চীনের লক্ষ্য প্রতিবেশী নয়, যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা দেওয়া
বৈশ্বিক মহামারির মাঝেও সমরশক্তিতে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে চীনের সামরিক বাহিনী। যার ধারাবাহিকতায় দেশটি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিয়েও মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে।
গালোয়ান উপত্যকায় চীন-ভারতের সেনাবাহিনী যখন রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রণদামামা বেজে ওঠে কিনা- তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অনেকেই। ওই একই সপ্তাহে আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপানের সাথেও সমুদ্রসীমা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয় চীনা নৌবাহিনী। এসময় জাপানের উপকূলের কাছে একটি চীনা ডুবোজাহাজ শনাক্তের পর তার গতিবিধির ওপর নজর রাখতে টহলদার বিমান এবং যুদ্ধজাহাজ পাঠায় জাপান।
চ্যালেঞ্জে শুধু জাপান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মিত্র তাইওয়ানের আকাশসীমাতেও প্রায় প্রতিদিন কমপক্ষে একটি চীনা বোমারু বিমান অনুপ্রবেশ করছে।
বিশ্ব যখন করোনার মহামারিতে নাজেহাল, ঠিক তখনই নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চীনা সামরিক বাহিনীর সকল শাখা দেশটির প্রতিবেশীদের সঙ্গে সীমানায় অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে। খবর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের।
গেল বসন্ত থেকে শুরু হওয়া এই শক্তিপ্রদর্শন চলতি গ্রীষ্মেও অব্যাহত থাকায়, তা এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ভারত, জাপান এবং তাইওয়ানকে উদ্বিগ্ন করছে বটে, কিন্তু চীনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ওয়াশিংটন। আগামীদিনের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ এবং হংকংসহ অন্যান্য ইস্যুতে চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানো বন্ধ করতেই এমন 'কঠিন বার্তা' দিচ্ছে বেইজিং।
সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সকল শাখার মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির চিহ্ন দেখছেন পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা। তবে বাড়তি এই সক্ষমতা দেশটির সঙ্গে প্রতিবেশীদের সংঘাতের সূচনা করতে পারে। সেই সম্ভাবনা অনেকগুনেই বেড়েছে।
কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের চীনবিরোধী আচরণ বেইজিংকে ক্ষুদ্ধ করেছে। বাণিজ্যযুদ্ধের পর এবার মহামারি নিয়েও চীনকে দায়ি করে একের পর এক আগ্রাসী মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা। ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার দায় চাপিয়েছেন চীনের ঘাড়ে। আবার গত বছর হংকংয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনেও সক্রিয় সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো।
এসব আচরণ চীন তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। বেইজিংকে বিশ্ব শক্তি মানতে নারাজ পশ্চিমা মনোভাবও মোকাবিলা করতে চায় চীন।
তাই সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতাগুলোকে বেইজিং আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করে। তবে এর ফলে যে সামরিক সংঘাত তথা যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে, তাও উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
গত ১৫ জুন রাতে ঠিক এমন করেই হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চলে সংঘাতে জড়ায় ভারত ও চীনের সেনাবাহিনী।
দুই দেশের সীমানায় ১৯৬৭ সালের পর এটাই ছিল প্রথম রক্তপাতের ঘটনা। চীনা বিশ্লেষক, মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র এবং ভারতীয় গণমাধ্যমের সূত্রে এটা নিশ্চিত যে, এই সংঘাতে চীনের পক্ষেও অজ্ঞাত সংখ্যক প্রাণহানি হয়েছে।
১৯৭৯ সালের চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘাতে চীনা সেনার মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম।
পরিস্থিতি যে বিস্ফোরক রূপ নিতে পারে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন শীর্ষ চীনা বিশেষজ্ঞ উ শিচুন। চীনের বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগর অধ্যয়ন কেন্দ্রের এ সভাপতি চলতি সপ্তাহেই বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিয়ে জানান, উত্তেজনার মুহূর্তে দুর্ঘটনাবশত প্রথম গুলিটি কেউ চালিয়ে বসতে পারে।
এসময় তিনি চীনের সমুদ্রসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশকালে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন। যার মধ্য দিয়ে বারুদের স্তূপে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত স্ফুলিঙ্গ পূর্ণ সংঘাতে রূপ নিতে পারে, এমন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি।
