ট্রাম্পের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব মোড়লের ভূমিকা হারিয়েছে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত সাত দশক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ৯০'এর দশকে সোভিয়েত শাসন অবসানের পর এ আধিপত্য একচ্ছত্র হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সবখানে নিজের সরব উপস্থিতি বজায় রাখে দেশটি।
ইচ্ছোমতো বিশ্ব পরিচালনার এ মোড়লগিরিতে আন্তর্জাতিক আইনকে অসংখ্যবার অবজ্ঞা করা হয়। ঠিক-বেঠিক নির্ধারণে বিশ্ব বিবেক হয়ে ওঠার দাবী করে আমেরিকা। আর স্ব-আরোপিত নীতি পুলিশের কাজও রাষ্ট্রটি করতে থাকে।
এতকিছু করার পরও সাত দশক একচ্ছত্র শাসন; অনেক লম্বা সময়। দীর্ঘ এসময় অনিয়ম করেও যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, সেটাই বরং আশ্চর্যের। তবে সেই বিস্ময়ের অবসান হয়েছে। কৃতিত্বটি! ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
শুরু থেকেই ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সহযোগীতার প্রথায় আঘাত হানে। মিত্রদের সঙ্গে ব্যবসায়ীক স্বার্থ নিয়ে ট্রাম্প এমন দর কষাকষি সূত্রপাত করেন, যা তার আগে অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধান করেননি।
ঐতিহ্যগত মিত্র; কানাডা ও জাপান কেউই বাদ পড়েনি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ভারতের সঙ্গেও বাণিজ্য নিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তিনি একের পর এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সমালোচনা ও পরবর্তীতে সেগুলো বাতিল করেছেন। পূর্বসূরীদের তৈরি অনেক সংস্থার ভূমিকা অগ্রাহ্য করেছেন। উজ্জ্বল উদাহরণ; বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। অথচ, মুক্ত বাণিজ্যভিত্তিক বাজার ব্যবস্থার প্রবক্তাই ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরি সম্পর্ক- এমন কিছু দেশের একনায়কদের সঙ্গে সখ্যতা গড়েন ট্রাম্প। আস্কারা পেয়ে এসব স্বৈরশাসকদের অধিকাংশেই নিজ স্বার্থ রক্ষায় আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। প্রেরণা পায় নিজ দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার দমনে আরও কঠোর হয়ে উঠতে।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেও, আন্তর্জাতিক আইন এবং মার্কিন মিত্রদের মূল্যবোধ কিন্তু ভেঙ্গে পড়েনি। একথা ঠিক একনায়কেরা আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে, কিন্তু, আন্তর্জাতিক আইনকে তারা একচেটিয়াভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব না থাকা সত্ত্বেও, চীনের বাহুডোরে বাধা পড়েনি দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্ররা। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ট্রাম্পের কারণে এমনটি হওয়ার তীব্র আশঙ্কা করেছিলেন।
পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। সেই অনুসারে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতেও দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। আর চীনকে বন্ধু বা শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেই, তার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃমূল্যায়ন শুরু করেছে অনেক দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই বিশ্বের এই যে এগিয়ে যাওয়া, তা কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়। অনেকদিন থেকেই এমন সময়ের অনুমান করা হচ্ছিল।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল কূশীলবরা এখনই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব শেষ হয়ে গেছে, কথাটি মানতে নারাজ। আমেরিকার স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ আরও অনির্দিষ্টকাল থাকবে, এমন অভিমত তাদের। তবে এ বিশ্বাসের বিরোধিতা করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একচ্ছত্র বিশ্ব ব্যবস্থার এই মডেল অবশ্যই একদিন অবসান হবে এবং অন্যান্য শক্তির উত্থান হবে; যারা এই ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে রক্ষাকর্তার ভূমিকা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তারপর স্নায়ুযুদ্ধের বিজয় আমেরিকার আধিপত্যকে বাধামুক্ত করে তোলে। বিশেষজ্ঞরা একমেরু কেন্দ্রিক ব্যবস্থা বলেন এসময়কে, যা স্থায়ী হয় আরও ৩০ বছর।
