ডে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী কিংবা করোনার প্রভাবে মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলক অনেক কম।
তবে সেকেন্ড ওয়েভে এসে দেশটির পরিস্থিতি একেবারে উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করে। বর্তমানে সংক্রমণের হার বিবেচনায় পোল্যান্ডকে ইউরোপের অন্যতম হটস্পট বললেও ভুল হবে না। ওয়ার্ল্ড ও মিটার্স ডট ইনফো প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পোল্যান্ডে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৭৫ জন। এছাড়াও প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৭ হাজার ২৯ জন এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৪২৯ জন।
গড়ে প্রতিদিন দেশটিতে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যুবরণ করছেন পাঁচ শতাধিক। অথচ ফার্স্ট ওয়েভে আক্রান্তসংখ্যা ছিল ৩৪ হাজারের কিছু বেশি।
বলা বাহুল্য, শীতের আগমনের সঙ্গে পোল্যান্ডে সেকেন্ড ওয়েভে আশঙ্কাজনকভাবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালীন সময়ে অবকাশযাপন কেন্দ্রগুলোতে একসঙ্গে অধিক মানুষের সমাগম ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে দেশটির জনসাধারণের অসচেতনতা মূলত সেকেন্ড ওয়েভে সংক্রমণ বিস্তারের প্রধান কারণ।
সঠিকভাবে উল্লেখ করা সম্ভব না হলেও পোল্যান্ডে সব মিলিয়ে তিন থেকে চার হাজার বাংলাদেশির বসবাস, যাদের বেশিরভাগই এ দেশে এসেছেন শিক্ষার্থী হিসেবে; যদিও শেষ পর্যন্ত অনেকে পড়াশোনা শেষ না করে ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে তাদের ভিসার প্রকৃতি পরিবর্তন করেছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত অন্য কোনো দেশের ভিসা, বিশেষত স্টুডেন্ট ভিসা কিংবা টেম্পোরারি রেসিডেন্ট পারমিট নিয়েও পোল্যান্ডে এসে ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশি থেকে গিয়েছেন।
ব্যবসায়িক সূত্রেও অনেকে বাংলাদেশ থেকে পোল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এক সময় পোল্যান্ডে অনেক সহজে রেস্টুরেন্ট কিংবা কাবাব শপ চালু করা যেত। পোল্যান্ডে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এদের মধ্যে কেউ কেউ রেস্টুরেন্ট কিংবা কাবাব শপের মালিক, কেউ আবার এ সকল রেস্টুরেন্ট কিংবা কাবাব শপে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন।
ওয়ারশ, রক্লো ও পোজনান- পোল্যান্ডের এ তিন শহরে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন। রাজধানী ওয়ারশতে বাংলাদেশের স্থায়ী দূতাবাসও রয়েছে।
পোল্যান্ডে অবস্থিত আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক পরামর্শদাতা এডুএক্সপ্লোরের সিইও প্রকৌশলী আহমেদ রাজ বিন আইয়ুবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দেশটিতে সেকেন্ড ওয়েভে অনেক বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি কয়েক দিন আগে রাক্লো শহরে চল্লিশোর্ধ্ব এক বাংলাদেশির মৃত্যুও হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজ নিজেও অক্টোবর মাসের শেষের দিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার সাথে থাকা আরও দুই বাংলাদেশি একই সময়ে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও এক বাংলাদেশি জানান, সেকেন্ড ওয়েভে এসেও পোল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মাঝে করোনাভাইরাস নিয়ে খুব একটা সচেতনতা নেই। অনেকের শরীরে করোনার উপসর্গ থাকার পরেও তারা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব সহকারে দেখছেন না, এমনকি নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়েও টেস্ট করাচ্ছেন না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেকেন্ড ওয়েভে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশটির সরকার সকল বার, রেস্টুরেন্ট ও কফিশপ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো রেস্টুরেন্ট চাইলে পার্সেল খাবার বিক্রি করতে পারবে। এ সুযোগে অনেক বাংলাদেশির শরীরে করোনা উপসর্গ থাকার পরও তারা যথার্থ চিকিৎসা গ্রহণ না করে রেস্টুরেন্ট কিংবা কাবাবের শপগুলোতে ছুটে যাচ্ছেন কাজের জন্য।
ওই প্রবাসী আরও জানান, একদিকে যেমন ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো পোল্যান্ডের বাংলাদেশ কমিউনিটি খুব একটা শক্তিশালী না হওয়ায় এ রকম পরিস্থিতিতে কেউ চাইলেও অন্যের সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছেন না; অন্যদিকে, দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইউরোপের এ সকল দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মতো খুব একটা সুদৃঢ় অবস্থানে না থাকায় একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারছেন না।
তাই এ অবস্থায় করোনার এ দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশটির সকল বাংলাদেশিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার পাশপাশি সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য আহবান জানিয়েছেন এবং একইসঙ্গে পোল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাসকে এ পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশে থেকে কার্যকরি সহায়তা প্রদানের জন্য অনুরোধ করেছেন তিনি।