চীনের জন্য নিজ সীমানাসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা খুবই জরুরি। এর মধ্য দিয়ে দেশটি তার বৈশ্বিক গুরুত্বের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ঐতিহাসিকভাবেই চীন নিজ ভূখণ্ডের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় চীনা সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ প্রস্তুতি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।
অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ভিত্তিক চায়না পলিসি সেন্টারের পরিচালক অ্যাডাম নি বলেন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তুলনায় চীনের সক্ষমতা এখন অনেক দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এই শক্তির ওপর ভর করেই সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং তার আগ্রাসী এবং কতৃত্ববাদী লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রয়াস পাচ্ছে।
১৯৯০ এর দশকে প্রথম সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয় চীন। সেই উদ্যোগটি গতিশীল হয় দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের তত্ত্বাবধানে। শি দুর্নীতিবাজ এবং তার প্রতি আনুগত্যের অভাব রয়েছে এমন সেনা কর্মকর্তাদের দমন করেন। তিনিই প্রথম স্থল যুদ্ধকেন্দ্রিক সশস্ত্র বাহিনীর সকল শাখাকে একইসঙ্গে আকাশ, স্থল এবং নৌপথে যুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেন। একইসঙ্গে, তৈরি করা হয় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অস্ত্র বা সাইবারওয়েপনসের ভাণ্ডার।
চীনের সামরিক বাহিনীর বরাদ্দও আস্তে আস্তে বেড়েছে শি জিনপিংয়ের আমলে। করোনা মহামারির পর সেনা বাজেট যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে উঠেছে।
গত মাসে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এক ঘোষণায় জানান, চলতি বছর চীনা সামরিক বাহিনীর বরাদ্দ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করা হবে। একইসময় নানা খাতে চীন সরকারের বরাদ্দ কমলেও, সামরিক বাজেটে তার প্রভাব পড়েনি। যদিও এটা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেটের এক-চতুর্থাংশ মাত্র।
মহামারি নিয়ে মার্কিন হুমকি-ধামকির কারণেই চীন সামরিক শক্তিবৃদ্ধির কোনো বিকল্প দেখছে না।
সম্প্রতি দেশটির সমাজতন্ত্রী দলের জাতীয় কংগ্রেসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মহামারি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনী যে অর্থপূর্ণ অবদান রেখেছে, তা তুলে ধরেন। পাশাপাশি মহামারি চীনের জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে ফেলেছে বলে সতর্ক করেন।
এসময় শি জিনপিং বলেন, ''সামরিক সংঘাতের জন্য আমাদের প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। দক্ষতার সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং সমরসজ্জার বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের সামরিক বাহিনী যেন অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করে তা নিশ্চিত করতে হবে।''
শি'র এই প্রত্যয় এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাজ ফেলেছে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে চীনা সামরিক বাহিনী বহু যোজন পিছিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলতে শুরু করেছে চীন।
এ উন্নতি প্রথমেই চোখে পড়ে চীনের নৌবাহিনীর শক্তির দিকে তাকালে। রণতরী এবং জাহাজ বিদ্ধংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলছে চীনা নৌবাহিনী।
গত বছরের শেষ নাগাদ চীনের কাছে ছিল ৩৩৫টি রণতরী। আর যুক্তরাষ্ট্রের ছিল ২৮৫টি। খোদ মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ- কংগ্রেসের এক গবেষণা প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনটি স্বীকার করে যে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গভীর সমুদ্রে মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে এখন হুমকির মুখে ফেলেছে চীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম মার্কিন নৌবাহিনীকে অত্র অঞ্চলে এমন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
অচিরেই হংকংকে সম্পূর্ণ নিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে উপনিবেশিক শক্তিগুলোর সৃষ্টি একটি অধ্যায়ের ইতি টানতে চায় চীন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পশ্চিমা শক্তির বাঁধা যেন না আসে, তা নিশ্চিত করতেই আশেপাশের পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
