রেমিটেন্সের প্রবাহে গতি আনতে প্রণোদনা বাড়াল সরকার
নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে থাকা রেমিটেন্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে প্রণোদনার হার বাড়িয়ে ২.৫% নির্ধারণ করেছে অর্থমন্ত্রণালয়, যা শনিবার ছুটির দিন থেকেই কার্যকর করা হয়েছে।
প্রণোদনা বাড়ানোর কারণে প্রবাসীদের বৈধপথে রেমিটেন্স পাঠানোর খরচ উসুল হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, চলতি অর্থবছর ২৬ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স আহরণের যে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাও পূরণ হবে। তবে রেমিটেন্সে প্রণোদনা বাড়ানোর এ ঘটনাকে 'নদীতে পানি ফেলা'র মতো অপচয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তারা বলছেন, কার্ভ মার্কেটে ডলারের দামের সঙ্গে ইন্টারব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেটে ৭ টাকার মতো স্প্রেড রয়েছে। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়িয়ে এ ব্যবধান কমাতে না পারলে প্রণোদনা বাড়িয়েও বৈধপথে রেমিটেন্স আহরণ বাড়ানো সম্ভব হবে না।
২০১৯-২০ অর্থবছরে রেমিটেন্সের বিপরীতে প্রথমবারের মতো ২% প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার, যা তখন থেকে অব্যাহত রয়েছে। গত অর্থবছর কোভিডকালীন পরিস্থিতিতেও রেমিটেন্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি পাওয়ায় প্রণোদনার সিদ্ধান্ত কাজে লেগেছে বলে মনে করে সরকার। তবে গত জুলাই থেকে বিশ্বজুড়ে কোভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও বাংলাদেশের রেমিটেন্স আহরণে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হতে থাকে।
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে রেমিটেন্স এসেছে ৮.৬১ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১০.৮৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গত পাঁচমাসে রেমিটেন্স কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ।
এ প্রেক্ষাপটে রেমিটেন্স বাড়ানোর উপায় জানতে চেয়ে গত নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয় অর্থমন্ত্রণালয়। ডিসেম্বরে ফিরতি চিঠি দিয়ে রেমিটেন্স পাঠানোর খরচ কমাতে উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের প্রতি ১০০ টাকা রেমিটেন্স পাঠাতে গড়ে ৩.১৫ টাকা খরচ হয়। সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসা সৌদি আরবে এ খরচ ৩.৫১ টাকা।
বিদেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠানোর খরচ কমানো বেশ কঠিন হওয়ায় প্রণোদনা বাড়িয়ে প্রবাসীদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থবিভাগ। শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রেমিটেন্সে প্রণোদনা ২.৫% নির্ধারণ করে তা ওইদিন থেকেই কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসীরা যেসব দেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠান, তার সব দেশে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা নেই। তাছাড়া, পাঠানোর খরচ নির্ধারণ করে ওইসব দেশের ব্যাংক ও মানি ট্রান্সফারের সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা।
বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের 'স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ' সম্পর্কিত চূড়ান্ত সুপারিশের প্রেক্ষিতে ঢাকায় স্মারক অনুষ্ঠানের প্রি-ইভেন্ট প্রেস ব্রিফিংকালে শনিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, বৈধপথে রেমিটেন্স আহরণে ২% প্রণোদনা দেওয়ার পর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। প্রণোদনার কারণে গত দুই অর্থবছর রেমিটেন্স প্রবাহ অনেক বেড়েছে। কারণ, রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের যে অর্থ খরচ করতে হয়, প্রণোদনার টাকায় সেটি কাভার করতে পারছে।
'এ বছর আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ বিলিয়ন ডলার। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রেমিটেন্স পাঠানোর বর্ধিত খরচ যাতে কাভার করে, সেজন্য ইনসেনটিভ আরেকটু বাড়ানো হলো। এটি অসাধারণ ভালো কাজ হয়েছে। আমরা ইনফরমাল চ্যানেলকে অনুৎসাহিত করবো এবং ফরমাল চ্যানেলেই পুরো রেমিটেন্স পেতে চাই'- যোগ করেন তিনি।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালখ ড. আহসান এইচ মনসুর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, কার্ভ মার্কেটের সঙ্গে ইন্টারব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেটের স্প্রেড যেখানে ৬-৭ টাকা, সেখানে এভাবে প্রণোদনা বাড়ানো নদীতে পানি ফেলার মতোই ফল দেবে। এই স্প্রেড যতো বাড়বে বৈধপথে রেমিটেন্স প্রবাহ ততোই কমবে।
তিনি বলেন, বৈধপথে রেমিটেন্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে ইন্টারব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেট কমপক্ষে ৮৭ টাকা নির্ধারণ করা উচিত। আর প্রবাসীদের এভাবে রেমিটেন্স দিয়ে দেশে ডলারের দু'টি রেট কার্যকর করাও যৌক্তিক নয়, একদেশে ডলারের একটি রেট-ই থাকা উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর মার্কিন ডলারের ইন্টারব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেট ছিল ৮৫.৮০ টাকা। অন্যদিকে, কার্ভ মার্কেটে ডলারের দাম ছিল ৯১-৯২ টাকার মতো।
তবে রেমিটেন্স বাড়ানোর এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সি আর আবরার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই রেমিটেন্সে ৪% প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলাম। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও একই হারে প্রণোদনা চেয়েছিল। তখন অর্থমন্ত্রণালয় ২% প্রণোদনা ঘোষণা করে।
'এখন তা বাড়িয়ে ২.৫% করার সিদ্ধান্তকে আমরা ইতিবাচক মনে করি। তবে এটি বাড়িয়ে ৪% করা উচিত'- যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ থেকে ভিন্নপথে অর্থপাচার হয়ে প্রণোদনার জন্য রেমিটেন্স আকারে ফিরছে কি-না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, টাকা পাচারের তথ্য মিডিয়া থেকে জেনে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
অর্থপাচারের কয়েকটি মামলায় কয়েকদিন আগেও রায় হয়েছে, অনেকেই জেলে আছে। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কে দোষী বা নির্দোষ সেটি কীভাবে প্রমাণ করবো?
আমদানি বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানিও বেড়েছে। আমাদের রপ্তানির বড় অংশই আমদানিতে চলে যায়। তবে আমরা কয়েকটি খাতে রপ্তানি বাড়াতে চেষ্টা করছি।