মার্কিনীরা যতোই অস্বীকার করুন, গত দুই দশক ধরেই অন্যদেশ যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিতে ইচ্ছুক, এমন অনেক আলামত দেখা যায়। শুধু ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা নয়, মিত্র দেশগুলোও এমন আকঙ্খা দেখিয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়; জার্মানির কথা। ইউরোপের অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্র বলেই পরিচিত দেশটি। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যখন ওবামা আমলের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা সীমিত করতে ব্যস্ত, ঠিক তখন এবং মহামারির আগেই জি-২০ জোটের বৈঠকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবাকে সভার মূল এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মেরকেল।
জার্মান রাষ্ট্রনায়ক এ পদক্ষেপ নেওয়ার কালে, স্বাস্থ্য নিয়ে বৈশ্বিক সহযোগীতাও হ্রাস করে ট্রাম্প প্রশাসন। এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (হু) সংস্কারের জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখে। কিন্তু, মার্কিন সংস্কারের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে মেরকেল এবং ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তাদের বিকল্প প্রস্তাব দেন।
মহামারির পর চলতি বছর হু'কে বাড়তি ২০ কোটি ইউরো তহবিল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জার্মানি। ফলে চলতি বছর দেওয়া দেশটির মোট অনুদান দাঁড়াচ্ছে ৫০ কোটি ইউরো। ইতোপূর্বে সংস্থার বৃহত্তম দাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্র তার প্রদত্ত তহবিল কমিয়ে আনায় যে ঘাটতি তৈরি হয়, সেটা পূরণ করতেই এ উদ্যোগ।
শুধু জার্মানি নয়, পিছিয়ে থাকেনি যুক্তরাজ্যও। আগামী চার বছরে দেশটি হু'কে দেওয়া তহবিল ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। গত মাসে দেওয়া ওই ঘোষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার প্রতিশ্রুত তহবিল না দেয়, তাহলে এ পদক্ষেপ নেবে ব্রিটিশ সরকার।
মহামারি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে চীনও বাড়তি অর্থ বরাদ্দের কথা জানিয়েছে। অতিরিক্ত সাহায্যে যোগ দিয়েছে ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের মতো কিছু ইউরোপীয় দেশ।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ট্রাম্প বিরোধী বলেই পরিচিত মেরকেল। গত মে'তে তিনি জানান, মহামারি মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৈশ্বিক দায়ভার গ্রহণ করুক, এটাই তার ইচ্ছা। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার রক্ষাতেও জোটটির নেতৃত্ব দেওয়া উচিৎ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সহযোগীতা রক্ষা করা দিনে দিনে কঠিন হয়ে পড়ছে, বলে এসময় তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
মে' মাসেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছয় মাসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয় জার্মানি। এ উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে মেরকেল জানান, তার দেশের সভাপতিত্বের সুযোগ নিয়ে তিনি 'বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা' রক্ষায় ইইউ ভূমিকা বৃদ্ধির চেষ্টা করবেন।
'ইইউ নানা দেশের মধ্যে সহযোগীতার এক প্রকল্প। তাই জন্মগতভাবেই আইনের মাধ্যমে বহুপাক্ষিক সমঝোতার পক্ষে আছে জোটটি। সঙ্কটকালে সেই চরিত্র আরও স্পষ্ট ববে,' মেরকেল বলেছেন।
ট্রাম্প শাসনামলের প্রথমদিকে নিজেকে মুক্ত বিশ্বের নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হয়েছিলেন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। তার সে চেষ্টা অবশ্য সাফল্য লাভ করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেলেই নিজেকে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।
সিরিয়ায় রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের কঠোর সমালোচনা এবং সমকামীদের উপর দমন-পীড়ন নিয়ে সোচ্চার মাখোঁ। নিন্দা জানিয়েছেন তুরস্কে সৌদি কমস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যা প্রসঙ্গেও।
ইইউ নেতারা যতই চেষ্টা করুন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষমতা অতুলনীয়। মাখোঁ যেসব বিষয়ে সমালোচনা করেছেন, তার কোনোটাতেই অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। মার্কিন নেতৃত্ব না থাকলে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ যে কতোটা দুর্বল হয়ে পড়ে, এগুলো তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ।
আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের ফলাফল যদি পক্ষে না যায়, তাহলো হয়তো ট্রাম্পকেও একদিন মার্কিন আধিপত্য হ্রাসে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।
- লেখক পরিচিতি: বার্তা সংস্থা সিএনএন- এর লন্ডন কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের সিনিয়র ডিজিটাল প্রোডিউসার।
